প্রতীকী ছবি © এআই দিয়ে তৈরিকৃত ছবি
বিশ্ববাজারে শক্তিশালী ডলার, তেলের উচ্চ মূল্য এবং বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের চাপে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মুদ্রা রেকর্ড দুর্বলতার মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন নিজেদের দেশের বাজারের বাইরে পরিচালিত অফশোর বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ওপর নজরদারি বাড়াচ্ছে এশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো।
দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ মনে করছে, স্থানীয় অর্থনীতির দুর্বলতার পাশাপাশি বিদেশে পরিচালিত মুদ্রা-ভিত্তিক জল্পনাকল্পনাও তাদের মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন শুধু নিজ দেশের বাজার নয়, সিঙ্গাপুর, লন্ডন ও নিউইয়র্কের মতো বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্রগুলোতেও মুদ্রা লেনদেনের প্রভাব মোকাবিলায় সক্রিয় হচ্ছে।
সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় অফশোর কারেন্সি ডেরিভেটিভস বাজারে নজরদারি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। ফিলিপাইন ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে, যাতে নন-ডেলিভারেবল ফরোয়ার্ড (এনডিএফ) চুক্তি কেবল প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে ভারত ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা অবস্থানের সীমা কঠোর করে ১০০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে এনেছে।
সবচেয়ে আলোচনায় রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি অপ্রত্যাশিতভাবে সুদের হার বাড়ায় এবং জানিয়েছে, রুপিয়াহকে সমর্থন করার জন্য দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সারা বিশ্বে, দিনরাত’ মুদ্রা বাজারে সক্রিয় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়ায় জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, যার বড় ধাক্কা এসে পড়েছে এশিয়ার জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর উপর।
এরই মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়াহ প্রতি ডলারের বিপরীতে ১৮ হাজারের গুরুত্বপূর্ণ সীমা অতিক্রম করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ওন বিশ্ব আর্থিক সংকট-পরবর্তী সময়ের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। ভারতীয় রুপি ও ফিলিপাইনের পেসোও ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অফশোর ফরেক্স ট্রেডিং নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ কিছুটা স্বস্তি দিলেও শুধু এগুলো দিয়ে সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। এমইউএফজি ব্যাংকের সিনিয়র কারেন্সি বিশ্লেষক মাইকেল ওয়ানের ভাষায়, মুদ্রা স্থিতিশীল করতে হলে অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তিও শক্তিশালী করতে হবে।
আরও পড়ুন : বাজেটে বাড়তি বরাদ্দ ৫৫ হাজার কোটি টাকা, সুবিধা পাবেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-পেনশনভোগীরা
এনডিএফ বা নন-ডেলিভারেবল ফরোয়ার্ড হলো এমন এক ধরনের ডেরিভেটিভ চুক্তি, যা বিনিয়োগকারীদের স্থানীয় বাজারের বাইরে বসে কোনো দেশের মুদ্রার ভবিষ্যৎ মূল্য নিয়ে লেনদেনের সুযোগ দেয়। ডয়চে ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক দৈনিক প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের ফরেক্স বাজারের প্রায় ৪ শতাংশই এনডিএফভিত্তিক। তবে এশিয়ায় এর প্রভাব আরও বেশি, কারণ অনেক দেশের মুদ্রা পুরোপুরি অবাধে রূপান্তরযোগ্য নয়। এ কারণে সিঙ্গাপুর, লন্ডন কিংবা নিউইয়র্কে বসে হওয়া লেনদেনও স্থানীয় মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এ বাস্তবতা মাথায় রেখে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশ গত কয়েক বছরে স্থানীয় বাজারকে আরও উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ভারত ২০২০ সালে স্থানীয় ব্যাংকগুলোকে এনডিএফ বাজারে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয় এবং গুজরাটের গিফট সিটিকে আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। দক্ষিণ কোরিয়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ফরেক্স বাজার উন্মুক্ত করেছে এবং লেনদেনের সময় বাড়িয়েছে। থাইল্যান্ডও অনাবাসী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মুদ্রা হেজিং সহজ করেছে।
তবে সংকট যত গভীর হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে তত বেশি সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করেছে। দেশটির শর্ট ডলার পজিশন প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একইভাবে ইন্দোনেশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বিদেশি বাজারে ডলার বিক্রি করে রুপিয়াহকে সমর্থন দিয়েছে।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। কারণ ভারত, ইন্দোনেশিয়া, বা ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো মুদ্রার দুর্বলতার কারণে রপ্তানিতে বাড়তি সুবিধা পেলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত চাপের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে শক্তিশালী ডলার আমদানি ব্যয়ও বাড়িয়ে দেয়—ড. রুমানা হক, অধ্যাপক অর্থনীতি বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অর্থনীতিবিদদের মতে, মুদ্রার দুর্বলতার পেছনে কেবল অফশোর ট্রেডিং দায়ী নয়। ভারতের ক্ষেত্রে বড় কারণ হচ্ছে বিদেশি পুঁজির ধারাবাহিক বহির্গমন। চলতি বছরে দেশটির শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার তুলে নিয়েছে বৈশ্বিক তহবিলগুলো। ইন্দোনেশিয়ায় প্রেসিডেন্ট প্রাবোবো সুবিয়ান্তোর অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
