প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
ভোর হওয়ার আগেই যারা শহরকে জাগিয়ে তোলে, দিনশেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফিরেও আবার পরদিনের লড়াইয়ে নামে- তারাই আসলে সভ্যতার নীরব স্থপতি। তাদের হাতেই গড়ে ওঠে রাস্তা, নগর, প্রতিষ্ঠান, এমনকি আমাদের প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। তবুও এই মানুষগুলোর প্রাপ্য সম্মান, নিরাপত্তা ও স্বীকৃতি- অনেক সময়ই থেকে যায় অবহেলার আড়ালে।
“All labor that uplifts humanity has dignity and importance”- Martin Luther King Jr.-এর এই উচ্চারণ শুধু একটি নৈতিক আহ্বান নয়; এটি একটি সভ্য সমাজের মানদণ্ড। কাজের ধরন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু শ্রমের মর্যাদা কখনোই ভিন্ন হতে পারে না।
সমাজের প্রতিটি শ্রেণি ও পেশার মানুষ-পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তারক্ষী, পরিবহনকর্মী, কারিগর, কৃষক কিংবা পেশাজীবী- সবাই মিলে একটি পরস্পরনির্ভরশীল কাঠামো তৈরি করে। এই কাঠামোর একটি অংশও যদি থেমে যায়, তবে পুরো ব্যবস্থাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ বাস্তবতায় দেখা যায়, যাদের শ্রম সবচেয়ে বেশি শারীরিক ও কঠোর, তাদের জীবনই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
শ্রম একধরনের নীরব ত্যাগ, যা প্রতিদিন গড়ে তোলে আমাদের চারপাশের পৃথিবী। একজন শ্রমিকের ঘামেই তৈরি হয় নগরীর আকাশছোঁয়া ভবন, চলমান থাকে শিল্পের চাকা, সচল থাকে অর্থনীতির প্রবাহ। অথচ সেই শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন আজও প্রশ্নবিদ্ধ।
শ্রমের মর্যাদা নিয়ে দার্শনিকদের চিন্তাও এ প্রসঙ্গে নতুন করে ভাবতে শেখায়। Aristotle বলেছিলেন, ““Dignity does not consist in possessing honors, but in deserving them.”—অর্থাৎ সম্মান পাওয়ায় নয়, বরং তা অর্জনের যোগ্যতায়ই নিহিত প্রকৃত মর্যাদা। আর সেই যোগ্যতা নির্মাণ করে শ্রমই।
হাড়ভাঙা পরিশ্রম, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সীমিত মজুরি এবং ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ- এগুলো অনেক শ্রমজীবী মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। তাদের শ্রম শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতারও ভিত্তি গড়ে তোলে। তাই শ্রমের মূল্যায়ন কেবল অর্থনৈতিক নয়- এটি একটি নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব।
মে দিবসের ইতিহাস:
১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেট চত্বরে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং পরবর্তী দমন-পীড়নের রক্তক্ষয়ী ঘটনাই হলো মে দিবসের মূল ইতিহাস। তৎকালীন সময়ে শ্রমিকদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ছিল না এবং তাদের দিনে প্রায় ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হতো, যার প্রতিবাদে ১লা মে থেকে তিন লক্ষাধিক শ্রমিক ধর্মঘট শুরু করে।
৪ঠা মে, হে মার্কেটে এক শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অতর্কিত বোমা হামলা এবং পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন শ্রমিক প্রাণ হারান, যার প্রেক্ষিতে অনেক শ্রমিক নেতাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
শ্রমিকদের এই মহান আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১লা মে-কে 'আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস' হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা আজ বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত।
শ্রমিকের অধিকার ও আইন:
বর্তমানে শ্রমিকদের সুরক্ষায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। International Labour Organization (ILO) শ্রমঘণ্টা নির্ধারণ, ন্যূনতম মজুরি, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, শিশুশ্রম প্রতিরোধ এবং শ্রমিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বৈশ্বিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এর নতুন মানদণ্ড:
ILO এখন শুধু মজুরি বা কর্মঘণ্টা নয়, বরং আরও কিছু মৌলিক বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছে :
ক. নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ: ২০২২ সাল থেকে ILO "নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ"-কে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে ।
