শ্রমিক নাকি পার্টনার, বাংলাদেশে গিগ কর্মীদের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন কেন?

০১ মে ২০২৬, ১১:১৯ AM
একজন ফুড ডেলিভারিম্যান

একজন ফুড ডেলিভারিম্যান © সংগৃহীত

কেউ খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন, কেউ করছেন রাইড শেয়ার। আবার অনেকে ঘরে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছেন বৈশ্বিক শ্রমবাজারে।

ইন্টারনেটের কল্যাণে বিশ্বজুড়ে অ্যাপনির্ভর এক বিশাল শ্রমবাজার গড়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে যার পরিচয় গিগ মার্কেট হিসেবে। আর এই সেক্টরে কর্মরতদের বলা হয় গিগ কর্মী।

বাংলাদেশেও গত এক যুগে এই ধরণের একটি বড় শ্রমখাত তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় থেকেই এই বাজারে যুক্ত হয়েছেন দেশের বেকার জনগোষ্ঠির একটি বড় অংশ।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আই সোশ্যাল এর গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে সাড়ে ছয় লক্ষ টেকনিক্যাল এবং প্রায় দুই লক্ষ নন টেকনিক্যাল মিলিয়ে এই খাতে অন্তত সাড়ে আট লাখ কর্মী কাজ করছেন।

গিগ কর্মী মূলত তারাই যারা ইন্টারনেট অ্যাপের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দক্ষতা অনুযায়ী চুক্তিভিত্তিক কাজে নিয়োজিত হয়ে নির্দিষ্ট কাজের কমিশনের ভিত্তিতে অর্থ উপার্জন করেন- অর্থাৎ যত কাজ তত টাকা, কাজ নেই টাকা নেই।

প্রযুক্তিনির্ভর এই খাতে কাজের সুযোগ বাড়লেও শ্রমিকের আইনি ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।

দিনের পর দিন শ্রম দিয়ে গেলেও এই খাতের কর্মীদের শ্রমিক হিসেবে এখনও স্বীকার করেনি বাংলাদেশের শ্রম আইন। ফলে শ্রমিকের অধিকার রক্ষা এবং আইনি সুরক্ষার বিষয়ে অনিশ্চয়তায় তারা।

আইন বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলছেন, গিগ কর্মীরা একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নির্দিষ্ট কাজের চুক্তিতে যুক্ত হওয়ায় তারা শ্রমিক নন বরং পার্টনার হিসেবেই গণ্য হন। যা তাদেরকে নানা অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে বলেই মত তাদের।

যদিও চাকরির মতো বাধ্যবাধকতা না থাকায় ইন্টারনেটের এই যুগে পৃথিবী জুড়েই জনপ্রিয় হচ্ছে গিগ মার্কেট।

ঢাকার একটি ফ্রিল্যান্স প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আসসালাতুজ্জামান বলছেন, নিয়মিত কর্মীদের মতো সুযোগসুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন না থাকায় এই মডেলে আগ্রহ বাড়ছে অনেক নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের।

"আপনি যখন একজন স্থায়ী কর্মী নিয়োগ করবেন তার জন্য অনেক দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে, এছাড়া একটা কাজের জন্য আপনার পুরো মাসের জন্য একজন কর্মী নেওয়ার দরকার নেই। এটা নিয়োগদাতার জন্যও সুবিধা," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

গিগ কর্মীদের যত অভিযোগ

গিগ মার্কেটে নন-টেকনিক্যাল যেমন- পণ্য ডেলিভারি বা রাইড শেয়ারিং কর্মীরা যে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে কাজ করছেন তেমনি টেকনিক্যাল কর্মীরা- অর্থাৎ গ্রাফিক্স ডিজাইনার, অ্যাপ ডেভলপার নিজেদের দক্ষতা দিয়ে যুক্ত হচ্ছেন আন্তর্জাতিক বাজারে।

শ্রম ঘন বাংলাদেশে বেকার সমস্যা প্রকট হওয়ায় ইন্টারনেট ভিত্তিক ওপেন মার্কেটে নিজের দক্ষতা অনুযায়ী কাজে যুক্ত হয়েছেন অনেকে। বিশেষ করে ইচ্ছা অনুযায়ী কাজের স্বাধীনতা থাকায় গিগ মার্কেটে যুবকদের আগ্রহই বেশি।

