© টিডিসি ফটো
এক. ‘জরুরি ও পজেটিভ ব্লাড লাগবে। ১ ঘন্টার মধ্যে ব্লাড না পেলে রোগী মারা যাবে। প্লিজ কেউ এগিয়ে আসুন।’ শুক্রবার (২২ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত একটা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান আর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে উঠা ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপ ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে’ সাদমান শাকিল নামের এক শিক্ষার্থীর স্ট্যাটাস।
একঘন্টা পর ওই শিক্ষার্থী আরেকটা স্ট্যাটাস দিয়ে জানান, ‘রাত ২টা বেজে ৪ মিনিট। এই তীব্র শীত উপেক্ষা করে বেইলী রোডের মনোয়ারা মেডিকেলে ব্লাড দিতে গিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছেলে। ঢাবির এইসব ভালোবাসা মিছে নয়৷’
দুই. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আসিফ নিয়াজ। তার সাধ্যমত বাজেটে একটি স্মার্টফোন কিনবেন| তাই Desperately Seeking Dhaka-DSD নামের একটি পাবলিক ফেসবুক গ্রুপে অভিজ্ঞদের মতামত চেয়ে একটি স্ট্যাটাস দেন। পরে অনেকেই এ ব্যাপারে মতামত (কমেন্ট) দেন। আসিফ জানান, এসব মতামত অনুযায়ী পরবর্তীতে নিজের সাধ্যমত বাজেটে একটি স্মার্টফোন কিনেন।
সাদমান শাকিল আর আসিফ নিয়াজের মতো অনেকেই বিপদ-আপদ, সাহায্যের আবেদন, পারিবারিক-সামাজিক নানা বিষয়ে মতামতের জন্য ফেসবুক গ্রুপে ভরসা করেন। শুধু তাই নয়, চলতি বছরের সবচেয়ে আলোচিত দুই আন্দোলন-কোটা সংষ্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ফেসবুক কেন্দ্রিক গ্রুপ বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এসব গ্রুপে কখন কি হত- তা নিয়মিত আপটেড পাওয়া যেত।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক, চাকরি কেন্দ্রীক, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কেন্দ্রীক, ভ্রমণ বিষয়ক, বিদেশ শিক্ষা বিষয়ক একাধিক গ্রুপ রয়েছে। কয়েকজন মিলে মূলত এসব গ্রুপের যাত্রা হয়। পরে সেখানে অন্যদের (মেম্বার) সংযুক্ত করা হয়। এসব গ্রুপে এডমিনরা দেখভাল করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান আর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিকট ফেসবুকে সবচেয়ে জনপ্রিয় গ্রুপ 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার'। জরুরি রক্তদান, টিউশনীর খোঁজ-খবর, দ্ররিদ্র শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে আর্থিক সহায়তাসহ নানা বিষয় নিয়ে এখানে আলোচনা (স্ট্যাটাস) করা হয়। গ্রুপটি পরিচালনা (এডমিন) করছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ৬ শিক্ষার্থী।
প্রায় ৬৩ হাজার সদস্যের এ গ্রুপের এডমিন সাদমান শাকিল ‘দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে’ বলেন, ‘প্রযুক্তি যেন আরও বেশী মানবিক কাজে ব্যবহৃত হয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের’ মাধ্যমে আমরা সেজন্য কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের পরিকল্পনা আছে আগামীতে এ গ্রুপের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক লাইভ লেকচার আয়োজন করা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষামূলক কাজে সহযোগিতা করা সহজ হবে বলে মনে করছি।
