এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালীন ইসলামী ব্যাংকে পরীক্ষা ছাড়াই ৮৫৪২ নিয়োগ

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৪ PM
এস আলম

এস আলম © টিডিসি সম্পাদিত

এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা কালীন সময়ে ইসলামী ব্যাংকে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই ৮ হাজার ৫৪২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল শুধু জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি সংগ্রহের মাধ্যমে। এ সময়ে ব্যাংকটিতে মোট ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে ছাঁটাই প্রক্রিয়া যাচাই করতে চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফুজ্জামানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগ পাওয়া ৮ হাজার ৫৪২ জনের মধ্যে ৮ হাজার ৯৯ জনই চট্টগ্রাম জেলার। তাদের মধ্যে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন ৫ হাজার ১৪৮ জন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম মাসুদের (এস আলম) পটিয়ার গ্রামের বাড়ি এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জের অফিসে সিভি জমা দেওয়ার জন্য বাক্স রাখা হতো। এসব বাক্সে পটিয়া জেনারেল, পটিয়া ক্যাশ, পুরুষ জেনারেল-সাতকানিয়া-লোহাগাড়া, পুরুষ ক্যাশ-গণ্ডামারা-বাঁশখালী, সনাতন জেনারেল, মহিলা ক্যাশ, পিয়ন-ডিপ্লোমা, পুরুষ জেনারেল ও পুরুষ ক্যাশসহ বিভিন্ন পরিচিতি লেখা থাকত।

যেসব পদে বেশি নিয়োগ
ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হয়। এরপর যোগ্য প্রার্থীদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার কথা। পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়াকে ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করার বিধান রয়েছে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব নিয়ম অনুসরণ না করেই ব্যাংকের ২৭টি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এর মধ্যে ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) পদে ২ হাজার ৭৮৯ জন এবং ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার পদে ২ হাজার ১৬০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া মেসেঞ্জার কাম গার্ড পদে ১ হাজার ৫৪৪ জন, রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিম (আরডিএস) প্রকল্পে ৯১৫ জন এবং ট্রেইনি জুনিয়র অফিসার পদে ৫০১ জন নিয়োগ পান।

উচ্চপর্যায়েও বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নিয়োগের তথ্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এতে দুজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), আটজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), দুজন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসইভিপি) এবং ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের একজন প্রিন্সিপাল নিয়োগ পান। পাঁচজন এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্টের (ইভিপি) মধ্যে চারজনের নিয়োগও বিজ্ঞপ্তি ছাড়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ডিএমডি হতে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা এবং পূর্ববর্তী পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এস আলমের পিএস আকিজ উদ্দিনকে আট বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতায় এবং মিফতাহ উদ্দীনকে ১৭ বছরের অভিজ্ঞতায় ডিএমডি করা হয়।

আরও দেখুন: আপনি কি সিঙ্গেল? তাহলে আজকের দিনটি আপনারই জন্য

কোন জেলা থেকে কত নিয়োগ
পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগ পাওয়া ৮ হাজার ৫৪২ জনের মধ্যে চট্টগ্রাম থেকেই নেওয়া হয় ৮ হাজার ৯৯ জন। এরপর কক্সবাজার থেকে ৩৯৮ জন, কুমিল্লা থেকে ১১৪, ময়মনসিংহ থেকে ৯৯, বগুড়া থেকে ৯৭ এবং ঢাকা থেকে ৯৬ জন নিয়োগ পান।

এ ছাড়া রাজশাহী থেকে ৮৩, যশোর থেকে ৭৮, গাইবান্ধা থেকে ৭৫ এবং রংপুর থেকে ৬৬ জন নিয়োগ পান। অন্য ৫৪ জেলা থেকে নিয়োগ দেওয়া হয় ১ হাজার ৬২৭ জনকে।

বছরভিত্তিক হিসাবে, ২০১৭ সালে ৩৬৭ জন, ২০১৮ সালে ১ হাজার ১১৮, ২০১৯ সালে ২ হাজার ৪৬৭, ২০২০ সালে ২ হাজার ১১০, ২০২১ সালে ৮৬৫, ২০২২ সালে ২ হাজার ১১৯, ২০২৩ সালে ৩৯৭ এবং ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩৯২ জন নিয়োগ পান।

২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের মোট কর্মী ছিল ২১ হাজার ৫৫১ জন। এর মধ্যে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হয় ১০ হাজার ৮৩২ জনকে।

