বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক নিয়োগে পক্ষপাতহীনতা: শিক্ষার গুণগত মানের পূর্বশর্ত

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৬ PM
প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী

প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী © টিডিসি সম্পাদিত

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক পদে নিয়োগ উচ্চশিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর। একজন প্রভাষক শুধু পাঠদান করেন না, তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাশক্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া রাজনৈতিক বিবেচনা, স্বজনপ্রীতি ও অস্বচ্ছতার কারণে ক্রমশ সংকটাপন্ন হয়েছে। অর্থনীতি একটি সামাজিক বিজ্ঞান, যা মানুষের সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও বণ্টন নিয়ে আলোচনা করে। "শিক্ষকদের আলোচনায় গবেষণা নয়, শুধু রাজনীতি থাকে"—এই রাজনৈতিক পরিবেশই যোগ্য প্রার্থীদের অবমূল্যায়নের মূল কারণ।

বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণত পিএইচডি ডিগ্রি ও গবেষণা দক্ষতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। পিএইচডি ডিগ্রি শিক্ষককে গবেষণা পদ্ধতি ও সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা দেয়, যা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার জন্য অপরিহার্য। তবে বাংলাদেশের অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রিধারী প্রার্থীদের বাদ দিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ে চার ধরনের ডিগ্রি প্রদান করা হয়:
১. বিএ ইন ইকোনমিক্স (BA in Economics) - কলা অনুষদের অন্তর্গত
২. বিএসএস ইন ইকোনমিক্স (BSS in Economics) - সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অন্তর্গত
৩. বিএসসি ইন ইকোনমিক্স (BSc in Economics) - বিজ্ঞান অনুষদের অন্তর্গত
৪. বিবিএ ইন ইকোনমিক্স (BBA in Economics) - ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের অন্তর্গত

এই চারটি ডিগ্রির মধ্যে মূল পার্থক্য রয়েছে, যা শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কর্মপথ ও শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেবিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পিএইচডিই প্রধান মানদণ্ড: বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অর্থনীতি শিক্ষক হওয়ার জন্য স্নাতক ডিগ্রির ধরন নয়, বরং পিএইচডি ডিগ্রি ও গবেষণা দক্ষতা প্রধান মানদণ্ড। শিক্ষকতা পেশায় স্নাতক ডিগ্রির চেয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিবিএ ইন ইকোনমিক্স ডিগ্রি তার বহুবিষয়ক প্রকৃতির কারণে শিক্ষকতা পেশায় এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে।ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি, এআইইউবি এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে পিএইচডি ডিগ্রিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিবিএ ইন ইকোনমিক্স ডিগ্রি শিক্ষার্থীদের শুধু অর্থনীতির তাত্ত্বিক জ্ঞানই দেয় না, বরং ব্যবসায়িক দক্ষতাও প্রদান করে। হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (HKUST) বিবিএ ইন ইকোনমিক্স প্রোগ্রামটি বিভিন্ন ব্যবসায়িক শাখায় মূল কোর্স প্রদান করে, যা স্নাতকদের বহুবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সজ্জিত করে—যা ব্যবসায়িক সমস্যা ও জননীতি বিশ্লেষণে সহায়ক । এই বহুবিষয়ক জ্ঞান একজন শিক্ষকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি শিক্ষার্থীদের বাস্তব বিশ্বের জটিল অর্থনৈতিক সমস্যা বুঝতে সহায়তা করতে পারেন।বিবিএ ইন ইকোনমিক্স প্রোগ্রামের আরেকটি বিশেষত্ব হলো এর নমনীয় পাঠ্যক্রম। HKUST-এর বিবিএ প্রোগ্রামে শিক্ষার্থীরা তাদের চূড়ান্ত বছরে অনার্স থিসিস কোর্সে অংশগ্রহণ করতে পারে, যা তাদের গবেষণা দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করে এবং শিক্ষকদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে । এই গবেষণা অভিজ্ঞতা শিক্ষকতা পেশার জন্য অপরিহার্য, কারণ এটি শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের গবেষণায় পথপ্রদর্শনে সক্ষম করে।

স্নাতকোত্তর ডিগ্রি গুরুত্বপূর্ণ: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক পদে এবং কলেজ পর্যায়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রয়োজন। বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অর্থনীতি শিক্ষক হওয়ার জন্য স্নাতক ডিগ্রির ধরনের চেয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।তবে শিক্ষকতা পেশায়—বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে—পিএইচডি ডিগ্রি ও গবেষণা দক্ষতাই প্রধান মানদণ্ড। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পিএইচডি ডিগ্রিধারী প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং স্নাতক ডিগ্রির ধরনকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। শিক্ষা উপদেষ্টার মন্তব্য—"শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পঙ্গু করে দিয়েছে" —এই প্রেক্ষাপটে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে বিতর্কের পরিবর্তে পিএইচডি ডিগ্রি ও গবেষণা দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের নেতৃত্বে এই বিষয়ে ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, যা আশাব্যঞ্জক।

