শিক্ষা মন্ত্রণালয় © টিডিসি সম্পাদিত
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অথচ এই মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ভুগছে জনবল সংকটে। বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। কোথাও নেই উইং চিফ, কোথাও উপসচিব; আবার কোনো কোনো কর্মকর্তা একসঙ্গে দুই থেকে তিনটি শাখার অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। এভাবে অতিরিক্ত দায়িত্বের ভারে ন্যুব্জ প্রশাসন দিয়ে দেশের বিশাল শিক্ষা ব্যবস্থার কাজ কতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব সেই প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের মোট নয়টি উইংয়ের মধ্যে পাঁচটিতেই বর্তমানে উইং চিফ নেই। এগুলো হলো-প্রশাসন ও অর্থ, উন্নয়ন অনুবিভাগ, মাধ্যমিক অনুবিভাগ-২, কলেজ এবং নিরীক্ষা ও আইন উইং। সাধারণত অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এসব উইংয়ের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ উঠেছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একাধিক অতিরিক্ত সচিব ওএসডি হিসেবে থাকলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে তাদের পদায়ন করা হচ্ছে না। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একটি উইংয়ের উইং চিফ না থাকলে শুধু প্রশাসনিক কাজের গতি কমে না, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিভিন্ন শাখার মধ্যে সমন্বয়েও জটিলতা তৈরি হয়। বিশেষ করে উন্নয়ন, বাজেট, প্রশাসন, কলেজ ও নিরীক্ষা-আইনের মতো স্পর্শকাতর উইংয়ে এ ধরনের শূন্যতা পুরো বিভাগের কাজের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এক শাখার কর্মকর্তা, তিন শাখার দায়িত্ব
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সবচেয়ে বেশি চাপ দেখা গেছে উপসচিব পর্যায়ে পদের ক্ষেত্রে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি শাখা- বিশ্ববিদ্যালয়, মাধ্যমিক-২ এবং নিরীক্ষা ও আইন শাখায় বর্তমানে উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা নেই।
শুধু পদ শূন্য থাকাই নয়, যেসব কর্মকর্তা কর্মরত আছেন, তাদের একটি বড় অংশকেও একাধিক শাখার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে একজন কর্মকর্তার ওপর একসঙ্গে একাধিক শাখার প্রশাসনিক, নীতিগত ও দাপ্তরিক কাজের চাপ পড়ছে।
ওয়েবসাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উপসচিব (সমন্বয়) অতিরিক্ত দায়িত্বের পাশাপাশি পারফরম্যান্স, উদ্ভাবন ও সেবা উন্নয়ন শাখা এবং বাজেট দায়িত্বই পালন করছেন লিউজা উল জান্নাহ। অর্থাৎ একজন কর্মকর্তাকেই তিনটি পৃথক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে।
উন্নয়ন শাখাতেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। উপসচিব শাহিনা পারভীন উন্নয়ন-২ এর মূল দায়িত্বের পাশাপাশি উন্নয়ন-৪ এবং এসডিজি শাখার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
সরকারি মাধ্যমিক শাখাতেও জনবল সংকট প্রকট। উপসচিব (সরকারি মাধ্যমিক-১) ও উপসচিব (সরকারি মাধ্যমিক-২) পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং উপসচিব (সরকারি মাধ্যমিক-৩) শাখার দায়িত্ব—তিনটি দায়িত্বই পালন করছেন তানিয়া ফেরদৌস। অন্যদিকে মাধ্যমিক-২ শাখায় উপসচিব পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তা নেই।
সরকারি কলেজ শাখাতেও একই চিত্র। এ এস এম শাহরিয়ার জাহান মূল দায়িত্বে রয়েছেন উপসচিব (উন্নয়ন-৩) হিসেবে। এর পাশাপাশি তিনি সরকারি কলেজ-১ ও সরকারি কলেজ-২-এর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। ড. জান্নাতুল ফেরদৌসের মূল দায়িত্ব সরকারি কলেজ-৪ শাখায়। এর সঙ্গে তিনি এসডিজি শাখার উপসচিবের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন। উন্নয়ন-১ শাখার উপসচিব মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনও অতিরিক্ত দায়িত্বের বাইরে নন। মূল দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি পরিকল্পনা-১ শাখার দায়িত্ব পালন করছেন।
যুগ্মসচিব পদেও শূন্যতা
উপসচিবের পাশাপাশি যুগ্মসচিব পর্যায়েও রয়েছে ঘাটতি। সরকারি মাধ্যমিক-১ শাখায় কোনো যুগ্মসচিব নেই। ফলে উপরের পর্যায়ের নেতৃত্ব ও তদারকির ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগেও সংকট
শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ নয়, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগেরও গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখায় অতিরিক্ত সচিব নেই।
কারিগরি শাখায় অতিরিক্ত সচিব পদটি শূন্য থাকায় প্রশাসন ও অর্থ শাখার অতিরিক্ত সচিব রেহানা ইয়াছমিনকে কারিগরি শাখার অতিরিক্ত সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ নিজের নিয়মিত দায়িত্বের পাশাপাশি তাকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রণালয়ের নীতি বাস্তবায়ন, ফাইল নিষ্পত্তি, আন্তঃশাখা সমন্বয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় যুগ্মসচিব ও উপসচিবরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই এ পর্যায়ে জনবল সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে।
তাদের মতে, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বাজেট, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, নিরীক্ষা ও আইন; এসব শাখার কাজের পরিধি ব্যাপক। এসব শাখায় পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে একটি ফাইলের নিষ্পত্তি থেকে শুরু করে বড় কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন পর্যন্ত সময় বেড়ে যেতে পারে।
জনবল সংকটের বিষয়ে জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে প্রশ্ন লিখে তাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে অতিরিক্ত সচিব এবং উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের পদায়ন প্রসঙ্গে জানতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারীকে মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।