মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে অনিয়মের চিত্র © টিডিসি সম্পাদিত
রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে গত দেড় দশকে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, রাজস্ব ফাঁকি, বিদ্যালয়ের তহবিল আত্মসাৎ, বিধিবহির্ভূত অর্থ লেনদেন এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েবের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির ২০০৯-২০১০ অর্থ বছর থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের আয়-ব্যয়, নির্মাণকাজ, উন্নয়ন প্রকল্প, ক্যান্টিন ভাড়া, ম্যাগাজিন ফি. মুদ্রণ ব্যয়, যানবাহন ক্রয়, শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্মানী, ভ্যাট-আয়কর পরিশোধসহ নানা খাত পর্যালোচনা করে এসব অনিয়ম পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ নিয়ে তদন্ত করে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। সংস্থাটির সাতজন সদস্য এ তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তদন্ত প্রতিবেদনটি ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
‘আমি এই মুহূর্তে দেশে নেই। দেশে ফিরে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের তদন্ত প্রতিবেদন দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’—ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, মন্ত্রী শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, কর ফাঁকি ও জবাবদিহিহীন ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা। এছাড়া অনেক ব্যয়ের ভাউচার পাওয়া যায়নি, অনুমোদনপত্র বা হিসাব না পাওয়া আর্থিক বিষয়গুলো যুক্ত করা হলে অনিয়মের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এম. এম সহিদুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের আর্থিক অনিয়মের প্রতিবেদনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’
নির্মাণ খাতে ৪৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব নেই
ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনে সবচেয়ে ভয়াবহ হিসেবে নির্মাণ খাতের ব্যয়ের হিসাব না থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ২০০৯-২০১০ অর্থ বছর থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে মেরামত ও উন্নয়ন খাতে ৪৩৬ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও এই ব্যয়ের কোনো হিসাব রাখা হয়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ইব্রাহিমপুর শাখায় ৮ তলা ভবন নির্মাণ, শেওড়াপাড়া শাখায় ৬ তলা ভবন, মূল বালক শাখায় ৭ তলা ভবন, রূপনগর শাখা ১২ তলা হোস্টেল ভবন, ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য ১২ তলা হোস্টেল ভবন এবং মূল বালিকা শাখায় ১২ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এসব নির্মাণকাজের কোনো টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি, অনুমোদিত নকশা, সয়েল টেস্ট রিপোর্ট, রাজউকের অনুমোদন, কার্যাদেশ, ব্যয় অনুমোদন, রেজ্যুলেশন দেখাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
এসব ভবন নির্মাণ ও বিভিন্ন উন্নয়ন খাতে মোট ৪৩৬ কোটি ১২ লাখ ৮ হাজার ৪৪২ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও ব্যয়ের কোনো ভাউচিার বা অনুমোদনপত্র দেখাতে পারেনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
যদিও প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ লিখিত বক্তব্যে দাবি করেছেন, পূর্বের প্রশাসন ও কমিটি অনেক নথি সরিয়ে ফেলেছে। তবে এই ব্যাখ্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। এই অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
ভ্যাট ফাঁকি ও সরকারি রাজস্ব ক্ষতি ৩৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা
ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০০৯-২০১০ অর্থ বছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থ বছর পর্যন্ত ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের বিল থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিধান অনুযায়ী ভ্যাট কর্তন করা হয়নি। এর ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ৩৬ কোটি ৭৫ লাখ ৪২ হাজার টাকা। এই অর্থ ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে চালানের কপি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে ডিআইএ।
শিক্ষক-কর্মচারীদের অবৈধ ভাতা ৮৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা
মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে কর্মরত শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাডেমিক উন্নয়ন ও নগর ভাতার নামে সম্মানী দেওয়া হয়েছে। একাডেমিক উন্নয় ভাতার নামে ৬৩ কোটি ৪৬ হাজার ৪২৮ টাকা এবং নগর ভাতা বাবদ ২৪ কোটি ৩৬ লাখ ৪০ হাজার ৭৩৬ টাকাসহ এ দুই খাতে সর্বমোট ৮৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা প্রতিষ্ঠানটির তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছে।
পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিধি বহির্ভূতভাবে শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাডেমিক উন্নয়ন ও নগর ভাতা দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ যাদের দেওয়া হয়েছে তাদের কাছ থেকে আদায় করে প্রতিষ্ঠানটির তহবিলে জমা দিতে হবে।
নিজস্ব প্রিন্টিং প্রেস থাকার পরও ১১ কোটি টাকার মুদ্রণ ব্যয়
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের নিজস্ব প্রিন্টিং প্রেস রয়েছে। এরপরও প্রতিষ্ঠানটি প্রশ্নপত্র ছাপানো ও সিলেবাস মুদ্রণ খাতে ২০১৭-২০১৮ থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১১ কোটি ৪৩ লাখ ৭৭ হাজার ৭১২ টাকা ব্যয় করেছে।
এর মধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ৩ কোটি ১০ লাখ ৭৭ হাজার ১৬০ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ৪ কোটি ৩২ লাখ ৩১ হাজার ৪৯৫ টাকা; ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ২ কোটি ৮৩ লাখ ২১ হাজার ৩০৯ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া পরবর্তী বছরগুলোতে এ খাতে আরও কয়েক কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এসব ব্যয়ের কোনো বিল-ভাউচার দেখানো হয়নি। তদন্ত কমিটি এই পুরো ব্যয়কে আত্মসাৎ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিশেষ ক্লাস ও পরিচালনা কমিটির সম্মানী: কোটি টাকার কর ফাঁকি
ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে বিশেষ ক্লাসের নামে শিক্ষকদের ১৩ কোটি ১৯ লাখ ৭৯ হাজার ১১২ টাকা দেওয়া হয়েছে। বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয় করা হলেও আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ৫২এ ধারা অনুযায়ী ১০ শতাংশ হারে উৎস কর কর্তন করা হয়নি। এর ফলে এ খাতে সরকারের ১ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এ টাকা আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সদস্যদের বিধি বহির্ভূতভাবে সম্মানী প্রদান করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্ণিং বডির সদস্যদের সম্মানী গ্রহণের নিয়ম না থাকলেও এই খাতে প্রতিষ্ঠানটি ২ কোটি ৪৩ লাখ ২০ হাজার ৭৬৪ টাকা ব্যয় করেছে। এই অর্থ আদায় করে প্রতিষ্ঠানটির তহবিলে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিশোধিত অর্থের বিপরীতে ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৭৬ টাকা আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে ডিআইএ।
বিজ্ঞাপন খাতে ব্যয়ের ৪ কোটি টাকার ভাউচার নেই
মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞাপন খাতে ৪ কোটি ১ লাখ ৪৭ হাজার ৪৯৭ টাকা ব্যয় করলেও এ ব্যয়ের কোনো বিল-ভাউচার পাওয়া যায়নি। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দাবি করেছেন, ‘পূর্বের কর্তৃপক্ষ এসব নথি নিয়ে গেছে।’ তদন্ত কমিটি বলেছে, বিল-ভাউচার উদ্ধার করে সংরক্ষণ করতে হবে, নতুবা দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
গাড়ি ক্রয়ে অনিয়ম: ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকার হিসাব নেই
প্রতিষ্ঠানের জন্য মোট ৭টি গাড়ি কেনা হলেও ৬টির কোনো বিল-ভাউচার পাওয়া যায়নি। গাড়িগুলোর মধ্যে রয়েছে টয়োটা হ্যারিয়ার, টাটা বাস, টয়োটা মিনিবাস ও মিতসুবিশি মিনিবাস। এগুলো কিনতে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা।
ম্যাগাজিন প্রকাশ না করেও ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা আদায়
ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের পর থেকে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে কোনো বার্ষিক ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হয়নি। ম্যাগাজিন প্রকাশ না হলেও এ খাতের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় অব্যাহত ছিল।
ম্যাগাজিনের জন্য প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১৫০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। ফলে গত ১২ বছরে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৫ কোটি ২৫ লাখ ৭৬ হাজার ২০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। তবে কোনো ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হয়নি। এই অর্থ বিধি বহির্ভূত ভাবে আদায় করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে তদন্ত কমিটি।
ইব্রাহিমপুর শাখায় ৬৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ইব্রাহিমপুর শাখা থেকে চার মাসে আদায় হয়েছিল ২ কোটি ৬৫ লাখ ৯৩ হাজার ৬৮৫ টাকা। আদায়কৃত অর্থের মধ্যে ১ কোটি ৯৯ লাখ ৪০ হাজার ২১৫ টাকা ব্যাংকে জমা করা হয়।