Former শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সম্প্রতি এক সেমিনারে সরাসরি স্বীকার করেছেন যে, "শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পঙ্গু হওয়ার পথে" তিনি আরও বলেন, গত কয়েক দশকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রভাষক নিয়োগের "প্রচণ্ড অনিয়ম" শুরু হয়েছে এবং "শুধু দলীয়করণ নয়, দুর্বৃত্তায়ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পঙ্গু করে দিয়েছে"। অতীতের সাথে বর্তমানের তুলনা করে তিনি বলেন, "আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতাম তখন শিক্ষক নিয়োগে নিয়মনীতি মানা হত" —এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় কীভাবে সময়ের সাথে সাথে নিয়োগ প্রক্রিয়ার অবনতি ঘটেছে।

শিক্ষা উপদেষ্টার মতে, উচ্চশিক্ষার পরিবেশ ক্রমাগত নিচের দিকে নেমে যাওয়ার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ দায়ী:
১. শিক্ষকদের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি
২. শিক্ষক নিয়োগে প্রচণ্ড অনিয়ম
৩. ছাত্র রাজনীতির নামে দুর্বৃত্তায়ন

তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে শুধু রাজনৈতিক আলাপ হয়, মেধাবী শিক্ষকরা আড়ালে পড়ে থাকেন। কেন তাদের আড়ালে থাকা বা কোণঠাসা হয়ে থাকা, তা জানতে হবে" এই পর্যবেক্ষণ শিক্ষক নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে যোগ্য শিক্ষকদের অবমূল্যায়নের বিষয়টি স্পষ্ট করে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত সকল স্তরে শিক্ষক নিয়োগের জন্য নির্দেশনা রয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি সাধারণ নীতিমালা থাকলেও, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত তাদের নিজস্ব নিয়ম ও পদ্ধতি অনুসরণ করে। এই নীতিমালা যথেষ্ট সুনির্দিষ্ট নয় এবং ব্যাখ্যার অনেক সুযোগ রাখে।

ভালো দিক হলো, কিছু প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করছে। যেমন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার জন্য একটি স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে পিএইচডি থাকা বাধ্যতামূলক এবং প্রভাষক হলেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি থাকতে হবে। EWU,IUB,BRAC, UIU- অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক পদেও পিএইচডি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। 

তবে অনেক প্রতিষ্ঠানেই এই মান বাস্তবায়িত হয় না। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে একটি অবলিখিত নিয়ম হলো—কোনো নির্দিষ্ট সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পেতে হলে আপনাকে সেই বিশ্ববিদ্যালয়েরই স্নাতক হতে হবে। এটি বৈচিত্র্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নিয়োগ মানকে নিরুৎসাহিত করে এবং যোগ্য শিক্ষকদের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।বিবিএ ইন ইকোনমিক্স ডিগ্রি তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক ব্যবসায়িক দক্ষতা প্রদান করে। একজন শিক্ষক যিনি বিবিএ ডিগ্রিধারী, তিনি শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক তত্ত্বের ব্যবহারিক প্রয়োগ শেখাতে পারেন।

হাল্ট ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস স্কুলের মতে, অর্থনীতি ব্যবসায়ের ভাষা—এটি বুঝতে শেখার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জানতে পারে কেন ব্যবসা, ভোক্তা ও সরকার নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেয় ।বিবিএ প্রোগ্রামের বহুবিষয়ক প্রকৃতি শিক্ষককে বিভিন্ন শাখার সমন্বয়ে শিক্ষাদানে সক্ষম করে। HKUST-এর বিবিএ প্রোগ্রাম স্নাতকদের বহুবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সজ্জিত করে, যা ব্যবসায়িক সমস্যা ও জননীতি বিশ্লেষণে সহায়ক। বিবিএ ইন ইকোনমিক্স প্রোগ্রামে গবেষণার সুযোগ রয়েছে, যা শিক্ষকতা পেশার জন্য অপরিহার্য। HKUST-এর বিবিএ প্রোগ্রামে চূড়ান্ত বছরে অনার্স থিসিস কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা গবেষণা দক্ষতা বিকাশ করতে পারে। বিবিএ ইন ইকোনমিক্স প্রোগ্রামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল মিডিয়ার মতো সম্প্রসারিত মেজর গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এই আধুনিক জ্ঞান শিক্ষককে ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে সহায়তা করে।বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতার জন্য পিএইচডি ডিগ্রি প্রায় সার্বজনীন মানদণ্ড।

