৭৩তম প্রতিষ্ঠা দিবসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় : প্রতিষ্ঠার আদি অন্ত

০৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৫ PM
ড. জি. এম. শফিউর রহমান

ড. জি. এম. শফিউর রহমান © টিডিসি সম্পাদিত

১৮৭৩ সালে ১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী কলেজে দীঘাপাতিয়ার দানশীল জমিদার  রাজা প্রমথনাথ রায় এর আর্থিক অনুদান ও উদ্যোগে কলেজে বিএ  ক্লাস যাত্র শুরু হয় ১৮৭৮ সালে। পরবর্তীতে এম এ ক্লাস চালু হয়। পুঠিয়ার রাণী মনোমোহিনী দেবীর ২০ হাজার টাকা এককালীন অনুদানে এই কলেজে এম এ ক্লাসের যাত্রা শুরু হয়। তখন থেকেই কলেজের শিক্ষার খ্যাতি  ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ  রাজশাহী কলেজের উন্নতিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে  এই কলেজ হতে এক  আদেশের মাধ্যমে  এম. এ  এবং  আইন শিক্ষার অনুমোদন প্রত্যাহার করে, ফলে এই কলেজ এক সংকটের মুখোমুখি হয়। রাজশাহীর বর্ণ হিন্দু, মুসলমান সবাই এর প্রতিবাদ করেন। এই কারণেই রাজশাহীতে উচ্চশিক্ষার জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগ্রহের বীজ  রোপিত হয়।

কলিকাতার বিশ্ববিদ্যালয় ও  অধীনস্ত কলেজসমূহের শিক্ষার মান উন্নয়ন, পরিচালনার কৌশল প্রণয়ন ইত্যাদির জন্য ইংল্যান্ডের লীড্স্ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর এম. ই স্যাডলারকে সভাপতি করে গঠিত হয় স্যাডলার কমিশন বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন। কমিশন পূর্ব বাংলার ঢাকা এবং রাজশাহীতে দুটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে। 

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তৎকালীন পাকিস্তান সরকার দেশের সব কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার প্রক্রিয়া চালু করে। যার ফলে অনার্স  বা স্নাতক পাশ করা অনেক ছাত্র মাস্টার্সে ভর্তি হতে রাজশাহী ত্যাগ করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, বিএনপি'র প্রতিষ্ঠাতালীন স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য, ডাকসুর সাবেক ভিপি, ভাষা সৈনিক, রাজশাহীর কৃতি সন্তান, জননেতা একরামুল হক, যিনি রাজশাহী কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে সম্মান পাস করার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এম এ ক্লাসে ভর্তি হতে হয়েছিলেন।

ফলশ্রুতিতে, ১৯১৭ সালে গঠিত কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন বা স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলন শুরু হয়।

১৯৫০ সালের ১৮ অক্টোবর স্কুলের এল. এম. এফ কোর্সের নির্বাচক কমিটির মিটিং বসেছিলো রাজশাহী মেডিকেল স্কুলের একটি কক্ষে, যেটা বর্তমানে মেডিকেল কলেজ ছাত্রী নিবাস। সেই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন ডক্টর ইতরাত হোসেন জুবেরী, পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মাদার বখশ,রাজশাহীর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এমদাদ আলী, রাজশাহী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মনির উদ্দিন আকন্দ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।মিটিং এর একপর্যায়ে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ জুবেরী বলেন যে রাজশাহী কলেজে যে অনুদান দিয়ে থাকে তাতে মাত্র এক লক্ষ বা দেড় লক্ষ টাকা অতিরিক্ত প্রদান করলে করলে রাজশাহীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা যায়।

ড. জুবেরীর এই কথাটি তাৎক্ষণিকভাবে সবাইকে উজ্জীবিত করলো। পরপর কয়েকটি ঘরোয়া মিটিং অনুষ্ঠিত হলো। ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহার তিনদিনের এক সফরে রাজশাহীতে এলে তখনকার  নেতৃবৃন্দ রাজশাহীতে  পূর্ণাঙ্গ একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি উত্থাপন করেন। মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবীর প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। ১৯৫২ সালের ১ নভেম্বর  প্রাদেশিক আইন পরিষদে স্পিকার আব্দুল হামিদ চৌধুরী  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বিল উত্থাপন করেন। এই বিলটি চূড়ান্ত আলোচনার জন্য সিলেক্ট কমিটিতে না পাঠিয়ে সরাসরি আইন পরিষদে পাস করানোর ব্যবস্থা করেন মন্ত্রী নুরুল আমিন। কিন্তু তৎকালীন সরকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি পূরণের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ  থাকেন করতে থাকে।