১০ কর্মকর্তার বক্তব্যেও একই তথ্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া বর্তমানে ঢাকায় কর্মরত ১০ কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্য নেয়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা এস আলমের পটিয়ার বাড়ি ও আসাদগঞ্জ অফিসে রাখা বাক্সে জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছিলেন। সেখানেই তাদের মৌখিক পরীক্ষা এবং যোগদানপত্র দেওয়া হয়। ১০ জনের মধ্যে দুজনের মৌখিক পরীক্ষাও নেওয়া হয়নি।

পরে যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ পরিদর্শন এবং চারটি বহির্নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ নিরীক্ষায় ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগে অনিয়ম চিহ্নিত হয়। এরপর ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ।

পরীক্ষা বন্ধের দাবিতে ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট দুই কর্মী হাইকোর্টে রিট করেন। ২৭ আগস্ট আদালত বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেন। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, মূল্যায়ন পরীক্ষা নিতে বাধা নেই। ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামী ব্যাংক ওই পরীক্ষা আয়োজন করে।

প্রাথমিকভাবে পরীক্ষার জন্য ৫ হাজার ৩৭৩ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং সবাই চাকরিতে বহাল আছেন। অন্যদিকে ৪ হাজার ৯৭১ জন পরীক্ষা দেননি। বিভিন্ন কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা আরও ২৮৭ জনকে পরে তালিকায় যুক্ত করা হয়।

পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ৪ হাজার ৬৮৫ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ৪৪০ জন চট্টগ্রামের, ১৫৫ জন কক্সবাজারের, ১০ জন ঢাকার এবং অন্য ৬১ জেলার ৮০ জন। এ ছাড়া পাঁচজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। বিভিন্ন অভিযোগে ১২১ জন, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নবায়ন না করে ১ হাজার ১৯০ জন এবং অন্যান্য কারণে ১৩৬ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন গনমাধ্যমকে বলেন, ‘সব ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে নিয়োগ পাওয়াদের জন্য মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া হয়। যারা পরীক্ষায় অংশ নেননি, তাদের প্রথমে ওএসডি করা হয়। পরে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ছাঁটাই করা হয়েছে।’

প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগেও অনিয়ম
প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকের প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগেও নিয়ম না মানার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৪তম ব্যাচে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ১৯০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ১২ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই নিয়োগ পান। এ নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া চট্টগ্রাম থেকে সম্পন্ন হয়।

আরও দেখুন: এইচএসসি পাসেই চাকরি দেবে স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেড

ওই ব্যাচের জন্য ৮৪০ জনের সিভি প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে ৭৬৩ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। মাত্র ৩৬ জন ৫০ শতাংশের বেশি নম্বর পান। পরে শর্ত শিথিল করে ২০ শতাংশ নম্বর পাওয়া প্রার্থীদেরসহ ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হয়। তাদের মধ্যে ৩০৪ জন উত্তীর্ণ হন।

এরপর লিখিত পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া ১২ জনসহ ১৯০ জনকে ইসলামী ব্যাংকে এবং বাকি ১২৬ জনকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে পাঠানো হয়। তাদের সবাই চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা ছিলেন। ইসলামী ব্যাংকে পাঠানো ১৯০ জনের মধ্যে ১৮৪ জন যোগ দেন। বর্তমানে চাকরিতে আছেন ৩১ জন। অন্যদের মধ্যে ২১ জন পদত্যাগ করেছেন, ১৩১ জন চাকরি হারিয়েছেন এবং একজন মারা গেছেন।

তবে প্রবেশনারি অফিসারের ২৫তম ব্যাচের লিখিত পরীক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে নেওয়া হয়। লিখিত পরীক্ষায় ৫০ শতাংশের বেশি নম্বর পাওয়া ৯০৭ জনকে মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হয়। তাদের মধ্যে ৯৮ জন চট্টগ্রামের। এ ব্যাচে নিয়োগ পাওয়া ১৫০ জনের মধ্যে ৮৮ জন চট্টগ্রামের। এ সময় মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে ১৪৪ জন এবং ২০২৪ সালে ২০০ জন প্রবেশনারি অফিসার যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিয়োগ পেয়েছেন। ২০২৪ সালের ২০০ জনের মধ্যে চট্টগ্রামের ছিলেন ৩৬ জন।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই চুয়েটে যোগ দিতে চট্টগ্রামে ন…
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময় জানালেন উপাচার্য
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে সর্বনিম্ন বাসভাড়া ১০ টাকা
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাস-মিনিবাসের ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি, কোথায় কত বাড়ল দেখ…
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জ্বালানির দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ল: দায় কার, করণীয় কী?
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালীন ইসলামী ব্যাংকে পরীক্ষা ছাড়াই …
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