শিক্ষার অভাব
© সংগৃহীত
একদিকে ঘরে ফেরার অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে শিক্ষার আলো না পাওয়া— সবমিলিয়ে এক হতাশাব্যঞ্জক ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শিশু। সূত্র বলছে, বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে। যাদের বিরাট একটি অংশ শিশু এবং তরুণ। কর্তৃপক্ষের বিধি-নিষেধ থাকায় অনেক ধরণের শিক্ষার সুবিধা থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে এই শিশু-তরুণরা। যারা শিক্ষা নিচ্ছেন, তারাও পাচ্ছেন সীমিত আকারে। ফলে রোহিঙ্গা সম্প্রদায় তাদের একটি প্রজন্মকে খুব শিগগিরই হারাতে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের বার্মিজ রোহিঙ্গা সংগঠনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনই ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। ব্রিটেনভিত্তিক রোহিঙ্গা সংগঠনটি জানাচ্ছে, গত বছরের আগস্টের শুরুতে যেসব শিক্ষক এসেছেন, তাদের ২১ শতাংশের শিক্ষা মাধ্যমিক স্তর ছাড়িয়ে। রাখাইনে বিদ্যমান বিভাজনের অর্থ হচ্ছে-রোহিঙ্গা শিক্ষকদের ভ্রমণের অনুমতি নেই। কাজেই তারা সরকার পরিচালিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেও যেতে পারেন না।
অবশ্য ইউনিসেফ বলছে, ২০১৮ সালে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা নিতে দুই কোটি ৮২ লাখ ডলার অনুদান চেয়েছিল তারা। সেখানে এখন পর্যন্ত ওই অর্থের অর্ধেকের সামান্য বেশি এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, এসব শিশুর জন্য গত জুলাই নাগাদ এক হাজার ২০০ শিক্ষা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যেখানে প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার শিশু ভর্তি হয়েছে। তবে এখনো সেখানে কোনো স্বীকৃত পাঠ্যসূচি চালু হয়নি। ক্লাসরুমগুলোতে গাদাগাদি করে বসতে হয় শিক্ষার্থীদের। বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে।
ব্রিটিশ রোহিঙ্গা সংগঠনের প্রধান টুন খিন বলেন, এখন সবার আগে রোহিঙ্গাদের পড়াশোনার সুযোগ দিতে হবে, যাতে তারা নিজেদের সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব দিতে পারেন। কিন্তু চলমান বিধিনিষেধের মধ্যে তাদের জন্য শিক্ষাগ্রহণ একেবারে অসম্ভব।কাজেই এভাবে একটি প্রজন্ম আমাদের মধ্য থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটসের কুইনলে বলেন, রাখাইন রাজ্যে জাতিগত বিভাজনের ভেতর বছরের পর বছর ধরে বৈষম্য সহ্য করে শিক্ষক সংগ্রহ তাদের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যমতে, গত বছরের আগস্টের শেষ দিকে রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ধরপাকড় থেকে বাঁচতে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আগে থেকে আরও চার লাখ এখানে অবস্থান করছেন। এদের বিরাট একটি অংশ মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত।এদের মধ্যে একটি অংশ কোন ধরনের শিক্ষাই গ্রহণ করতে পারে না।
অন্যদিকে ২০১২ সালে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর রাখাইনে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গা শিশু ও যুবকদের চরম বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হচ্ছে। ফলে সেখানকার শিশুরাও শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি এখানে বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের উপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। শিশুদের সেখানে বিচ্ছিন্ন স্থাপনার ভেতরে রাখা হচ্ছে। এতে মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের আওতার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। বয়স্ক শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছেন না। কাজেই বিকল্প হিসেবে এসব শিশুর অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। যেগুলো বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা পরিচালনা করে আসছে।
যদিও ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠেছে দুই-চারটি প্রতিষ্ঠান। মাত্র ৯০জন শিক্ষার্থী নিয়ে খুপড়ি ঘরে চলা এমনই এক স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন। তিনি বলছেন, ‘আমি যখন প্রথম আসি তখন দেখি আমার মতো এখানে অনেক পরিবার আছে। কিন্তু এখানে কোন স্কুল নেই। আমি এখানকার জন্য কি করতে পারি তা চিন্তা করছিলাম। এভাবেই আমি অগ্রসর হই।’ তিনি বলছেন, আমার মনে হয়েছে যে যদি আমরা এই অবস্থাতেই থাকি, আমাদের ছেলে মেয়েরা দিন-দিন বড় হয়ে যাচ্ছে। ওদের কোন লেখাপড়া না থাকলে ওদের জীবন দিন-দিন ধ্বংসের পথে চলে যাবে।
ত্রাণনির্ভর জীবনে অপরাধে জড়াচ্ছে শিশুরা
বৈধ জীবিকার সুযোগ না থাকায় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩০টি ক্যাম্পের প্রায় পাঁচ লাখ পূর্ণবয়স্ক নারী-পুরুষের ত্রাণনির্ভর জীবন অনেককে একদিকে অলস করছে, অন্যদিকে নানা ধরনের অপরাধ প্রবণতায় আকৃষ্ট করছে। যাদের জড়িয়ে পড়ছেন অনেক শিশুরাও।
ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের (আইএসসিজি) হিসাব অনুযায়ী, উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর মধ্যে ৪২ শতাংশ পূর্ণ বয়স্ক বা কর্মক্ষম। এদের মধ্যে গত বছরের ২৫ আগস্টের পর থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়ে বা প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা সাত লাখেরও বেশি। দীর্ঘদিনের কর্মহীনতায় রোহিঙ্গাদের অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের।
এর আগে সফরকালে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা—ইউএনএইচআরসির মুখপাত্র জোসেফ সূর্য ত্রিপুরা বেনারকে বলেছিলেন, জীবিকার অভাবে তাদের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়েছে সে বিষয়টি আমরাও খেয়াল করেছি। আসলে সব মানুষই নিজের পরিবারকে সাহায্য করতে চায়। তিনি বলেন, কর্মক্ষম সব রোহিঙ্গাই চায়, নিজের পরিবারের সদস্যরা একটু ভালো থাকুক। যে কারণে এখানে তাদের জীবিকার সুযোগ থাকা উচিত।