আব্দুল মালেক
নবম জাতীয় পে স্কেল © টিডিসি সম্পাদিত
নবম জাতীয় পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা করা হলে সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক সংকট কাটবে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল মালেক। তিনি বলেন, বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বাড়ানো না হলে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের পরও নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের অভাব থেকেই যাবে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাতে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
আব্দুল মালেক বলেন, পে স্কেলে সর্বোচ্চ গ্রেডে হয়তো ২০, ১৯, ১৮ বা ১৬ পর্যন্ত বেতন রাখা হতে পারে। এরপর গ্রেড অনুযায়ী বেতন বৃদ্ধির হার কিছুটা কমতে পারে। ফলে সব গ্রেডে সমান হারে বেতন বাড়বে না। এভাবে বাস্তবায়ন হলে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে না। জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। সাধারণ কর্মচারী ও জনগণের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। অনলাইন জরিপও করা হয়েছে। এসব তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পর কমিশন সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দিয়েছে।
আব্দুল মালেক বলেন, তারা কমিশনের কাছে বারবার একটি বিষয় তুলে ধরেছিলেন। গত ১১ বছরে সরকারি চাকরিজীবীরা দুটি পে স্কেল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অষ্টম পে স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৪ হাজার ১০০ টাকা থেকে দ্বিগুণ করে ৮ হাজার ২৫০ টাকা করা হয়েছিল। অর্থাৎ সেখানে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছিল। একই ধারায় ২০২০ সালে আরেকটি পে স্কেল হলে সর্বনিম্ন বেতন ১৬ হাজার ৫০০ টাকা হতো। এরপর ২০২৫ সালে আরেকবার ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি হলে তা দাঁড়াত ৩৩ হাজার টাকা। দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁরা সর্বনিম্ন বেতন ৩৫ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছিলেন।
তবে জাতীয় বেতন কমিশন দীর্ঘ বিশ্লেষণের পর নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ৩৫ হাজার টাকার দাবি থেকে ১৫ হাজার টাকা কমিয়ে ২০ হাজার টাকা সুপারিশ করে। অন্যদিকে ১:৪ অনুপাত ধরে সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার মধ্যে রাখার দাবি থাকলেও কমিশন তা বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেয়। কমিশনের সুপারিশ তারা মেনে নিয়েছেন। সেটিতেই তারা সন্তুষ্ট ছিলেন।
আরও পড়ুন: টাইম স্কেল বাতিল নয়, আগের তিনটি টাইম স্কেল পুনর্বহালের দাবি
আব্দুল মালেক বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার চার মাসের মাথায় প্রথম বাজেটেই পে স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। সরকার চাইলে প্রথম বাজেটে বিষয়টি বাদ দিতে পারত। কিন্তু তা না করে বাস্তবায়নের কথা বলায় তারা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। তবে পরবর্তী সময়ে সচিব পর্যায়ের কমিটির যাচাই-বাছাই নিয়ে তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কমিটি দীর্ঘ সময় ধরে বৈঠক ও পর্যালোচনা করেছে। ১ থেকে ২০ গ্রেডে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবে স্বাক্ষর করা হয়েছে। তবে সব গ্রেডে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি নাও হতে পারে। গ্রেড অনুযায়ী বেতন বৃদ্ধির হার পরিবর্তিত হতে পারে। নিচের গ্রেডে ১০০ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও ওপরের দিকে হার কিছুটা কমতে পারে।
তিনি বলেন, ১০ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অষ্টম পে স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ছিল ৮ হাজার ২৫০ টাকা। সেটিতে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি হলে নতুন বেতন দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ জাতীয় বেতন কমিশন সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে। অর্থাৎ কমিশনের সুপারিশ থেকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা কমে যাবে। গত কয়েক বছরে বাজারদরে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। শুধু সরকারি কর্মচারীরাই নন, সাধারণ মানুষও এর ভুক্তভোগী। ফলে ১১ বছর পর পে স্কেল দিতে গিয়ে যদি পুরোনো বেতনের ওপর শুধু ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি ধরা হয়, তাহলে বেতন বাড়ার তুলনায় দ্রব্যমূল্য আরও বেশি বাড়বে।
তিনি বলেন, জাতীয় বেতন কমিশন ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির যে সুপারিশ করেছিল, সেটি বাদ দিয়ে যদি ৮ হাজার ২৫০ টাকার ওপর ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে কর্মচারীদের প্রকৃত আয় খুব বেশি বাড়বে না। তাদের অভাব আগের মতোই থেকে যাবে। বৈষম্যও দূর হবে না। একজন কর্মচারী যদি শুধু ভাত, ডাল ও আলুর ভর্তা খান, তাহলেও এক বেলা অন্তত ৫০ টাকা লাগে। তিন বেলায় খরচ হয় ১৫০ টাকা। এক মাসে একজনের শুধু এই খাবারের পেছনেই খরচ হয় ৪ হাজার ৫০০ টাকা।
একটি পরিবারে ছয়জন সদস্য থাকলে শুধু ভাত, ডাল ও আলুর ভর্তা খেতেই মাসে ২৭ হাজার টাকা প্রয়োজন। অথচ একটি পরিবার কি পুরো মাস শুধু ভাত, ডাল আর আলুর ভর্তা খেয়ে থাকতে পারে? তাদের পুষ্টি, ভিটামিন ও প্রোটিনেরও প্রয়োজন রয়েছে। এর সঙ্গে দুই সন্তান স্কুলে পড়লে তাদের শিক্ষার খরচ রয়েছে। পরিবারের বৃদ্ধ বাবা-মা থাকলে তাঁদের চিকিৎসার খরচ আছে। এর সঙ্গে বাসাভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, যাতায়াত, নাশতা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় রয়েছে। সব মিলিয়ে ঢাকায় ৪০ হাজার টাকায়ও একটি পরিবার চালানো কঠিন।
আব্দুল মালেক বলেন, এমন পরিস্থিতিতে একজন কর্মচারীকে যদি ১৬ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে তার অভাব দূর হবে না। তারা চেয়েছেন কর্মচারীদের অভাব দূর করা হোক। অভাব দূর হলে অধিকাংশ কর্মচারীর জীবনযাপন ও আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একজন কর্মচারী যদি সব সময় অভাবের মধ্যে থাকেন, তাহলে তার কাছ থেকে ভালো সেবা আশা করা কঠিন। পেটে ক্ষুধা থাকলে রাষ্ট্রের সেবা দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রকে কর্মচারীদের কাছ থেকে সেবা নিতে হলে তাদের জীবনযাত্রার দিকটিও সরকারকে দেখতে হবে। একটি রাষ্ট্রের কার্যক্রম সচল রাখার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদের বড় ভূমিকা রয়েছে। সরকারের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব তাদের। আবার কর্মচারীরা ভালো আছেন কি না, সেটিও সরকারের দায়িত্ব।