প্রভাষক নিয়োগে পক্ষপাতহীনতা নিশ্চিত করার প্রথম শর্ত হলো যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া। গবেষণার অভিজ্ঞতা, শিক্ষক সহায়ক বা গবেষণা সহায়ক হিসেবে কাজ, প্রকাশনা এবং সম্মেলন কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত "সহযোগী প্রভাষক" ও "সিনিয়র প্রভাষক" এর মতো পদ সৃষ্টি করা, যাতে পিএইচডি না থাকলেও গবেষণা ও শিক্ষাদানের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া যায়।নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয় ও এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি পিএইচডি প্রোগ্রামে প্রবেশের জন্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, পিএইচডি করার জন্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পূর্বশর্ত—এটি শিক্ষকতার জন্যও অপরিহার্য।

শিক্ষা উপদেষ্টা যেমন বলেছেন, "শিক্ষকদের আলোচনায় গবেষণা নয়, শুধু রাজনীতি থাকে" —এই রাজনৈতিক পরিবেশই যোগ্য প্রার্থীদের অবমূল্যায়নের মূল কারণ। যখন প্রভাষক নিয়োগে রাজনৈতিক সম্পর্ক প্রাধান্য পায়, তখন যোগ্য প্রার্থীরা বাদ পড়েন এবং অযোগ্য ব্যক্তিরা দায়িত্ব পান, যা শিক্ষার মানকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

পক্ষপাতহীন নিয়োগের জন্য স্বচ্ছতা অপরিহার্য। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ব্যাপকভাবে প্রচার করা, নির্বাচন প্রক্রিয়া বহুমুখী করা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নিয়ে নির্বাচন কমিটি গঠন করা উচিত। বিশেষ করে প্রভাষক পদে নিয়োগের জন্য ক্রস-ইউনিভার্সিটি নিয়োগ বা নিয়োগ নীতি প্রবর্তন করা জরুরি, যা যোগ্য শিক্ষকদের সহজে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেতে এবং তাদের দক্ষতা ভাগ করে নিতে সাহায্য করবে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটি সমন্বিত নীতিমালা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। এই নীতিমালা শুধু নিয়োগ নয়, পদোন্নতি ও বরখাস্তও অন্তর্ভুক্ত করবে। তবে অনেক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়ম থাকায় ঐক্যমত্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।বিবিএ ইন ইকোনমিক্স ডিগ্রি তার বহুবিষয়ক প্রকৃতি, ব্যবসায়িক প্রয়োগযোগ্যতা, গবেষণার সুযোগ ও আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানের কারণে শিক্ষকতা পেশায় এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ জর্জিয়ার টেরি কলেজ অব বিজনেসের মতে, বিএ ইন ইকোনমিক্স ও বিবিএ ইন ইকোনমিক্সের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো—বিএ ডিগ্রিতে লিবারেল আর্টসের কোর্স নিতে হয়, অন্যদিকে বিবিএ ডিগ্রিতে ব্যবসায়িক কোর্স নিতে হয়। অর্থনীতির মূল কোর্স দুটি ডিগ্রিতেই একই।

তবে শিক্ষকতা পেশায় স্নাতক ডিগ্রির ধরন তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়—বরং স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি এবং গবেষণা দক্ষতাই প্রধান মানদণ্ড। টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যাসলাম কলেজ অব বিজনেসের মতে, এমএ ইন ইকোনমিক্স শিক্ষার্থীদের পিএইচডি প্রোগ্রামে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত করে।বিবিএ ইন ইকোনমিক্স ডিগ্রি ব্যবসায়িক জগতে কর্মসংস্থানের জন্য অত্যন্ত কার্যকর, এবং শিক্ষকতা পেশায়—বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে—এই ডিগ্রির বহুবিষয়ক জ্ঞান একজন শিক্ষককে আরও কার্যকর ও প্রাসঙ্গিক করে তোলে। তবে পিএইচডি ডিগ্রি ও গবেষণা দক্ষতাই প্রধান মানদণ্ড। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের নেতৃত্বে এই বিষয়ে ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, যা আশাব্যঞ্জক।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ, স্বীকৃতি ও সুবিধা ভিন্ন হওয়ায় একই মানের শিক্ষক নিয়োগ ও ধরে রাখা কঠিন। তাই নিয়োগ নীতিমালা প্রতিযোগিতামূলক ও নমনীয় হওয়া উচিত এবং প্রতিষ্ঠানের বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

ইউজিসির চেয়ারম্যান মতে, গুণগত মান নিশ্চিত করতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অপরিহার্য। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ইউজিসির অনুমোদন যথেষ্ট নয়; তাদের ভালো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সহযোগিতা করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা বোর্ড গঠন করতে হবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নির্বাচনে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি উভয় ডিগ্রির মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। পিএইচডি ডিগ্রি শিক্ষককে আধুনিক গবেষণা পদ্ধতি ও সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা দেয়, যা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার জন্য অপরিহার্য। শিক্ষা উপদেষ্টা যেমন বলেছেন, "এত অনিয়মের পরও পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বহু শিক্ষক আছেন যারা আন্তর্জাতিক মানের গবেষক" —এই গবেষকদের সঠিক মূল্যায়ন ও নিয়োগ নিশ্চিত করাই এখন ইউজিসির প্রধান চ্যালেঞ্জ।

শিক্ষা উপদেষ্টা উল্লেখ করেন যে সম্প্রতি আন্দোলনের পর প্রায় সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় "অভিভাবকহীন" হয়ে গিয়েছিল—উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ কাউকেই পাওয়া যাচ্ছিল না। তিনি বলেন, "এ থেকেই বোঝা যায়, নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন রাজনৈতিক দলীয়করণ হয়েছে যে, সরকার পরিবর্তনের ফলে সবাইকে চলে যেতে হয়েছে।" এই পর্যবেক্ষণ প্রমাণ করে যে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা এতটাই গভীরভাবে প্রোথিত যে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব শূন্য হয়ে পড়ে।

•প্রভাষক নিয়োগে পিএইচডি বা সমতুল্য ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা – বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষাদানের জন্য পিএইচডি ডিগ্রি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। এটি নিশ্চিত করে যে শিক্ষক গবেষণা ও সমালোচনামূলক চিন্তায় দক্ষ।
•নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা – বিজ্ঞপ্তি প্রচার, বহুমুখী নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং স্বাধীন নির্বাচন কমিটি গঠন করতে হবে।
•ক্রস-ইউনিভার্সিটি নিয়োগ নীতি প্রবর্তন করা – যোগ্য শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
•রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়ে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া – শিক্ষক নির্বাচনে রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়, যোগ্যতা ও গবেষণা দক্ষতাকে প্রধান মানদণ্ড করতে হবে।
•শিক্ষকদের গবেষণা ও পেশাগত উন্নয়নে উৎসাহিত করা – পিএইচডি সম্পন্ন করতে আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তা দিতে হবে।

এই সংস্কারের প্রেক্ষাপটে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের নেতৃত্ব স্বীকার করা গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ ২০২৬ সালের মার্চে ইউজিসির ১৫তম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রকাশনা এবং গবেষণা ও প্রশাসনে অসাধারণ ক্যারিয়ার তাকে ইউজিসি নেতৃত্বের জন্য একজন যোগ্য ও নৈতিক ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
"বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রবীণ ও উচ্চ যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে" এবং ফলস্বরূপ "পিএইচডি ধারকদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে"। কমিশন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের নিজস্ব পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করার অনুমতি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

শিক্ষক নিয়োগে "ভয়াবহ রকম দুর্নীতি" হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো "পঙ্গু হওয়ার পথে", তখন এটি স্পষ্ট হয় যে প্রভাষক পদে পক্ষপাতহীন নিয়োগ নিশ্চিত করা একটি জরুরি প্রয়োজন।

প্রভাষক নিয়োগে পক্ষপাতহীনতা নিশ্চিত করা মানে শুধু নিয়োগ প্রক্রিয়ার সংস্কার নয়, বরং একটি নতুন একাডেমিক সংস্কৃতি গঠন—যেখানে যোগ্যতা, গবেষণা ও শিক্ষাদানের দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই সংস্কার বাস্তবায়নে ইউজিসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের নেতৃত্বে ইউজিসি যদি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।"এত অনিয়মের পরও পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বহু শিক্ষক আছেন যারা আন্তর্জাতিক মানের গবেষক" —এই গবেষকদের সঠিক মূল্যায়ন ও নিয়োগ নিশ্চিত করাই এখন ইউজিসির প্রধান চ্যালেঞ্জ।

আসুন আমরা সবাই—শিক্ষক, প্রশাসক, নীতিনির্ধারক ও শিক্ষার্থীরা—মিলে একটি স্বচ্ছ, যোগ্যতাভিত্তিক ও পক্ষপাতহীন নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তুলি। কারণ, আজকের প্রভাষকই আগামীর জাতি গঠনের কারিগর।

লেখক: ম্যাক্রো ও ফাইন্যান্সিয়াল ইকোনমিস্ট
ইমেল: [email protected]

রাজধানীতে সকালেই একসঙ্গে প্রাণ হারালেন ৪ জন
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কার মুখে ট্রাম্পের দল, এগিয়ে ডেম…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
কিশোরীকে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণের অভিযোগে কবিরাজ গ্রেপ্তার
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
আওয়ামী দুর্বৃত্তদের প্রতিহত করতে রাজপথে নামুন—জামায়াত ও এনস…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
তিন দিনের সফরে ঢাকায় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মন্ত্রী
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
মাছ ও টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগে ছাত্রদলের ৩ নেতার বিরুদ্ধে মাম…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950