ফাইল ছবি © সংগৃহীত
জানুয়ারি মাসে দেশে ৫৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৪৬ জন নিহত ও ১ হাজার ২০৪ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। একই সময়ে রেলপথে ৩৭টি দুর্ঘটনায় ৩৩ জন নিহত ও ২৮ জন আহত এবং নৌপথে ৮টি দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত, ৬ জন আহত ও ৩ জন নিখোঁজ হয়েছেন। ফলে সড়ক, রেল ও নৌ—এই তিন পথে মোট ৫৯৭টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৫৮৬ জনের এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৩৮ জন।
রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার সংবাদ মনিটরিং করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সময়ে ২০৯ টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২২৩ জন নিহত, ১৩২ জন আহত হয়েছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৭.৮৬ শতাংশ, নিহতের ৪০.৮৪ শতাংশ ও আহতের ১০.৯৬ শতাংশ। এই মাসে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে ঢাকা বিভাগে ১৩২ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত ও ৩২৮ জন আহত হয়েছে, সবচেয়ে কম সড়ক দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে সিলেট বিভাগে ২৯ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৮ জন নিহত ও ৬৩ জন আহত হয়েছে।
এতে বলা হয়, সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে ১৫ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১৩১ জন চালক, ৮৯ জন পথচারী, ৫৩ জন পরিবহন শ্রমিক, ৭৯ জন শিক্ষার্থী, ০৯ জন শিক্ষক, ৬২ জন নারী, ৬৭ জন শিশু, ০৪ জন চিকিৎসক, ০৪ জন সাংবাদিক, ০১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ১১ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় মিলেছে। এদের মধ্যে নিহত হয়েছে- ০২ জন পুলিশ সদস্য, ০২ জন সেনা সদস্য, ০১ জন নৌ বাহিনী সদস্য, ০৪ জন চিকিৎসক, ০১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১২৭ জন বিভিন্ন পরিবহনের চালক, ৮৯ জন পথচারী, ৫৪ জন নারী, ৪৮ জন শিশু, ৫৭ জন শিক্ষার্থী, ২১ জন পরিবহন শ্রমিক, ০৮ জন শিক্ষক ও ১১ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী।
এই সময় সড়ক দুর্ঘটনায় সংগঠিত ৮২৯ টি যানবাহনের পরিচয় মিলেছে। এতে দেখা যায়, ২৮.৪৬ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২৩.৬৪ শতাংশ ট্রাক-পিকাপ-কাভার্ডভ্যান ও লরি, ১৪.৩৫ শতাংশ বাস, ১৩.৬৩ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিক্সা ও ইজিবাইক, ৫.৫৪ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, ৯.০৪ শতাংশ নছিমন-করিমন-মাহিন্দ্রা-ট্রাক্টর ও লেগুনা, ৫.৩০ শতাংশ কার-জিপ-মাইক্রোবাস সড়কে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে।
সংগঠিত মোট দুর্ঘটনার ৪৮.৩৬ শতাংশ গাড়ি চাপা দেওয়ার ঘটনা, ২৮.৬২ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৬.৮৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে, ৫.৬১ শতাংশ বিবিধ কারনে, ০.১৮ চাকায় ওড়না পেছিয়ে এবং ০.৩৬ শতাংশ ট্রেন-যানবাহনের সংঘর্ষে ঘটে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই মাসে সংগঠিত মোট দুর্ঘটনার ৪২.৫৭ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ২৭.৮৯ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২৪.০৯ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়েছে। এছাড়াও সারা দেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৪.৫২ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ০.৫৪ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে ও ০.৩৬ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংগঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ মতে, জানুয়ারি মাসে সড়ক দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ :
সড়ক পরিবহন সেক্টর পরিচালনায় নীতি ও কৌশলগত দুর্বলতা; সারাদেশে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা সড়ক-মহাসড়কে অবাধে চলাচল; সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিক্সা, নসিমন-করিমন অবাধে চলাচল; জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং, সড়কবাতি না থাকায় হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন উঠে আসা; সড়কে মিডিয়ান বা রোড ডিভাইডার না থাকা, সড়কে গাছপালায় অন্ধবাঁেকর সৃষ্টি; মহাসড়কের নির্মাণ ক্রটি, যানবাহনের ক্রটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা; উল্টোপথে যানবাহন, সড়কে চাদাঁবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন; অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রীবহন ও বেপরোয়া যানবাহন চালানো এবং বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানো।
দুর্ঘটনার প্রতিরোধে সুপারিশসমূহ
সড়ক পরিবহন সেক্টর পরিচালনায় উন্নত বিশ্বের নীতি ও কৌশল অনুসরণ করা; দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহন, যানবাহনের ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিটনেস প্রদান; সিসি ক্যামরা পদ্ধতিতে ট্রাফিক আইনের প্রসিকিউশন পদ্ধতি চালু করা; গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে ফুটপাতসহ সার্ভিস লেইনের ব্যবস্থা করা; সড়কে চাদাঁবাজি বন্ধ করা, চালকের বেতন ও কর্মঘন্টা সুনিশ্চিত করা; মহাসড়কে ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা, রোড সাইন, রোড মার্কিং স্থাপন করা; সড়ক পরিবহন আইন উন্নত বিশ্বের আদলে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে প্রয়োগ করা; সারাদেশে উন্নতমানের আধুনিক বাস নেটওর্য়াক গড়ে তোলা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা; মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সুনিশ্চিত করা, নিয়মিত রোড সেইফটি অডিট করা; মেয়াদোর্ত্তীন গণপরিবহন ও দীর্ঘদিন যাবত ফিটনেসহীন যানবাহন স্ক্যাপ করার উদ্যোগ নেওয়া; ড্রাইভিং প্রশিক্ষন গ্রহনকারী চালকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ভ্যাট ও আয়কর অব্যাহতি দিতে হবে; মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিক্সা আমদানী ও নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ করা; সড়ক পরিবহন সেক্টর পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশী-বিদেশী দক্ষ ও অভিজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ লোকজনদের সমন্ময়ে একটি বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স গঠন করা।