সাক্ষাৎকার

বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন পূর্ণ হলো মেয়ের হাত ধরে, নুসরাত এখন সিভিল জজ

নুসরাত জাহান তানী

নুসরাত জাহান তানী © টিডিসি সম্পাদিত

১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এতে সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের ২০১৮-১৯...
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওয়াসিফ আল আবরার
আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০০ PM

১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এতে সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান তানী। প্রথমবার ভাইভায় অংশ নিয়েই বিজেএসের চূড়ান্ত ফলে সাফল্য অর্জন করে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছেন তিনি। দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, আইনের মৌলিক বিষয়ে দৃঢ় প্রস্তুতি ও নিয়মিত পড়াশোনার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত এ সাফল্য অর্জন করেন নুসরাত। দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, আইনের মৌলিক বিষয়ে দৃঢ় প্রস্তুতি, নিয়মিত পড়াশোনা এবং সঠিক কৌশলে পরীক্ষার প্রস্তুতি—এসবের সমন্বয়েই এসেছে তার এই সাফল্য।  

কুড়িগ্রামের নাজিরা ব্যাপারীপাড়ায় বেড়ে ওঠা নুসরাত ছোটবেলা থেকেই ছিলেন পড়াশোনায় মনোযোগী ও মেধাবী। সরকারি চাকরিজীবী বাবা-মায়ের ব্যস্ততার কারণে শৈশবের বড় একটি সময় কেটেছে বড় দাদি ও ফুপুর স্নেহ-সান্নিধ্যে। পরিবারের প্রত্যাশা ও বাবার অপূর্ণ স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয়েছিল তার বিচারক হওয়ার পথচলা।

বিচারক হওয়ার স্বপ্নের বীজ মূলত বপন হয় পরিবারের মধ্য থেকেই। নুসরাতের বাবা নিজেও বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তবে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি তিনি। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হওয়ায় সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। মেয়ের মাধ্যমে নিজের সেই স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশা ছিল তার। নুসরাত বলেন, তার বাবা প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে একাগ্রচিত্তে সমর্থন করেছেন। পরিবারের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা ছিলেন তার বড় দাদু, যিনি তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা ছিলেন। তার ইচ্ছা ছিল নুসরাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে বড় কর্মকর্তা হবেন। সেখান থেকেই বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি।

পরবর্তীতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান নুসরাত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বিচারক হওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম ও ত্যাগের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন ইমন ভাইয়ার কাছ থেকে, যিনি ১৫তম বিজেএস পরীক্ষায় বিচারক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।

প্রথমবার ভাইবা এমন সাফল্য বিষয়ে নুসরাত বলেন, জুডিশিয়ারির প্রস্তুতি শুরু করি ২০২১ সালের শেষভাগে। ১৭তম বিজেএস পরীক্ষার প্রিলিমিনারিতে কিছু ভুল-ত্রুটির কারণে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। তবে সেই ব্যর্থতা আমাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং পরবর্তী পরীক্ষার জন্য আরও পরিকল্পিতভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকি। এর পর ১৮তম বিজেএসের প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হয়ে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিই। এরপর প্রথমবারের মতো ভাইবায় অংশ নিয়েই চূড়ান্তভাবে সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হই।

সাফল্যের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, এটি তার জীবনে আল্লাহ প্রদত্ত সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। মহান আল্লাহর অশেষ রহমত ছাড়া কোনো কিছুই সম্ভব ছিল না বলে মনে করেন তিনি। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, ত্যাগ ও অপেক্ষার ফল হাতে পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের আনন্দের অশ্রু তাকে আবেগাপ্লুত করেছে।

নুসরাত বলেন, বিজেএস প্রস্তুতির পুরো সময়টা যে সবসময় সহজ ছিল, তা নয়। অনেক কঠিন ও বিষাদময় সময়ও পার করতে হয়েছে। তবে প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছি।

ইমন ভাইয়ার তত্ত্বাবধানে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পড়ার লক্ষ্য ঠিক করে তা পূরণের চেষ্টা করতেন। প্রতিদিন প্রায় ১০ ঘণ্টা পড়াশোনার টার্গেট রাখতেন। আগের দিনের পড়া একবার দেখে নিয়ে নতুন বিষয় শুরু করতেন। তিনি জানান, তবে একটি বিষয় কোনোভাবেই বাদ দিতাম না—গণিত অনুশীলন। নিয়মিত গণিত সমাধানের অভ্যাস চূড়ান্ত সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তিনি।

বিজেএস পরীক্ষার্থীদের গতানুগতিক শর্টকাট বইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে প্রথমে মৌলিক বিষয়গুলো পরিষ্কার করার পরামর্শ দিয়েছেন নুসরাত। তিনি বলেন, ছয় সেট আইন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা এবং নিজের মতো করে নোট তৈরি করা জরুরি। কারণ পরীক্ষার আগে সবকিছু নতুন করে পড়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। পাশাপাশি সাধারণ বিষয়গুলোও প্রতিদিন পড়তে হবে। বাংলা ও ইংরেজি গ্রামারের মৌলিক বিষয়গুলো ভালোভাবে আয়ত্তে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

বিজ্ঞান বিষয়ে যাদের ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, তাদের এ বিষয়ে বাড়তি যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নুসরাত। বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির প্রস্তুতির জন্য প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট সংবাদ দেখা বা পত্রিকা পড়ার অভ্যাসও উপকারী বলে মনে করেন তিনি। ভাইবার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে মূল আইনগুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি মনে করেন নুসরাত। তিনি বলেন, বিশেষ করে সংবিধান ও প্রাসঙ্গিক মামলাগুলো সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি সমসাময়িক বিষয়গুলো সম্পর্কেও নিয়মিত জ্ঞান রাখতে হবে।

ভাইবার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের গুরুত্বও তুলে ধরেছেন তিনি। নুসরাত বলেন, নিজের বা সহপাঠীদের সঙ্গে নিয়মিত অনুশীলন করলে ভাইবার কৌশল অনেকটাই আয়ত্ত করা সম্ভব। আমি নিজেও ভাইবার আগে মক ভাইবায় অংশ নিয়েছেন এবং অভিজ্ঞ সিনিয়রদের পরামর্শ নিয়েছিলাম।

আরও পড়ুন: শিক্ষাজীবনে কখনও সেকেন্ড হননি, বিসিএস ক্যাডার দুই বোনের পর বিচারক হলেন মাহিয়া মারইয়াম

বর্তমানে বিবাহিত নুসরাত জাহান তানী। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। তার স্বামী বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছিলেন তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। নুসরাতের প্রতি তার ছিল দৃঢ় আত্মবিশ্বাস। নুসরাত এবারই বিচারক হবেন এ বিশ্বাস তিনি সবসময় প্রকাশ করতেন। নুসরাতের পরিশ্রমের প্রতিও তার ছিল গভীর আস্থা।

নুসরাত বলেন, আমার এই সাফল্যের পেছনে বাবা-মা, স্বামী, পরিবারের সদস্য, শিক্ষক, সহপাঠী, সিনিয়র ও জুনিয়রদের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাদের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। প্রতিদিনের প্রার্থনায় মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি একটি বিষয়ই চেয়েছি যেন একজন ন্যায়বিচারক হতে পারি। বিচারক হিসেবে নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে দেশের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে চাই। মামলার দীর্ঘসূত্রিতা নিরসন, মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের মাধ্যমে সততা ও নৈতিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করাই আমার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য।

১ লাখ ফলোয়ারের বাইরে আর কোনো ফেসবুক পেজ নেই মাউশির, বাকি স…
  • ০৪ অক্টোবর ২০২৬
বারবিকিউ পার্টিতে ‘ঝাক্কাস’ পান করে তরুণের মৃত্যু, অসুস্থ ৪
  • ০৪ অক্টোবর ২০২৬
একই বছরে ২ হজ ও ৩ ঈদ, বিরল ঘটনার সাক্ষী হবে মুসলিম বিশ্ব
  • ০৪ অক্টোবর ২০২৬
যে সরকারের আমলে জনগণ নিরাপদে ঘুমাতে পারে না, সে সরকার দরকার…
  • ০৪ অক্টোবর ২০২৬
​বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ঘোষণা শুরু কাল, নোবেল…
  • ০৪ অক্টোবর ২০২৬
নিয়োগপত্রের দাবিতে প্রাথমিক অধিদপ্তরের সামনে আমরণ অনশনে বঞ্…
  • ০৪ অক্টোবর ২০২৬