ইমরুল কায়েস © সংগৃহীত
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাটিতে ত্রিদেশীয় সিরিজে ছন্নছাড়া বাংলাদেশকে দেখে অন্য অনেকের মতোই হতাশ হয়েছেন সাবেক ওপেনার ইমরুল কায়েস। বুধবার (২১ অক্টোবর) ম্যাচ চলাকালে দল নির্বাচন ও পারফরম্যান্স নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তিনি। এবার আরও খোলামেলা কথা বললেন সাবেক এই ক্রিকেটার।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া দীর্ঘ স্ট্যাটাসে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, দল নির্বাচন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিয়ে নিজের হতাশা ও পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরেছেন ইমরুল। তার মতে, ২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট প্রত্যাশা অনুযায়ী ধারাবাহিক উন্নতি করতে পারেনি, বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স নিয়ে নিজের হতাশা প্রকাশ করে ইমরুল লেখেন, “সত্যি বলতে, বাংলাদেশের খেলা দেখে আমি ভীষণ মর্মাহত হয়েছি। ব্যস্ততার কারণে সব সময় খেলা দেখার সুযোগ হয় না। কিন্তু গতকাল অনেক আশা নিয়ে বাংলাদেশের ম্যাচটি দেখতে বসেছিলাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দলের পারফরম্যান্স দেখে আমার মনে হয়েছে, আমরা যেন আবার সেই ২০০৬–২০০৮ সালের বাংলাদেশ ক্রিকেটের জায়গাতেই ফিরে গেছি। এত বছর পরও যদি আমাদের একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাহলে আমাদের উন্নতির পথটা আসলে কোথায়?”
নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়েও কথা বলেছেন সাবেক এই ওপেনার। তিনি লেখেন, “অনেকেই হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, আমি নিজে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য কী করেছি? হ্যাঁ, আমি স্বীকার করি, আমার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারে হয়তো খুব বড় কোনো অর্জন নেই। হয়তো অনেকের মতো বড় নাম বা তারকাখ্যাতিও অর্জন করতে পারিনি। কিন্তু নিজের জায়গা থেকে আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে দেওয়ার জন্য আমি আমার সর্বোচ্চটা চেষ্টা করেছি। অনেক বাধা, প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দেশের জন্য নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। মাঝেমধ্যে মনে হয়, বর্তমান প্রজন্মের ক্রিকেটারদের মতো যদি আমরাও আরও বেশি স্বাধীনতা, সুযোগ-সুবিধা এবং নিজেদের মেলে ধরার পরিবেশ পেতাম, তাহলে হয়তো আমার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারও অন্য রকম হতে পারত।”
বাংলাদেশ ক্রিকেটে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবকে বড় সমস্যা মনে করেন ইমরুল। তার ভাষ্য, “আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হলো, ২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট প্রত্যাশা অনুযায়ী ধারাবাহিক উন্নতি করতে পারেনি, বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে। আমার মনে হয়, এর অন্যতম বড় কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব, দল গঠনে ধারাবাহিকতা না থাকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা ইগোর প্রভাব থাকার আশঙ্কা। কে দলে থাকবে, কে বাদ পড়বে, কাকে সুযোগ দেওয়া হবে—এসব সিদ্ধান্ত যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক ফলাফল কিংবা ব্যক্তিগত বিবেচনার ওপর নির্ভর করে, তাহলে একটি শক্তিশালী দল গড়ে তোলা কঠিন।”
বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্ট সামনে রেখে অন্তত ৪ বছরের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন ইমরুল। তিনি লেখেন, “একটি আন্তর্জাতিক দলকে বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টের জন্য প্রস্তুত করতে হলে অন্তত চার বছরের একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে খেলোয়াড় নির্বাচন, ব্যাটিং অর্ডার, দলের কম্বিনেশন, নির্দিষ্ট খেলোয়াড়দের দায়িত্ব এবং চাপের মধ্যে খেলার প্রস্তুতি—সবকিছু ধাপে ধাপে গড়ে তুলতে হয়।
কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে প্রায়ই মনে হয়, প্রতিটি সিরিজের ফলাফলই সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। একটি সিরিজ জেতার জন্য আমরা হয়তো কিছু পরিবর্তন আনি, কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি, সাময়িক সাফল্যও পাই। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে একটি সুসংগঠিত, আত্মবিশ্বাসী ও ভারসাম্যপূর্ণ দল গড়ে তোলার কাজটি পিছিয়ে পড়ে।”
বাংলাদেশের ২০১৫ সালের দলকে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন ইমরুল কায়েস। তার মতে, দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে খেললে দলের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সমন্বয় ও আস্থা তৈরি হয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, “আমার কাছে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ দল একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সেই দলটির মধ্যে একটি শক্তিশালী সমন্বয়, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং দল হিসেবে খেলার মানসিকতা ছিল। খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল, প্রত্যেকেই নিজের ভূমিকা সম্পর্কে জানত এবং দলটির একটি নির্দিষ্ট পরিচয় ছিল। আমার বিশ্বাস, দীর্ঘ সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে দলকে খেলানোর ফলেই এই ধরনের বোঝাপড়া ও বন্ধন তৈরি হয়।
একটি দল শুধু ১১ জন ভালো ক্রিকেটারের সমষ্টি নয়; একটি দল অনেকটা পরিবারের মতো। সেই পরিবারে বিশ্বাস, বোঝাপড়া, দায়িত্ববোধ এবং একে অপরের প্রতি আস্থা থাকতে হয়। বারবার পরিবর্তন, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ঘন ঘন খেলোয়াড় অদলবদল করতে থাকলে সেই বন্ধন ও ধারাবাহিকতা তৈরি করা কঠিন হয়ে যায়।”
