এনসিটিবি লোগো ও প্রতীকী ছবি © টিডিসি সম্পাদিত
আসন্ন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপাতে প্রেস মালিকদের প্রায় ৮০ হাজার টন কাগজ (পেপার) লাগবে। এরমধ্যে নিজেদের ১৫ হাজার টন মজুদ থাকার পাশাপাশি বিদেশ থেকে আরও ২০ হাজার টন কাগজ আমদানি করেছেন তারা। আর বাকি ৪৫ হাজার টন স্থানীয় বাজার থেকে নিম্নমানের (রিসাইকেল) কাগজ কেনার অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারের ৩৬০ কোটি টাকা গচ্চা যেতে পারে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। আর এসব টাকা প্রেস মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফা হিসেবে থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সরকারের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন নতুন শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৩০ কোটি ৯২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩৯ কপি বই ছাপানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৯০ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৩২৮ টাকা।
সূত্র জানায়, প্রায় ৩১ কোটি এই পাঠ্যবই ছাপাতে কাগজের প্রয়োজন প্রায় ৮০ হাজার টন। গত ৬ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এনসিটিবির চাহিদা অনুযায়ী ৮০ হাজার টন কাগজ দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে বলে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে জানান মিল মালিকরা।
এরপরই ৯ জুলাই মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর (প্রেস মালিক) সঙ্গে একটি সভার আয়োজন করে এনসিটিবি। এনসিটিবি কার্যালয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ১৫ হাজার টন কাগজ মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে মজুদ রয়েছে বলে শিক্ষামন্ত্রীকে তারা জানান। পাশাপাশি বিদেশ থেকে ২০ হাজার টন কাগজ আনার দাবিও জানান।
এরপর মিল ও প্রেস মালিকদের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক হয় বলে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমএ)-এর সচিব একেএম নওশেরুল। তিনি বলেন, বিদেশ থেকে কাগজ আমদানি না করার জন্য প্রেস মালিকদের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সাইন করা হয়। তবে তারা (প্রেস মালিকরা) কথা রখেনি। এটা ঠিক করেনি। আমরা যে দামে কাগজ দিচ্ছিলাম, এতেও তাদের লাভ হতো। তবে কোনোভাবেই লোকসান হতো না।
মাস্টার্স সিমেক্স পেপার লিমিটেড, প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, অগ্রণী প্রিন্টিং, আনন্দ প্রিন্টার্স, প্রমা প্রিন্টিং প্রেস, বারতোপা প্রিন্টিং—এই প্রেসগুলো বিদেশ থেকে কাগজ আমদানি করেছে বলে সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিদেশ থেকে ২০ হাজার টন কাগজ আমদানি করে প্রেস মালিকরা নিজেরাই ব্যবহার করছেন এবং অন্য প্রেসের কাছে বাড়তি দামে বিক্রি করছেন। আর ১৫ হাজার টন কাগজ মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর (প্রেস মালিক) কাছে মজুদ রয়েছে। সবমিলিয়ে মোট ৮০ হাজার টনের মধ্যে ৩৫ হাজার টন কাগজ প্রেস মালিকদের কাছে রয়েছে।
আর বাকি থাকা ৪৫ হাজার টন নিম্নমানের বা রিসাইকেল (ডিআইপি) কাগজ আল নূর পেপার মিল, মল্লিক পেপার মিল, রশিদ পেপার মিল, মহেরা পেপার মিল, বিসিএল, আজাদ পেপার মিল (বগুড়া), বিএইচ এল পেপার মিল—এসব মিলের কাছ থেকে কেনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। যারা বাজারে নিম্নমানের কাগজ সরবরাহ করে থাকে বলে অভিযোগ করছেন মিল মালিকরা।