তার দেয়া তথ্য মতে গত দুই বছরে এ গ্রুপ থেকে বন্যার্তদের জন্য ১০ লাখ টাকার ত্রাণ বিতরণ, ট্যূরিজম ডিপার্টমেন্টের এক শিক্ষার্থীর মায়ের জন্য ৭ লাখ টাকা তুলে দেয়া, বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতির টিউমার আক্রান্ত শিক্ষার্থীর জন্য এক লাখ টাকা ডোনেশন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি শিবনাথের কিডনিরোগী ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য টাকা যোগাড় করে দেয়া, ৫ হাজারের বেশী ব্যাগ ব্লাড হেল্প, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ৫ শত এর বেশী শ্রুতিলেখকের ব্যবস্থা করে দেয়া, ঢাবি শিক্ষার্থীদের চোখে সেরা বই ও মুভির তালিকা তৈরি, টিউশন দেওয়ার জন্য যোগ্যতার ভিত্তিতে লিস্ট তৈরি, সাবজেক্ট ও জেলা রিভিউ এর মত বড় ধরণের সামাজিক সহযোগিতা মূলক কাজ হয়েছে।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ‘কোটা সংস্কার চাই’ ফেসবুক গ্রুপের যাত্রা। এ গ্রুপে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে অনেক সময় ইমারজেন্সি রক্ত ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। অর্থের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারা গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করা হয়।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম নেতা মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন বলেন, ‘বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীরা অনেক সময় টাকার অভাবে ভর্তি হতে পারে না। এক্ষেত্রে তারা আমাদের সহযোগিতা চায়। আমরা আমাদের ‘কোটা সংস্কার চাই’ গ্রুপের মাধ্যমে এ সেশনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপক্ষে ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীর ভর্তির ব্যবস্থা করেছি। অনেক সময় দেখা গেছে এ ধরণের শিক্ষার্থীদের সাহায্য করতে প্রবাসীরা যোগাযোগ করে। তারা ভর্তির দায়িত্ব নেয়। ’
সম্প্রতি তিনি বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিউশনি পেতে সাহায্য করার জন্য ‘টিউশন সেবা’ নামে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার সদস্যের একটি ফেসবুক গ্রুপ গড়ে তুলেছেন। এর মাধ্যমে গ্রাম থেকে শহরে আসা শিক্ষার্থীদের টিউশনি পেতে বিভিন্নভাবে সাহায্য করছেন তিনি।
তাঁর মতে, ‘বিভিন্ন টিউশন মিডিয়া টিউশন দেয়ার নাম করে শিক্ষার্থীদের থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের প্রতারণার জালে আটকা পড়ে অনেক শিক্ষার্থীর মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। আমরা তাদের এ জালিয়াতির মূল উৎপাটন করতে সম্পূর্ন ফ্রিতে শিক্ষার্থীদের সাহায্য করে যাচ্ছি। এতে শিক্ষার্থীরা যেভাবে উপকৃত হচ্ছে পাশাপাশি উপকৃত হচ্ছেন অভিভাবকরাও।’
শুধু রাশেদ খাঁন আর কোটা সংস্কার গ্রুপই নয়। এধরণের বড় ছোট বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমে তরুণ সমাজ যুক্ত হচ্ছে সামাজিক সহযোগিতামূলক কাজে। টিউশনী ব্যবস্থা, বন্যার্তদের সহযোগিতা, গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীর ভর্তি সহায়তা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার জন্য শ্রুতিলেখক ব্যবস্থা সবই হচ্ছে ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করে ‘ফিজিক্যালী চ্যালেঞ্জড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন’ নামের সংগঠন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার শ্রুতিলেখক সংগ্রহ করে দেয়া এ সংগঠনের কাজের একটি বড় অংশ।
কিভাবে শ্রুতিলেখক সংগ্রহ করা হয় তা নিয়ে সংগঠনটির ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক মিসবাহ শাহেদ ‘দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে’ বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের সেচ্ছাসেবকরা শ্রুতিলেখক হিসেবে কাজ করে ও শ্রুতিলেখক সংগ্রহ করে দেয়। এক্ষেত্রে তারা পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জনপ্রিয় ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট দেই। ফেসবুক পোস্ট দেয়ার মাধ্যমে অনেক সময় সহজেই আমরা শ্রুতিলেখক সংগ্রহ করতে পারি।