ফিলিপাইনে উচ্চ তেলের দাম নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কোম্পানিগুলোর শেয়ারের উত্থান সত্ত্বেও ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত দেশটি থেকে ৭৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ বেরিয়ে গেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে চাপের বিষয়টি একেবারে নতুন নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুনে আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। পরে তা কমে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে প্রায় ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। তবে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক সহায়তা এবং মুদ্রাবাজারে বিভিন্ন সংস্কারের ফলে ২০২৫ সালের জুন শেষে রিজার্ভ আবার বেড়ে ২৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুন শেষে দেশের মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগে ছিল ২৬ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও রিজার্ভ পুনরুদ্ধারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও ডলারের শক্তিশালী অবস্থান বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ এখনও জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল ও খাদ্যপণ্যের বড় আমদানিকারক দেশ। ফলে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি বা আঞ্চলিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা বাড়লে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। একই কারণে ২০২৩ সালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ায় বাংলাদেশকে আইএমএফের সহায়তা কর্মসূচির আওতায় যেতে হয়েছিল।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। কারণ ভারত, ইন্দোনেশিয়া, বা ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো মুদ্রার দুর্বলতার কারণে রপ্তানিতে বাড়তি সুবিধা পেলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত চাপের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে শক্তিশালী ডলার আমদানি ব্যয়ও বাড়িয়ে দেয়।’
তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের ওপর এর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়বে। জ্বালানি আমদানির খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি পরিবহন, বিদ্যুৎ ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হতে পারে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশে ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’-এর একটি বড় উৎস। এছাড়া রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স একই হারে না বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ তৈরি হবে।’
ড. রুমানা হকের মতে, ‘এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজারকে সঠিক সংকেত দেওয়া। অতীতে আমরা দেখেছি, কৃত্রিমভাবে বিনিময় হার ধরে রাখার চেষ্টা করলে শেষ পর্যন্ত রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করা। বিনিময় হার, সুদের হার ও বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে নীতিগত সামঞ্জস্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নতুন করে বড় ধরনের হস্তক্ষেপের চেয়ে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বাজারভিত্তিক সমন্বয়কে কার্যকর করা বেশি প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।’
আরও পড়ুন : করের ক্ষেত্রে যে আটটি পরিবর্তন আসছে
এশিয়ায় নতুন ধরনের ‘মুদ্রাযুদ্ধ’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি ‘মুদ্রাযুদ্ধ’ শব্দটি ব্যবহারে কিছুটা সতর্ক থাকব, তবে প্রতিযোগিতামূলক অবমূল্যায়নের প্রবণতা যে বাড়ছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রতিযোগিতামূলক মুদ্রা অবমূল্যায়নের প্রবণতা বাড়লেও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো বাজারে আস্থাহীনতা তৈরি হওয়া। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে টাকার আরও অবমূল্যায়নের আশঙ্কা তৈরি হলে ডলারের চাহিদা বেড়ে বিনিময় হার ও রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।’
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের করণীয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, বিনিময় হারকে বাস্তব অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা। দ্বিতীয়ত, রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং রেমিট্যান্সের আনুষ্ঠানিক প্রবাহ বাড়ানো। তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা।’
তিনি আরও বলেন, ‘সব মিলিয়ে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মুদ্রার মান বড় চ্যালেঞ্জ ; মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক আস্থা ধরে রাখা। এগুলো ঠিক রাখতে পারলে বাইরের ধাক্কা মোকাবিলা করা সহজ হবে।’
প্রসঙ্গত, শক্তিশালী ডলার, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক পুঁজি প্রবাহের পরিবর্তনের কারণে এশিয়ার মুদ্রাবাজার বর্তমানে এক ধরনের নতুন ‘মুদ্রাযুদ্ধ’-এর মুখোমুখি। তবে এবার সেই যুদ্ধ দেশের ভেতরে নয়, বরং অফশোর আর্থিক কেন্দ্রগুলোতে বেশি তীব্র হয়ে উঠছে।