স্থানীয় বাজারে রিসাইকেল বা ডিআইপি কাগজের বাজার মূল্য প্রতি টন ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। সবমিলিয়ে সরকারের টেন্ডার অনুযায়ী, প্রতি টন ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এতে লোকাল মার্কেট থেকে প্রতি টনে প্রায় ৮০ হাজার কম কিনতে পারছেন প্রেস মালিকরা। সবমিলিয়ে ৪৫ হাজার টনে মোট ৩৬০ কোটি গচ্চা যেতে পারে সরকারের। এমনটাই অভিযোগ করছেন মিল মালিক ও সংশ্লিষ্টরা। আর এসব টাকা প্রেস মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফা হিসেবে থাকবে বলে জানান তারা।
এ ছাড়াও বিদেশ থেকে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা টনে কাগজ আমদানি করেছেন প্রেস মালিকরা। আর আমদানি করা কাগজ অন্য প্রেসের কাছে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন বেশ কয়েকজন প্রেস মালিক।
এনসিটিবির শর্ত অনুযায়ী, পাঠ্যবই ছাপাতে শতভাগ ভার্জিন পাল্প কাগজ ক্রয় করতে হবে। পাশাপাশি কিছু প্যারামিটার (কোয়ালিটি) থাকতে হবে। কাগজে মিনিমাম ৮৫ শতাংশ ব্রাইটনেস, ন্যাচারাল শেট, বাস্ট ফ্যাক্টর মিনিমাম ১৮+ লাগবে এবং অপাসিটি লাগবে ৮৭+। কিন্তু নিম্নমানের বা রিসাইকেল কাগজে (ওয়েস্ট পেপার দিয়ে তৈরি) কেনার ফলে পাঠ্যবইয়ের ছাপার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
তারা জানান, সরকার যেসব প্রেসকে পাঠ্যবই ছাপার কাজ দিচ্ছে, তাদেরই মনোনীত ইন্সপেকশন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ইন্সপেকশন করানো হচ্ছে। এরমধ্যে ইনফিনিটি ও ইনডিপেনডেন্ট নামে দুটি ইন্সপেকশন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যারা প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ের মান যাচাই করে থাকে। যেসব প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে কাগজ আনছে তাদেরই মনোনীত প্রতিষ্ঠান। ফলে নিম্নমানের পাঠ্যবই ছাপিয়ে পার পেয়ে যেতে পারে প্রেসগুলো।
এদিকে গত জুলাই মাসে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে মাত্র ৬০০ মার্কিন ডলার মূল্য দেখিয়ে তৈরি কাগজ আমদানি করার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমএ)। এক বিবৃতিতে বিপিএমএ জানায়, এভাবে কাগজ আমদানির ফলে শতকোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। আর বিদেশ থেকে কাগজ আমদানিকারীরাও ৬০০ মার্কিন ডলারে কাগজ আমদানি করেছেন বলে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান বিপিএমএ সচিব।
৬০০ মার্কিন ডলারে সাড়ে ৩ হাজার টন কাগজ আমদানির বিষয়টি জানিয়ে মাস্টার্স সিমেক্স পেপার লিমিটেডের কর্ণধার ইমরান হোসাইন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা সাড়ে ৩ হাজার টন কাগজ আমদানি করেছি। আমরা লোকাল মার্কেট থেকে নিম্নমানের কোনো কাগজ কেনার চেষ্টা করছি না। আমাদের যা প্রয়োজন তা কিনেছি।
এ ছাড়াও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রেসের মালিক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সমঝোতা স্মারকের আগেই আমরা কাগজ আমদানি করেছি। মিলাররা যে দামে কাগজ দিচ্ছে, এতে তারা প্রতিটনে প্রায় ৪০ হাজার টাকা বেশি লাভ করছে। আমরা লোকাল মার্কেট থেকে যদি কোয়ালিটিপূর্ণ কাগজ পায় তাহলে কেন আমরা নেব না। মিলারদের রেট (দাম) তো বেশি।
বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমএ) সচিব একেএম নওশেরুল আলম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বিদেশে থেকে প্রেস মালিকরা ২০ হাজার টন কাগজ নিয়ে এসেছে। এটা ঠিক হয়নি। কারণ তাদের সঙ্গে আমাদের একটা সমঝোতা স্বারক হয়েছিল যে, তারা বিদেশ থেকে কাগজ আমদানি করবে না। কিন্তু তারা কথা রাখেনি।