খ. গিগ কর্মীদের অধিকার: বর্তমানে ফ্রিল্যান্সার বা ডেলিভারি রাইডারদের (গিগ কর্মী) অধিকার নিয়েও আন্তর্জাতিকভাবে আইন প্রণয়নের কাজ চলছে, যেখানে বাংলাদেশও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশেও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় Bangladesh Labour Act 2006 প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে কর্মপরিবেশ, মজুরি, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এছাড়াও বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬ ও অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর নতুন বিধান:
সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার শ্রম আইনে বড় ধরনের কিছু পরিবর্তন এনেছে যা শ্রমিকদের অধিকারকে আরও শক্তিশালী করেছে :
ক. মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি: নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন করা হয়েছে।
খ. ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজীকরণ: আগে ইউনিয়ন গঠনের জন্য মোট শ্রমিকের ২০% সমর্থন লাগত, এখন সেটি কমিয়ে অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যক (যেমন ২০ জন) শ্রমিকের সম্মতিতে ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে ।
গ. উৎসব ছুটি বৃদ্ধি: উৎসব ছুটি ১১ দিন থেকে বাড়িয়ে ১৩ দিন করা হয়েছে ।
ঘ. যৌন হয়রানি প্রতিরোধ: কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কঠোর আইন করা হয়েছে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নারী সদস্যের প্রধান্য দিয়ে অভিযোগ কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ঙ. ব্ল্যাকলিস্টিং নিষিদ্ধ: কোনো শ্রমিককে অন্যায়ভাবে কাজ থেকে বিরত রাখতে 'ব্ল্যাকলিস্ট' করাকে এখন অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আইন ও সুরক্ষা:
ক. বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫: এটি ২০০৬ সালের মূল আইনটিকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে সাহায্য করে।
খ. দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ (Employment Injury Insurance): কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের জন্য বর্তমানে একটি বীমা ব্যবস্থা (PILOT project) চালুর প্রক্রিয়া চলছে যা ILO-র সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।
তবে বাস্তবতার নিরিখে এসব আইনের কার্যকর প্রয়োগ বাংলাদেশসহ আরো অনেক দেশেই এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ফলে মে দিবস কেবল অতীত স্মরণ নয়- এটি বর্তমান বাস্তবতা বদলানোরও আহ্বান।
মহান মে দিবস উপলক্ষে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ ও প্রকাশনা দপ্তরের উপপরিচালক মোঃ সামছুল আলম শিবলী তার বক্তব্যে বলেন-“মহান মে দিবস উপলক্ষে যেমন বৈশ্বিক ও জাতীয় ইতিহাস ও গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি আমাদের ধর্মীয়ভাবে যদি বলি; আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘শ্রমিকের শরীরের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার আগেই তার পাওনা পরিশোধ করে দিতে।
এই কথাটি থেকেই আমরা বুঝতে পারি ইসলাম ধর্মে শ্রমের প্রয়োজনীয়তা এবং তার সঠিক মর্যাদা সম্পর্কে সচেতনতাকে কতটা জোর দেয়া হয়েছে।মহান মে দিবস শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের এক গৌরবোজ্জ্বল স্মারক। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়- শ্রমের মর্যাদা, ন্যায্য অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত প্রয়াসের গুরুত্ব কতটা অপরিসীম।''
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেনী-পেশার মানুষকে কেন্দ্র করে তিনি বলেন-''মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বাস করে, একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণে শ্রমজীবী মানুষের অবদান অনস্বীকার্য।বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, পরিবহনকর্মী থেকে শুরু করে প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের নিষ্ঠা ও পরিশ্রম আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয় সারা বিশ্বে যত শ্রেনী-পেশার মানুষ আছেন মহান মে দিবস উপলক্ষে আমরা তাদে সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং তাদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে পুনরায় অঙ্গীকারবদ্ধ হই। একইসঙ্গে নতুন প্রজন্মকে শ্রমের মর্যাদা উপলব্ধি করে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।”
মে দিবস আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়- সমাজ কেবল নীতিমালা দিয়ে নয়, মানুষের প্রতি মানুষের আচরণ দিয়েই গড়ে ওঠে। শ্রমিকের ঘাম, তার ত্যাগ এবং তার স্বপ্নের প্রতি সম্মান দেখানোই একটি সভ্য জাতির পরিচয়।
যেদিন আমরা প্রতিটি পেশার মানুষকে সমান মর্যাদায় দেখতে শিখবো, সেদিনই সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়িত হবে মে দিবসের চেতনা।