নিজেদের অন্তর্কোন্দলে বাইরে থেকে ট্রেজারার পাচ্ছে নোবিপ্রবি?

২৪ জুলাই ২০২৬, ১০:২৫ PM , আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১০:৪১ PM
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় © সংগৃহীত

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) নতুন ট্রেজারার নিয়োগকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলা অভ্যন্তরীণ সমীকরণ শেষ পর্যন্ত নতুন মোড় নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের নাম বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এলেও শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন, পারস্পরিক লবিং ও বিভিন্ন মহলে পাল্টাপাল্টি তথ্য উপস্থাপনের কারণে কোনো প্রার্থীকে ঘিরে ঐকমত্য তৈরি হয়নি বলে একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে একজন অধ্যাপককে ট্রেজারার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সম্ভাবনা এখন জোরালো হয়ে উঠেছে। 

গত ৭ জুন সাবেক ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. হানিফ মুরাদ লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই পদটি শূন্য রয়েছে। এরপর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের নাম ঘুরেফিরে আলোচনায় আসে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, একাধিক প্রার্থীকে ঘিরে বিতর্ক, অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য এবং বিভিন্ন মহলে পাল্টাপাল্টি তথ্য উপস্থাপনের কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়েছে। 

বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, শুরুতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একাংশের সংগঠন সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক ও জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার। তবে নিয়োগ-সংক্রান্ত কিছু বিষয় নিয়ে তার ফাইল একাধিকবার পর্যালোচনায় যায় বলে জানা গেছে। ট্রেজারার পদে জোর আলোচনায় আসার পর অতীতে বঙ্গবন্ধুর মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদনসহ কয়েকটি কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে নতুন করে সামনে আসে। তবে বিশ্বস্ত সূত্র মতে, অন্য একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের নিশ্চয়তা পাওয়ার পর এই পদে তার নাম আলোচনা থেকে বাদ পড়ে যায়। 

শেখ মুজিবের মাজারে মাসুদ কাউয়ুম (সবুজ গেঞ্জি)

এরপর আলোচনায় উঠে আসে বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. মহিনুজ্জামানের নাম। গবেষণা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে তার সম্পর্কের কারণে তাকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, তার নাম সামনে আসার পরপরই অতীতের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক সংগঠন 'নীল দল'-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো সামনে এনে তার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সমালোচনা করা হয়। এ ছাড়া তিনি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে  হল প্রভোস্ট ছিলেন। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তিনি ওই পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। 

একই সময়ে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন ও সাদা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইয়ুম মাসুদের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আসে। তবে, টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন, তৎকালীন সময়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগসহ অতীতের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা দেখা যায়। 

এদিকে সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় যুক্ত হন এমআইএস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জিয়াউল হক। তার নাম আলোচনায় আসার পর থেকেই তার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন মহলে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খোঁজার চেষ্টা শুরু হয়েছে বলে একাধিক সূত্রের দাবি। ট্রেজারার পদে নোবিপ্রবির আরেক শিক্ষক ফিসারিজ এন্ড মেরিন সায়েন্স (ফিমস) বিভাগের অধ্যাপক ড. রাকিবুল ইসলাম আলোচনায় আসলে তার বিরুদ্ধেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক উপাচার্যের সাথে মতবিনিময়ের ছবি দিয়ে এবং স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের সাথে সংশ্লিষ্টটা নিয়ে সমালোচনা করা হয়। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, ট্রেজারার পদকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে নীরব প্রতিযোগিতা এখন প্রকাশ্য তথ্যযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। একজনের নাম আলোচনায় এলেই তার অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিগত অবস্থান কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ছবি ও তথ্য বিভিন্ন মহল, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যেতো এবং পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হতো সমালোচনা। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

শেখ মুজিবের মাজারে মহিউজ্জামান

প্রতিবেদকের হাতে থাকা ২০১৫ সালে খোলা “we are together” নামের একটি মেসেঞ্জার গ্রুপের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আওয়ামীবিরোধী অবস্থান থেকে গঠিত ওই প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে ট্রেজারার পদে আলোচিত চারজন অধ্যাপক সদস্য ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা বলছেন, একসময় একই আদর্শিক অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যেই এখন প্রশাসনিক পদকে কেন্দ্র করে স্বার্থের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। 

একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এখন মূল প্রতিযোগিতা যোগ্যতার চেয়ে গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক আস্থার। একজনের নাম এগিয়ে এলেই অন্যজন তার অতীত নিয়ে তথ্য তুলে ধরছেন। এতে শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়েরই ক্ষতি হচ্ছে।’

আরেক অধ্যাপক বলেন, ‘আমরা দেখছি, সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক মহল এবং বিভিন্ন পর্যায়ে সমান্তরাল প্রচারণা চলছে। প্রত্যেকে চাইছেন নিজের অবস্থান শক্ত করতে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল করতে।’

এই বিষয়ে নোবিপ্রবি সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার বলেন, ‘নোবিপ্রবি থেকে ট্রেজারার না দিয়ে যদি বাইরের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রেজারার নিয়োগ দেওয়া সরকারের সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে কখন কাকে কোন পদে নিয়োগ দেওয়া হবে, সেটি সরকারের সিদ্ধান্ত। আমাদের নিজেদের মধ্যে কোনো অন্তর্কোন্দল ছিল না। তবে দলীয়ভাবে সিনিয়র শিক্ষক অনেকেই আছেন। তাঁদের বিবেচনা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অনেক ভালো হত।’

ধানমণ্ডি ৩২-এ ফুলেল শ্রদ্ধায় জাহাঙ্গীর সরকার

এ বিষয়ে বিজ্ঞান অনুষদের ডিন  ড. মো. মহিনুজ্জামান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার নোবিপ্রবি থেকেই দিতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সরকার বাংলাদেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রেজারার নিয়োগ দিতে পারে। কারও প্রতি আমার কোনো অভিযোগ বা কোন্দল নেই। কারও যদি থেকে থাকে, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়।’ 

এ বিষয়ে নোবিপ্রবি সাদা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইয়ুম মাসুদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার নিয়োগ দেওয়া সরকারের বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিষয়। আমাদের নিজেদের মধ্যে কোনো অন্তঃকোন্দল নেই। এছাড়া “We Are Together” গ্রুপটি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে খোলা হয়নি। আমরা সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে গ্রুপটি খুলেছিলাম এবং মাসে ৫ হাজার টাকা করে জমা দিতাম।’ 

এদিকে ট্রেজারার পদে নিজেদের মধ্যে অন্তর্কোন্দলের কারণে বাহিরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই পদে নিয়োগের বিষয় জোর আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের (বিবিএ ফ্যাকাল্টি) ডিন এবং ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাছান উদ্দীনকে বেছে নিয়েছে সরকার। অধ্যাপক ড. মো. হাছান উদ্দীন বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)-এর একজন সক্রিয় সদস্য। এছাড়াও, শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, আলোচনায় আসা প্রার্থীদের নিয়ে যখন বারবার বিতর্ক তৈরি হচ্ছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকে সুস্পষ্ট ঐকমত্য পাওয়া যাচ্ছে না, তখন বাইরে থেকে অভিজ্ঞ কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আমি শুধু মেয়েটির বক্তব্য জানিয়েছিলাম, নিজের মত প্রকাশ করিনি…
  • ২৪ জুলাই ২০২৬
ভারতীয়দের ভিসা সুবিধা বাতিল করল ৪ দেশ: এনডিটিভি
  • ২৪ জুলাই ২০২৬
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে ছাত্রদলের ‘শহীদ ওয়াসিম ফুটসাল ফেস্ট’
  • ২৪ জুলাই ২০২৬
কক্সবাজারে ২৩ মামলার আসামি ডাকাত দলনেতা আটক
  • ২৪ জুলাই ২০২৬
সাহাবুদ্দিনের চিকিৎসা দেশেই সম্ভব: ডা. শফিক
  • ২৪ জুলাই ২০২৬
নিজেদের অন্তর্কোন্দলে বাইরে থেকে ট্রেজারার পাচ্ছে নোবিপ্রবি?
  • ২৪ জুলাই ২০২৬