এর মাধ্যমে অনেকে যেমন নির্দিষ্ট সময় কাজ করে অর্থ উপার্জন করছেন আবার অনেকে নিজের দক্ষতা বাড়িয়ে এই খাতকেই নিজের ভবিষ্যৎ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।

কিন্তু বাংলাদেশে এই শ্রমবাজার যখন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে তখন এই খাতের কর্মীদের নানা অভাব-অভিযোগও একে একে সামনে আসছে। তাদের দাবি, এসব নিয়ে বিস্তর আলোচনা হলেও সমাধান মিলছে না।

ঢাকার গুলশানে বিবিসি বাংলার কথা হয় অ্যাপভিত্তিক একটি পণ্য ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী হাবিবুর রহমানের সঙ্গে।

তিনি বলছেন, "আমাদের নিয়োগপত্র নেই, কোনো প্রমোশনও নেই, প্রতিষ্ঠান নিজেই সব ঠিক করে দেয়, কর্মী হিসেবে আমরা কাজ করি কমিশন পাই। কখনও কাজ থাকে কখনও থাকেনা।"

নানা অভিযোগ থাকলেও নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে এই শঙ্কায় সেসব নিয়ে মুখ খুলতে চাননা এই খাতের অনেক কর্মী।

সাইকেলের প্যাডেলে ভর দিয়ে গন্তব্যে ছুটছেন ডেলেভারি কর্মী মোহাম্মদ রাজ্জাক। ঢাকার অভিজাত গুলশান-বনানী এলাকায় অনলাইনে অর্ডার দেওয়া পণ্য মানুষের ঘরে পৌঁছে দেন সাতাশ বছর বয়সী এই যুবক।

বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, প্রতিদিন যতগুলো ডেলিভারি করবেন তার ভিত্তিতেই অর্থ উপার্জন। দিনে অন্তত ২০টি ডেলিভারি করতে পারলে মাসে আঠারো থেকে বিশ হাজার টাকা আয় করেন তিনি।

বাংলাদেশের শ্রম আইনে স্বীকৃতি না থাকায় গিগ কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা নেই। এমনকি চুক্তিভিত্তিক কর্মী হওয়ায় বেতন, ভাতা কিংবা পেনশনের সুবিধা নিয়েও বন্ধ আলোচনার সুযোগ।

অবশ্য কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান ইন্সুরেন্স সুবিধা দিতে কর্মীদের কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিয়মিত আয় থেকে কেটে নেন বলে জানান মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার চালক কামাল উদ্দিন।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "আমারা দূর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে কোম্পানি চিকিৎসার জন্য সহায়তা দিবে এই কারণে আমাদের আয় থেকে একটা অ্যামাউন্ট কেটে রাখে। কিন্তু কখনও কেউ এই টাকা পেয়েছে কিনা এটা আমি নিশ্চিত না।"

এদিকে গিগ মার্কেটের টেকনিক্যাল- অর্থাৎ গ্রাফিক্স ডিজাইন, অ্যাপ ডেভলপিং এর মতো কাজে যুক্ত কর্মীদের মূল সমস্যা সরকারি পৃষ্টপোষকতা এবং ইন্টারনেট নির্ভর অর্থনীতির অবকাঠামো নিয়ে।

টেকনিক্যাল গিগ কর্মীদের অভিযোগ, বিদেশিদের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে পেমেন্ট গেটওয়ে নিয়ে বড় ধরণের জটিলতায় পড়ছেন তারা।

এছাড়া ফ্রিল্যান্সার হিসেবে পরিচিত এই কর্মীদের সামাজিক স্বীকৃতির বিষয়টিও বড় চিন্তার জায়গা।

"মেধাশ্রম দিয়ে বৈশ্বিক বাজার থেকে ডলার আনছি আমরা কিন্তু কাজের স্বীকৃতি নেই বললেই চলে। এছাড়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক সময় ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয়," বলেও জানান ফ্রিল্যান্স কর্মী জিসান মাহমুদ।

সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন কেন?