অবশিষ ৬৬ লাখ ৫৩ হাজার ৪৭০ টাকা প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অর্থ আদায় করে প্রতিষ্ঠানটির তহবিলে জমা দেওয়া এবং অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
ক্যান্টিন ভাড়ার ৭৯ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাৎ
মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের বিভিন্ন শাখার ক্যান্টিন ও দোকান ভাদা বাবদ প্রতি মাসে ৬০ হাজার টাকা করে আদায় করা হলেও তার কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। এই অর্থ কর্তৃপক্ষ আত্মসাৎ করেছে বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ক্যান্টিন থেকে প্রতি বছর ভাড়া আদায় করা হয় ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। সে হিসেবে ১১ বছরে মোট আদায় করা অর্থের পরিমাণ ৭৯ লাখ ২০ হাজার টাকা। আদায় করা এই অর্থ প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংকে জমা হয়নি। এমনকি ক্যাশবুকেও এই অর্থের কোনো এন্ট্রি নেই। ফলে এই অর্থ আত্ম সাৎ করা হয়েছে বলেই মনে করছে তদন্ত কমিটি।
ক্যাশবুকে ভয়াবহ জালিয়াতি ও হিসাবে গরমিল
ডিআইএর তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির ক্যাশবুক পর্যালোচনায় ভয়াবহ অনিয়ম ধরা পড়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, কয়েক বছর ধরে আয়-ব্যয়ের তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়নি। বিভিন্ন আর্থিক খরচের ভাউচার নম্বর লেখা হয়নি। রশিদ নম্বর না থাকা, মাসিক সমাপনী স্বাক্ষর না থাকা, পেন্সিলে উদ্বৃত্ত হিসাব লেখা হয়েছে। শুধু তাই নয়; একই হিসাব দুইবার খাতায় এন্ট্রি করা হয়েছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে অক্টোবর পর্যন্ত যে ব্যয় হয়েছে তার কোনো এন্ট্রি করা হয়নি। ২০০৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয়ের পৃষ্ঠা ফাঁকা রাখা হয়েছে।
তদন্ত দল জানিয়েছে, হিসাবের পৃষ্ঠাগুলো ফাঁকা রাখার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আরও বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম করার পায়তারা করছিল। এসব অনিয়মের ফলে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
স্টক রেজিস্টার ও গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব
ডিআইএর তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ স্টক রেজিস্টার, চেক ডিমান্ড রেজিস্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি উপস্থাপন করতে পারেনি। ফলে আসবাবপত্র বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ও অন্যান্য মালামাল আসলেই ক্রয় করা হয়েছে কিনা তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্টক রেজিস্টার না থাকলে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে ডিআইএ। এজন্য প্রতিষ্ঠান প্রধানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
১৫ বছর কোনো বাজেট হয়নি, হয়নি অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষাও
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০১০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে কোনো বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে ইচ্ছেমতো অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। একইসঙ্গে গত ১৫ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটিও গঠন করা হয়নি। যদিও প্রতি তিন মাসে হিসাব নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক। তবে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ কর্তৃপক্ষ তা মানেনি।
বাতিল কমিটির মাধ্যমে ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকার উন্নয়ন কাজ
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠন না করে বাতিল কমিটির মাধ্যমেই প্রায় ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৮ হাজার ৪৯১ টাকার উন্নয়ন কাজ করা হয়েছে। এই কাজগুলোতে পিপিআর বিধিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে তদন্ত কমিটি জানিয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, টেন্ডার ছাড়াই নগদে ১ কোটি ২৩ লাখ ৭৪ হাজার ৪৩৭ টাকার মালামাল কেনা হয়েছে। শ্রমিক মজুরি বাবদ কোটি কোটি টাকা স্পট কোটেশনের মাধ্যমে ব্যয় করা হয়েছে। এসব কাজের ক্ষেত্রে দরপত্রও আহবান করা হয়নি। এছাড়া উন্নয়ন কাজে পরিশোধিত ৩ কোটি ১২ লাখ ১৮ হাজার টাকার বিপরীতে ২৩ লাখ ৪১ হাজার ৩৫০ টাকা ভ্যাট এবং ১৫ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ টাকা আয়কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
মনিপুর স্কুলের অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমি এই মুহূর্তে দেশে নেই। দেশে ফিরে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের তদন্ত প্রতিবেদন দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’