বিশ্বকাপের মাত্র এক মাস আগে নতুন খেলোয়াড় দলে অন্তর্ভুক্ত করে তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স আশা করার বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ইমরুল। তিনি বলেন, “বিশ্বকাপের মাত্র এক মাস আগে নতুন একজন খেলোয়াড়কে দলে অন্তর্ভুক্ত করে তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স আশা করা কতটা বাস্তবসম্মত? অবশ্যই কোনো খেলোয়াড় অসাধারণ ফর্মে থাকলে বা বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিলে নতুন কাউকে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেটি যেন পরিকল্পনার অংশ হয়, হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের ফল না হয়।”
বিশ্বের সফল দলগুলোর প্রস্তুতির উদাহরণ টেনে তিনি আরও লেখেন, “বিশ্বের সফল ক্রিকেট দলগুলো সাধারণত বড় টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নেয়। খেলোয়াড়দের নির্দিষ্ট ভূমিকা দেওয়া হয়, ব্যাটিং অর্ডার ও দলের কম্বিনেশন নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করা হয় এবং খেলোয়াড়দের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয় নিজেদের দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার জন্য।
অথচ আমাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় মনে হয়, বিশ্বকাপের প্রস্তুতির চেয়েও তাৎক্ষণিক ফলাফল, নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা কিংবা ব্যর্থতার দায় এড়ানোর বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। যদি সত্যিই এমনটা হয়ে থাকে, তাহলে এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।”
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, নির্বাচক ও দল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের প্রতি ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের ক্রিকেটের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইমরুল।
তিনি লেখেন, “আমাদের ক্রিকেটে ব্যক্তির চেয়ে দলকে বড় করে দেখতে হবে। যারা বোর্ডে দায়িত্ব পালন করেন, যারা নির্বাচক হিসেবে কাজ করেন কিংবা যারা দল পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন, তাদের সবার কাছে আমার বিনীত অনুরোধ—নিজেদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, মতের পার্থক্য কিংবা ইগোর ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বার্থকে সবার আগে রাখুন। কারণ, কোনো ব্যক্তি বা পদ স্থায়ী নয়; কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট আমাদের সবার।”
বাংলাদেশের জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে পরাজয়ের প্রসঙ্গ তুলে নিজের কষ্টের কথাও জানিয়েছেন সাবেক এই ক্রিকেটার। তিনি লেখেন, “আর একটা কথা বলতে চাই। বাংলাদেশ জিম্বাবুয়ের কাছে হারলে আমার কষ্ট হয়, কিন্তু সেই কষ্টের চেয়েও বেশি হতাশ হই যখন দেখি বাংলাদেশ আফগানিস্তানের মতো দলের বিপক্ষে হেরে যায়। এর অর্থ এই নয় যে আফগানিস্তান ভালো ক্রিকেট খেলতে পারে না। অবশ্যই পারে, এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাদের অগ্রগতিকে আমি সম্মান করি।
কিন্তু একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত একজন মানুষ হিসেবে, যখন দেখি অন্য দেশের ক্রিকেটাররা বাংলাদেশকে নিয়ে অসম্মানজনক মন্তব্য করার সুযোগ পায়, তখন নিজের ভেতরে একটা কষ্ট অনুভব করি। কারণ, বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে আমার আবেগ, আত্মসম্মান এবং জীবনের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে।”
বাংলাদেশ দলের কাছে নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে ইমরুল লেখেন, “আমি বাংলাদেশ ক্রিকেটের কাছে খুব বেশি কিছু চাই না। আমি শুধু চাই, বাংলাদেশ দল ভালো ক্রিকেট খেলুক, নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে লড়াই করুক এবং বিশ্বমঞ্চে এমন পারফরম্যান্স করুক, যা দেখে আমরা গর্ব করে বলতে পারি— ‘এটা আমার দেশ, এটা আমার বাংলাদেশ। এই ক্রিকেটের সঙ্গে আমিও একসময় যুক্ত ছিলাম। বাংলাদেশের ক্রিকেটের অংশ হতে পেরেছি—এটাই আমার গর্ব, এটাই আমার সার্থকতা।’
আমরা সবাই চাই বাংলাদেশ জিতুক। কিন্তু শুধু একটি ম্যাচ বা একটি সিরিজ জেতাই যেন আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য না হয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি শক্তিশালী দল গড়ে তোলা, যারা ধারাবাহিকভাবে ভালো ক্রিকেট খেলবে এবং বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দেবে।”
নিজের বক্তব্যের উদ্দেশ ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, কাউকে ছোট করা কিংবা কারও বিরুদ্ধে কথা বলা তার উদ্দেশ্য নয়। বরং নিজের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা থেকেই কথাগুলো বলেছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে ইমরুল লেখেন, “আমি জানি, আমার কথার সঙ্গে অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে। আমার কোনো বক্তব্যে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে দয়া করে ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না। আমি কাউকে ছোট করার জন্য কিংবা কারও বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য এসব বলিনি। একজন ক্রিকেটার হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা, নিজের উপলব্ধি এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই কথাগুলো বলেছি। সমালোচনা করার উদ্দেশ কাউকে আঘাত করা নয়; বরং আমার বিশ্বাস, গঠনমূলক সমালোচনা থেকেই পরিবর্তনের পথ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য আমার ভালোবাসা, আবেগ এবং শুভকামনা সব সময় ছিল, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। আশা করি, একদিন আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দল দেখব, যাদের পারফরম্যান্স নিয়ে শুধু হতাশা নয়, বুকভরা গর্ব নিয়ে কথা বলতে পারব। বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য রইল আমার আন্তরিক শুভকামনা।”