অভিযুক্ত পরিচালক-উপপরিচালক ও সহকারী পরিদর্শক © ফাইল ছবি
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের এমপিওভুক্তিকে কেন্দ্র ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) রংপুর অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর আমির আলী এবং উপপরিচালক মো. আনোয়ার পারভেজের বিরুদ্ধে । মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে জাল সনদধারীদের এমপিওভুক্তি, বিধি বহির্ভূত নিয়োগ এবং ঘুষের মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে অন্তত সোয়া কোটি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও পঞ্চগড়ের অন্তত ১০টি স্কুল ও কলেজে এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগের সাথে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, একাধিক ক্ষেত্রে এমপিও নীতিমালা-২০২১ লঙ্ঘন করা হয়েছে। এসব অনিয়ম খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কমিটিকে অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান মাউশির মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন উইংয়ের পরিচালক প্রফেসর কাজী মো. আবু কাইয়ুম শিশির দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে আগামী শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। আমরা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখব। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িত সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে।’
পরিচালকের স্বজনদের এমপিও ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা হওয়া অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা মডেল কলেজে ২০২৩ সালে নতুন এমপিওভুক্তির পর অধ্যক্ষ পদ নিয়ে তদন্ত চলমান থাকা অবস্থাতেই প্রতিষ্ঠানটির ১৩ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে এমপিওভুক্ত করা হয়। এমপিওভুক্ত হওয়া শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে মাউশির রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক প্রফেসর আমির আলীর মেয়ে আয়শা সিদ্দিকা এবং তার আপন ভাইয়ের ছেলে শাহীন আলমকে এমপিওভুক্ত করা হয়। এছাড়া বাকি ১১ জনকে এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে মোট ১১ লাখ টাকা নেওয়া ঘুষ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
একই জেলার বড়খাতা ডিগ্রি কলেজে লাইব্রেরিয়ান পদে চাকরি করা মোরশেদা ফারজানার জাল সনদ থাকা সত্ত্বেও তাকে এমপিওভুক্তির সুপারিশ করা হয়। মোরশেদা ফারজানাকে এমপিও পাইয়ে দিতে ৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মোরশেদা ফারজানার ব্যবহৃত নাম্বারে কল দেওয়া হলে তার ছেলে পরিচয় দিয়ে একজন ফোন রিসিভ করেন। তিনি বলেন, ‘মা-বাবা কিছুক্ষণ আগে বাসা থেকে বাইরে গেছেন। কখন ফিরবেন তা বলতে পারছি না।’ পরে তার বাবার নাম্বার নিয়ে সেই নাম্বারে কল দেওয়া হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
‘আমি ১০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানে শ্রম দিয়েছি। এরপর কলেজের অধ্যক্ষ এবং সভাপতি আমাকে এমপিওভুক্তির আবেদন করতে বলেন। নিয়ম মেনেই আবেদন করেছি। ১০ বছর পূর্তির নীতিমালা অনুযায়ী আমাকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে নীতিমালা লঙ্ঘন হয়েছে কি না সেটি আমার জানা নেই। মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে।’- প্রশান্ত কুমার, অনিয়মের এমপিপ্রাপ্ত শিক্ষক
সূত্র বলছে, লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার পাটগ্রাম মহিলা কলেজটি ২০২০ সালে ডিগ্রি পর্যায়ে এমপিও হয়। ডিগ্রি পর্যায়ে তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান প্রশান্ত কুমার। তবে ওই সময় ডিগ্রি তৃতীয় শিক্ষকের এমপিওভুক্তির কোনো বিধান ছিল না। তবে কলেজের অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান নীলুর মাধ্যমে ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে এমপিও নীতিমালা লঙ্ঘন করে তৃতীয় শিক্ষক সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রশান্ত কুমারকে এমপিওভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে।
জানতে চাইলে প্রশান্ত কুমার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমি ১০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানে শ্রম দিয়েছি। এরপর কলেজের অধ্যক্ষ এবং সভাপতি আমাকে এমপিওভুক্তির আবেদন করতে বলেন। নিয়ম মেনেই আবেদন করেছি। ১০ বছর পূর্তির নীতিমালা অনুযায়ী আমাকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে নীতিমালা লঙ্ঘন হয়েছে কি না সেটি আমার জানা নেই। মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে।’ ২০২১ সালের নীতিমালা অনুযায়ী ডিগ্রি তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সুযোগ নেই। এরপরও কীভাবে হলেন? এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি প্রশান্ত কুমার।
বিধি ভেঙে বকেয়া উত্তোলন, ল্যাব ছাড়াই ল্যাব সহকারী
