লেখক ডা. এস. এম. সোহেল রানা © টিডিসি সম্পাদিত
পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ এমন একটি সমস্যা, যেখানে দ্রুত সঠিক চিকিৎসা রোগীর জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রক্তবমি, কালো পায়খানা কিংবা পায়খানার সঙ্গে তাজা রক্ত যাওয়াকে অনেকে সাময়িক সমস্যা মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু এসব লক্ষণ পাকস্থলী, খাদ্যনালি বা অন্ত্রের গুরুতর রোগের ইঙ্গিত হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যেই রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে।
কেন পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ হয়?
পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। পাকস্থলী বা ক্ষুদ্রান্ত্রের শুরুর অংশে আলসার, পাকস্থলীর প্রদাহ, খাদ্যনালির প্রসারিত রক্তনালি ফেটে যাওয়া এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এর উল্লেখযোগ্য কারণ। অন্যদিকে, বৃহদন্ত্রের প্রদাহ, পলিপ বা অন্যান্য অন্ত্রের রোগ থেকেও পায়খানার সঙ্গে রক্ত যেতে পারে।
যকৃতের দীর্ঘমেয়াদি রোগে খাদ্যনালিতে অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত রক্তনালি তৈরি হতে পারে। এসব রক্তনালি ফেটে গেলে প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে পারে, যা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করে।
কোন লক্ষণগুলো জরুরি?
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হবে:
- রক্তবমি বা কফির গুঁড়ার মতো কালচে বমি।
- কালো, আলকাতরার মতো আঠালো পায়খানা।
- পায়খানার সঙ্গে প্রচুর তাজা রক্ত যাওয়া।
- মাথা ঘোরা, ঠান্ডা ঘাম, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
- বুক ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট কিংবা রক্তচাপ কমে যাওয়ার লক্ষণ।
রক্তপাত নিজে থেকে বন্ধ হয়ে গেলেও চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি। বিশেষ করে রক্তবমি, কালো পায়খানা বা দুর্বলতার সঙ্গে রক্তপাত হলে দেরি করা বিপজ্জনক হতে পারে।
কখন জরুরি এন্ডোস্কোপি প্রয়োজন?
এন্ডোস্কোপি হলো ক্যামেরাযুক্ত সরু, নমনীয় যন্ত্রের সাহায্যে খাদ্যনালি, পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশের ভেতর পরীক্ষা করার পদ্ধতি। এর মাধ্যমে রক্তক্ষরণের উৎস শনাক্ত করার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে একই সময়ে রক্তপাত বন্ধ করার চিকিৎসাও করা যায়।
রোগীর অবস্থা, রক্তক্ষরণের তীব্রতা এবং সম্ভাব্য কারণ বিবেচনা করে এন্ডোস্কোপির সময় নির্ধারণ করা হয়। ওপরের পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণের অধিকাংশ হাসপাতালে ভর্তি রোগীর ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এন্ডোস্কোপি করার সুপারিশ করা হয়। তবে গুরুতর রক্তক্ষরণ বা খাদ্যনালির প্রসারিত রক্তনালি ফেটে যাওয়ার সন্দেহ থাকলে আরও দ্রুত ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে।
এন্ডোস্কোপির মাধ্যমে আলসারজনিত রক্তপাত বন্ধ করা, বিশেষ পদ্ধতিতে রক্তনালি বন্ধ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। রক্তক্ষরণের স্থান ও কারণ অনুযায়ী কখনো কোলনোস্কোপি, ইমেজিং বা অন্য চিকিৎসারও প্রয়োজন হতে পারে।
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের এন্ডোস্কপি ইউনিট: রোগনির্ণয় থেকে চিকিৎসা
পরিপাকতন্ত্রের রক্তক্ষরণে শুধু সমস্যাটি শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়—প্রয়োজনে দ্রুত রক্তপাত নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও হেপাটোলজি বিভাগে রোগনির্ণয় এবং চিকিৎসার জন্য উন্নত এন্ডোস্কোপিক সেবা দেওয়া হয়। হাসপাতালের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এন্ডোস্কপি ইউনিটে সাধারণ রোগনির্ণয়মূলক ও চিকিৎসামূলক এন্ডোস্কোপির পাশাপাশি ERCP, Narrow Band Imaging (NBI) এবং পরিপাকতন্ত্রের ওপরের ও নিচের অংশের রক্তক্ষরণ ব্যবস্থাপনার সুবিধা রয়েছে।
হাসপাতালের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ ইউনিটে Argon Plasma Coagulation (APC) প্রযুক্তিও রয়েছে। নির্দিষ্ট ধরনের রক্তক্ষরণে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রক্তপাতের স্থান নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবে কোন পদ্ধতি উপযুক্ত হবে, তা নির্ভর করে রক্তক্ষরণের কারণ, স্থান ও রোগীর সামগ্রিক অবস্থার ওপর।
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের এন্ডোস্কপি সেবার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসামূলক পদ্ধতির সমন্বয়। রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও হেপাটোলজি বিশেষজ্ঞরা উপযুক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেন। গুরুতর রক্তক্ষরণের ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল করা এবং প্রয়োজনীয় জরুরি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এন্ডোস্কোপির সময় নির্ধারণ করা হয়।
চিকিৎসা নিতে দেরি হলে কী ঝুঁকি?
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শরীরে রক্তের পরিমাণ কমে যেতে পারে। এতে রক্তচাপ কমে যাওয়া, কিডনিসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়া এবং গুরুতর ক্ষেত্রে শক তৈরি হতে পারে। রক্তস্বল্পতা ও পুনরায় রক্তক্ষরণের ঝুঁকিও থাকে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোগীর করণীয়
রক্তবমি বা প্রচুর রক্তপাত হলে ঘরে বসে চিকিৎসা নেওয়া কিংবা নিজে থেকে ওষুধ খাওয়া নিরাপদ নয়। দ্রুত জরুরি বিভাগে যান। রোগী অজ্ঞান বা খুব দুর্বল হলে নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়া উচিত নয়। চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া খাবার, পানীয় বা ওষুধ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। রোগী রক্ত পাতলা করার ওষুধসহ নিয়মিত যেসব ওষুধ খান, সে তথ্য চিকিৎসককে জানান।
পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ মানেই সব ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন—এমন নয়। দ্রুত রোগ নির্ণয়, উপযুক্ত ওষুধ, প্রয়োজনে এন্ডোস্কোপিক চিকিৎসা এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
মনে রাখবেন, রক্তবমি বা কালো পায়খানা কখনোই অবহেলার লক্ষণ নয়। সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো এবং সঠিক চিকিৎসা নেওয়াই জটিলতা কমানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ করুন: ১০৬৬৩
লেখক: এটেন্ডিং কনসালট্যান্ট - গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি এন্ড হেপাটোলজি, এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম