তরুণ-তরুণীরা এভাবেই অ্যাপটিতে নিজেদের মেলে ধরছেন। © সংগৃহীত
রাজধানীর উত্তরায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নুসরাত (ছদ্মনাম)। বেশ আধুনিক এবং ছনমনে স্বভাবের এ তরুণী ফেসবুক, ইমো, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকসহ বেশকিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন। তবে গত কয়েক মাস থেকে তার সবচেয়ে বেশি আসক্তি জমেছে টিকটক অ্যাপে। ভারতীয় সিনেমার বিভিন্ন গানের সঙ্গে ঠোট মিলিয়ে তৈরি করা ভিডিও দিয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
কিন্তু সম্প্রতি তা হাসি ঠাট্ট ও মজার সীমা ছাড়িয়ে যৌনতায় রুপ নেয়। কিছু ছবির রগরগা দৃশ্যের সংলাপে অঙ্গভঙ্গি যোগ করে তৈরি ভিডিও প্রকাশ করেন নুসরাত। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ডিঙ্গিয়ে ছড়িয়ে পড়ে তার আত্মীয়-স্বজন ও বাবা-মায়ের নজরেও। মেয়ের কর্মকাণ্ডে তারা বিব্রত। সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় মেয়েকে এসব বন্ধ করার চাপ দিয়েছে তারা।
শুধু নুসরাতের বাবা-মাই নয়, ফেসবুককে পেছনে ফেলে সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমের নতুন এ ট্রেন্ডের বিস্তার ও তাতে নিজেদের সন্তানদের উপস্থিতি নিয়ে চিন্তিত বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের বাবা-মায়েরা।
দক্ষিণ ভারতের চেন্নাইয়ের কান্নিকাপুরাম উপশহরের বাসিন্দা ছিল ভি কালাইয়ারাসান। টিকটকের বিভিন্ন কনটেন্ট দিয়ে ভিডিও তৈরি করাই ছিল ২৪ বছর বয়সী এ যুবকের নেশা। গত অক্টোবরে নারীদের পোশাক পড়ে তিনি একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। এরপর ওই ভিডিওতে নানা হাসি ঠাট্টা ও তিরস্কার শুরু করেন তার ভার্চুয়াল ফ্রেন্ডরা। তাকে নপুংসক এবং হিজরা হিসেবেই ভাল দেখায় এমন মন্তব্যও করেন অনেকে। সমালোচনা ও ঠাট্টার এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে শেষ পর্যন্ত ওই যুবক ট্রেনের সামনে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বিশেষ করে উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়ে ফেসবুকের পরেই এখন টিকটক বেশি ব্যবহার করছেন। চীনের মালিকানাধীন এই মোবাইল অ্যাপে কারিনা কাপুর থেকে শাবনুর, শাহরুখ খান থেকে সেফুদা আলোচিত সমালোচিত সব নায়ক-খলনায়ক এবং কৌতুক অভিনেতার সংলাপের কনটেন্ট রয়েছে। যে কেউ চাইলে ওই সংলাপের সাথে নিজের ঠোট ও অঙ্গভঙ্গি যোগ করে সহজেই তৈরি করতে পারেন ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও। এরপর তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন টিকটক, ফেসবুক এমনকি ইউটিউবে। সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বন্ধুদের সহজ বাহ বাহ পেয়ে পুলকিত হচ্ছেন, আনন্দ খুজে পাচ্ছেন ।কিন্তু মজা ও হাসি ঠাট্টার সঙ্গে সঙ্গে চারিত্রিক ও নৈতিকতার বিপর্যয় ঘটছে এর মাধ্যমে। বিনোদন মূলক কনটেন্টের পাশাপাশি অ্যাপটিতে এমন কিছু বিষয় রয়েছে যা কিশোর-কিশোরি ও তরুণদের জন্য খুবই ভয়ঙ্কর। তরুণ-তরুণীরা চিন্তা ভাবনা ছাড়াই অনেক যৌনতাপূর্ণ গানের সঙ্গে আপত্তিকর নাচ ও অঙ্গভঙ্গি যোগ করে এসব ভিডিও তৈরি করছে। এসব ভিডিওর কমেন্ট অপশনে গিয়ে চাওয়া হচ্ছে মেয়েদের গোপনীয় ছবি এবং ভিডিও। তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে যৌন কমকাণ্ডে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফেসবুকে একটি নির্দিষ্ট সীমা ও গন্ডি থাকলেও টিকটকে কোন কিছু শেয়ার করলে তা মহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এ সব ব্যবহারকারীর কাছে। ফলে বিভিন্ন সংস্কৃতির তরুণ-তরুণীর জীবন ধারায় প্রভাবিত হচ্ছে বাংলাদেশের ছেলে-মেয়ে। যা দুশ্চিন্তার বাড়াচ্ছে অভিভাবকদের মধ্যে।
সম্প্রতি এমন আপত্তিকর কনটেন্টের কারণে পর্নোগ্রাফি ও ব্লাসফেমির অভিযোগে টিকটককে নিষিদ্ধ করে ইন্দোনেশিয়া। লিপ সেনসিং আউটফিট শিশুদের জন্য উপযুক্ত নয় দাবি করে দেশটির ১ লাখ ৭০ হাজার লোক একটি পিটিশন দাখিল করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে টিকটক অ্যাপটিকে নিষিদ্ধ করে দেশটির সরকার। তবে এমন অসঙ্গতিমূলক কনটেন্ট বাদ দেয়ার শর্তে ফের এ্যাপটি চালু হয়।
ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের নিয়ে গবেষণা করে থাকে জেনারেশন নিউমেরিক নামে একটি সংস্থা। সংস্থাটির গবেষণায় দেখায় দেখা যায়, অ্যাপটিতে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বেশি আগ্রহী। ফ্রান্সে প্রায় ৫৮ শতাংশ তরুণী টিকটক ব্যবহার করেন। অথচ যেখানে তরুণদের হার মাত্র ১৫ শতাংশ।
সম্প্রতি ফ্রান্সের পুলিশ দেশটির অভিভাবকদের তাদের সন্তানের বিষয়ে সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ টিকটকের মাধ্যমে অশোভন যৌন প্রস্তাবের শিকার হতে পারেন। পুলিশের এমন সতর্কতার পর নিজের ১২ বছরের মেয়ের বিষয়ে সামধানতা অবলম্বন করেছেন ইউলিয়াম সওয়ালি নামে ফ্রান্সের এক বাবা। যার মেয়ে নাচের খুবই ভক্ত।
এজেন্সি ফ্রান্স প্রেসকে (এএফপি) দেয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমি আমার মেয়ের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলি এবং তার ফোন থেকে অ্যাপটি ডিলিট করার সিদ্ধান্ত নেই। তবে এ সিদ্ধান্তে এটি সামাজিক স্ট্যাটাস হারানোর ভাবনায় মেয়ের চোখে অশ্রুর চলে আসে। তবে সমাধানটা বাবা-মার কাছ থেকেই আসতে হবে। কারণ তাদের বুঝতে হবে ইন্টারনেট সন্তানের নিরাপত্তা দেয়ার বিশ্ব নয়।’