লালমনিরহাট সদরের শহীদ আবুল কাশেম মহাবিদ্যালয়ের ইসলাম শিক্ষার প্রভাষক মো. রফিকুল ইসলাম ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়োগ পান। যদিও তিনি ২০০৮ সালে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) সনদ অর্জন করেন। অর্থাৎ সনদ অর্জনের পূর্বেই তাকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। সনদ অর্জনের পূর্বেই চাকরি হওয়ায় তার এমপিও আবেদন একাধিকবার রিজেক্ট করেছে মাউশি। পরবর্তীতে রংপুর অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর আমির আলীর সহায়তা এমপিওভুক্ত হন রফিকুল ইসলাম। এই কাজে ৭ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পরিচালক ও উপপরিচালকের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়; একই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের প্রভাষক সুশান্ত কুমার দাশের বিষয়টি ডিগ্রি পর্যায়ে অধিভুক্তি হয় ২০২৪ সালে। তিনি এমপিওভুক্ত হয়েছেন ২০২৫ সালে। তাকে ২০১৬ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৩ লাখ টাকা বকেয়া উত্তোলনে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে পরিচালক এবং উপপরিচালকের বিরুদ্ধে। এ কাজে ৪ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইসলাম শিক্ষার প্রভাষক মো. রফিকুল ইসলামের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিযোগের তথ্য বলছে, কুড়িগ্রামের কুটির চর স্কুল অ্যান্ড কলেজে কোনো ল্যাব নেই। এরপরও মো. তাজুল ইসলাম, মোছা. ফাতেমা খাতুন, মো. জামিল হায়দার, নারগিম খাতুন এবং মোছা. মাহমুদা খাতুনকে ল্যাব অ্যাসিসটেন্ট পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ল্যাব থাকলে সর্বোচ্চ তিনজনকে নিয়োগ দেওয়া যাবে। তবে বিধি ভেঙে ৩ জনের জায়গায় ৫ জন ল্যাব সহকারীকে এমপিওভুক্ত করা হয়। এতে অধ্যক্ষ ও পরিচালকের মধ্যে ৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে কুটির চর স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী আমরা চারজন ল্যাব সহকারী প্রাপ্য। মো. তাজুল ইসলামকে ল্যাব সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও তাকে দিয়ে ইংরেজি ক্লাস নেওয়ানো হচ্ছে। চারজের প্রাপ্যতা থাকলেও পাঁচজনকে এমপিওভুক্ত করলেন কীভাবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অডিট আপত্তি আসলে অডিটকে জবাব দেব। এছাড়া ডিগ্রি স্তরের আবেদন করেছি। এটা অনুমোদন হলে তখন ওই নিয়োগকে বৈধ করে নেব।’
নীলফামারীর চড়াইখোলা স্কুল অ্যান্ড কলেজে তিনজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী এবং একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর রয়েছে। কম্পিউটার অপারেটর এমপিওভুক্ত থাকা সত্ত্বেও রংপুর অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর আমির আলী বিধিবহির্ভূতভাবে মোছা. হিরা আক্তার নামে একজনকে কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগ দেন। প্যাটার্ন বহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ দিয়ে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রফেসর আমির আলীর বিরুদ্ধে।
ডিগ্রি ও বিএসসি কোর্স ছাড়াই এমপিও
কুড়িগ্রামের ভোগডাঙ্গা মডেল কলেজে শিক্ষার্থী ও বিষয় অনুমোদন না থাকলেও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রভাষক মো. মমিনুল ইসলামকে ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে এমপিওভুক্ত করেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। এই কাজের সাথে কলেজের অধ্যক্ষ মো. দবির উদ্দিনও জড়িত বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার সাকোয়া ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মোছা. দিলরুবা ফেরদৌসি এবং দিতি রাণী রায় তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। বর্তমান অধ্যক্ষ মো. জয়নাল আবেদনী তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে এই দুইজনকে এমপিওভুক্তি করতে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে প্রফেসর আমির আলী ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে এই দুই শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বেলকা ডিগ্রি কলেজটি ডিগ্রি পর্যায়ে এমপিওভুক্ত। ওই কলেজে বিএসসি কোর্সটি অধিভুক্তি না হলেও বিএসসি পর্যায়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক মিনারা বেগমকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অর্থ রংপুর অঞ্চলের পরিচালক, উপপরিচালক এবং সেসিপের সহকারী পরিদর্শক মো. আরিফুল ইসলামের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জাল সনদ জেনেও এমপিও অনুমোদন
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের জামেনা রওশন আরা মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. ইশতিয়াক আহমেদ জুয়েলের সনদ জাল হলেও তাকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সূত্র বলছে, কলেজটি ২০২২ সালে এমপিওভুক্ত হয়। এরপর কলেজের সব শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্ত হলেও অধ্যক্ষ ইশতিয়াক আহমেদের এমপিওর ফাইল রিজেক্ট করা হয়। এর কারণ হিসেবে তিনি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটধারী বলে উল্লেখ করা হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট টাকা দিয়ে কিনেছেন বলে সূত্রের দাবি।
দারুল ইহসানের সনদ দিয়ে এমপিওভুক্তি অবৈধ হলেও রংপুর অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর আমির আলীর জাদুতে অবৈধ সনদ নিয়েও এমপিওভুক্ত হন ইশতিয়াক আহমেদ। শুধু তাই নয়, প্রায় ১০ লাখ টাকা বকেয়া পেতেও সহযোগিতা করেন পরিচালক। এ কাজে ১৪ লাখ ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে আমির আলীর বিরুদ্ধে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইশতিয়াক আহমেদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে রংপুর অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর আমির আলী ও উপ-পরিচালক মো. আনোয়ার পারভেজের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। পরে মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সদুত্তর মেলেনি।
আরেক অভিযুক্ত রংপুর অঞ্চলের সহকারী পরিদর্শক মো. আরিফুল ইসলাম নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘রংপুর অঞ্চলের সাবেক দুই সহকর্মী মেহেদী হাসান ও আব্দুল মালেক নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অনিয়মের কারণে তাদের সরিয়ে দেওয়া হলে ক্ষিপ্ত হয়ে তারাই আমাদের সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা করছেন। আমাদের পরিচালক এবং উপপরিচালক খুবই ভালো মানুষ। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোও ভিত্তিহীন।’