বাংলাদেশে শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নতুন নয়। কম বেতন, শিশু শ্রমসহ নানা বিষয় নিয়ে নানা সময় আলোচনা হতে দেখা যায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় নানা আইন এবং নীতি প্রণয়ন করা হলেও তাদের অধিকার কতটা সুরক্ষা হয়েছে তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য ইন্টারনেট ভিত্তিক গিগ শ্রমবাজার অপেক্ষাকৃত নতুন হওয়ায় এই খাতের কর্মীদের অধিকার রক্ষার বিষয়টি নিয়ে বৃহৎ পরিসরে এখনও কাজ হয়নি বলেই মনে করেন তারা।

মূলত কাজের ধরণ বা চুক্তির কারণেই গিগ কর্মীরা শ্রম আইনের সুরক্ষার মধ্যে আসছে না বলেই মনে করেন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের বা এইচআরপিবি প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলছেন।

তিনি বলছেন, নিয়মিত চাকরি, নির্দিষ্ট বেতন আছে এমন ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি লেবার ক্যাটাগরিতে পড়বেন এবং সেক্ষেত্রে তার যেকোনো অভিযোগের প্রতিকার লেবার কোর্টে হবে। কিন্তু চুক্তিভিত্তিক হলে সেই আলোচনা ভিন্ন।

"আপনার সঙ্গে চুক্তি হলো যে প্রতিটি খাবার পৌঁছে দিবেন আপনাকে দশ টাকা করে দিবে বা মাইল হিসেবে দিবে এক্ষেত্রে ওই কর্মী আর লেবার কোর্টে পড়বে না," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

যদিও এক্ষেত্রে চুক্তি ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান মি. মোরসেদ।

"কোনো প্রতিষ্ঠান যদিও কন্ট্রাক্ট ভায়োলেশন করে তাহলে ভুক্তভোগি ব্যক্তি আদালতের মাধ্যমে লিগ্যাল অ্যাকশন নিতেই পারেন।"

এছাড়া চুক্তিভিত্তিক এসব কাজের ক্ষেত্রে একজন কর্মীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের হওয়া চুক্তির শর্ত এবং কমিশনের পরিমাণ যথার্থ হয়েছে কিনা সেই বিষয়ে সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারে।

গিগ কর্মীদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলছেন, গিগ কর্মীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতের বিষয়ে নানা আলোচনা থাকলেও এ নিয়ে সরকারিভাগে তেমন পদক্ষেপ নেই। যার ফলে পুরো সেক্টরই একরকম অগোছালো অবস্থায় রয়ে গেছে।

যদিও সংশোধিত শ্রম আইনে এই কর্মীদের সংগঠন করার সুযোগ রাখার বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন এই বিশ্লেষক।

তিনি বলছেন, দেশের বেকার জনগোষ্ঠির একটি বড় অংশ চাকরির বাজারে আসতে না পেরে গিগ মার্কেটে যোগ দিচ্ছেন। অথচ সেখানেও তাদেরকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

"তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নেই, তাদের দক্ষতা উন্নয়নে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেই। আবার যে কাজ তারা বেছে নিচ্ছে সেখানেও আইন তৈরি করে তাদেরকে সুরক্ষা দেওয়া যাবে না? তারা তো কোনো অর্থও বরাদ্দ চাচ্ছে না, শুধু আইন করে দিন," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. আহমেদ।

তারকা হল্যান্ডকে নিয়ে শক্তিশালী দল ঘোষণা নরওয়ের
  • ২২ মে ২০২৬
কিশোরীকে ধর্ষণ করে ভিডিও ভাইরাল, গ্রেপ্তার ৩, ধরা-ছোঁয়ার বা…
  • ২২ মে ২০২৬
এজলাসে এক আসামিকে গাঁজা-ইয়াবা সাপ্লাই আরেকজনের, দুজনকেই জেল…
  • ২২ মে ২০২৬
স্কুলে যাওয়ার টাকা না পেয়ে বাবার ওপর অভিমান, অষ্টম শ্রেণির …
  • ২২ মে ২০২৬
পরিচয় মিলেছে নিহতের, ১৭ বছর আগে অভিমানে ছেড়েছিলেন বাড়ি
  • ২১ মে ২০২৬
শিশু ধর্ষণে অভিযুক্তকে ‘আটক’ করতে পুলিশের গুলি, ২ সাংবাদিক …
  • ২১ মে ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
21 June, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081