তিনি বলেন, এনসিটিবি বা সরকারের দেওয়া শর্তানুযায়ী মিলারদের ৮০ হাজার টন ভালো মানের কাগজ দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও রিসাইকেল কাগজ ক্রয় করছে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে একদিকে যেমন অর্থের অপব্যবহার হবে, অন্যদিকে নিম্ন মানের পাঠ্যবই পাবে শিক্ষার্থীরা। আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে মাত্র ৬০০ মার্কিন ডলার মূল্য দেখিয়ে তৈরি কাগজ আমদানি করা হচ্ছে। এতে সরকার শতকোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
তিনি বলেন, কম মূল্যে বিদেশ থেকে কাগজ আমদানির কারণে দেশীয় শিল্পে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে ৮০টি কাগজ মিল বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও ২৬টি মিল বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের মালিক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, মাত্র ৪/৫টি প্রেসের মালিক বিদেশ থেকে কাগজ আমদানি করেছে, তারা যে দামে আমদানি করেছে তার থেকে ১০/১২ হাজার টাকা বেশি দরে আমাদের কাছে বিক্রি করছে। ১৫ হাজার টন কাগজ থাকার কথা থাকলেও মূলত তা নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন মিল মালিক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, ১৫ হাজার টন কাগজ তাদের কাছে মজুদ রয়েছে বলে শিক্ষামন্ত্রীকে জানালেও মূলত তাদের কাছে নেই। তাদের হিসাব মতে ৪৫ হাজার টন রিসাইকেলিং কাগজ নিম্নমানের প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করছে। এসব ডিআইপি (ওয়েস্ট পেপার দিয়ে তৈরি) কাগজের বর্তমান বাজার দর ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা টন। এতে সরকারের দেয়া রেট থেকে প্রতি টনে ৮০ হাজার টাকা কমে পাচ্ছে। এতে পাঠ্যবইয়ের মান খারাপ হবে, বাচ্চাদের জন্যও ক্ষতিকর হবে।
তারা আরও বলেন, আমরা এক লাখ ১৮/২০ হাজার টাকা টনে কাগজ দিতে পারলে বিদেশ থেকে ২০ হাজার টন ও রিসাইকেল কাগজ কিনছে প্রেস মালিকরা। এতে নিম্নমানের বই যেমন ছাপা হবে পাশাপাশি সরকারের কয়েক শত কোটি টাকা গচ্চা বা বিফলে যাবে। আমরা যে দামে কাগজ দিচ্ছি তাতেও তাদের প্রতি টনে ৪০/৫০ হাজার টাকা লাভ হচ্ছে, এরপরেও তারা নিম্নমানের কাগজের দিকে ঝুঁকছে।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, এবার প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩০ কপি বই ছাপানো হবে। ইবতেদায়ির প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য ৩ কোটি ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৪০০ কপি এবং ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির জন্য মোট প্রায় ১৮ কোটি বই ছাপানো হবে। এর মধ্যে নবম শ্রেণির জন্য সবচেয়ে বেশি ৫ কোটি ৫৬ লাখ ২৭ হাজার ২৩৫ কপি বই রয়েছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে ৯ হাজার ৪ কপি ব্রেইল বই। সবমিলিয়ে প্রায় ৩০ কোটি ৯২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩৯ কপি বই ছাপাবে এনসিটিবি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার বই ছাপাতে সরকারের ব্যয় হবে ১ হাজার ৮৯০ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৩২৮ টাকা। জুন থেকে পর্যায়ক্রমে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এ বিষয়ে এনসিটিবির সচিব প্রফেসর শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকেলে মুঠোফোনে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আগামীকাল চেয়ারম্যান স্যারের সঙ্গে দেখা করেন এবং কথা বলেন। এতে আপনার রিপোর্টটি আরও সুন্দর হবে।