ফলে, ১৯৫৩ সালে ৬ ফেব্রুয়ারি ভুবন মোহন পার্কের জনসভা থেকে সরকারকে হুঁশিয়ার করে মুসলিম লীগের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মাদার বখশ আর নিজ দলের সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যদি রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা না হয়, তবে উত্তরবঙ্গকে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ দাবি করতে বাধ্য হবো। মাদার বখশের বক্তব্যে ব্যাপক সারা পড়ে জনমনে এবং সরকারেরও টনক নড়ে তাতে। অবশেষে ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ বাজেট অধিবেশনে  বিলটি  The Rajshahi University Act. 1953 (The East Bengal Act XV of 1953) নামে ব্যবস্থাপক পরিষদে পাশ হয়। ৬ জুন গভর্ণর এই বিলে সম্মতি প্রদান করেন  এবং ১৬ জুন ১৯৫৩ তারিখে একটি ঢাকা গেজেট এক্সট্রা অর্ডিনারিতে প্রকাশিত হয়। ৬ জুলাই, ১৯৫৩ তারিখে রাজশাহী কলেজের খ্যতনামা প্রাক্তন অধ্যক্ষ ড. ইতরাত হোসেন জুবেরীকে প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য নিযুক্ত করা হয়। ঐদিন থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। ড. জুবেরী ও মাদার বখশকে  যুগ্ন-সম্পাদক করে ৬৪ সদস্য বিশিষ্ট বাস্তবায়ন কমিটির গঠিত হয় এবং তাদের নেতৃত্বেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনার খসড়া প্রণয়ন করা হয়।

উর্দুভাষী প্রফেসর প্রফেসর ইতরাত হোসেন জুবরী ১৯৬৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেন। রাজশাহী কলেজের আরেক অধ্যক্ষ প্রফেসর মমতাজ উদ্দিন আহমদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় উপাচার্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তখন পূর্ব বাংলার গভর্ণর ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের  চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করছেন।

১৬১ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। প্রথমে দর্শন, ইতিহাস, বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্স চালু হয়। ক্লাসগুলো হতো রাজশাহী কলেজে। পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক বড়কুঠিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের দপ্তর। ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমিতে চিকিৎসাকেন্দ্র ও পাঠাগার তৈরি করা হয়।

জমিদার কুঞ্জমোহন মৈত্রের বাড়িতে স্থাপন করা হয় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তর। কলেজ পরিদর্শন দপ্তর স্থাপন করা হয় বড়কুটি পাড়ার মাতৃধামে। রাজশাহী কলেজ সংলগ্ন ফুলার হোস্টেলকে রূপান্তরিত করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস হিসাবে। ছাত্রী নিবাস করা হয় বড়কুটি এলাকার লালকুটি বভনে। ১৯৫৮ সালে বর্তমান ক্যাম্পাসে দালান কোটা ও রাস্তাঘাটা নির্মাণ শুরু হয়। অস্ট্রেলিয়ান স্থপতি বর্তমান ড. সোয়ানী টমাসের স্থাপত্য পরিকল্পনায় এই ক্যাম্পাসটি গড়ে উঠে। তাকে সহযোগিতা করেন স্থপতি  জন এ জিমানেক। ১৯৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব মতিহার ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। মতিহারের এই ক্যাম্পাসে ১৯৬৪ সালের মধ্যে সকল অফিস বিভাগ চালু হয় এবং এই বছরই ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সংযুক্ত করা হয়। ১৯৫৬-৫৭ শিক্ষাবর্ষে বিজ্ঞান অনুষদ যাত্রা শুরু হয়। শুধুমাত্র কলা ও আইন অনুষদ নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে। ১৯৭২ -৭৩ শিক্ষাবর্ষে কলা অনুষদের অন্তর্ভুক্ত কমার্সের বিষয় ম্যানেজমেন্ট ও হিসাববিজ্ঞান নিয়ে গঠিত হয় বাণিজ্য অনুষদ এবং ১৯৮৫ সালে গঠিত হয় জীব ও ভূবিজ্ঞান অনুষদ। ১৯৬২ সালে শুরু হয় ৩ বছর মেয়াদী অনার্স কোর্স এবং ১ বছর মেয়াদী মাস্টার্স কোর্স। 

বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২টি অনুষদের আওতায় ৫৯টি বিভাগ, ৬টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। মোট অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান সংখ্যা ১৫টি, তার মধ্যে রয়েছে সরকারি ১৩টি এবং বেসরকারি ২টি প্রতিষ্ঠান। গত বছরের হিসাব মতে ২৬ জন বিদেশি শিক্ষার্থীসহ প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। রয়েছে ৭০১ জন এমফিল-পিএইচডি গবেষক। রমোট শিক্ষকের সংখ্যা ১১০০ এর অধিক, অফিসারের সংখ্যা ৭৩০, সহায়ক কর্মচারীর সংখ্যা ৫৬০,এবং সাধারণ কর্মচারীর সংখ্যা ৭০০। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আবাসিকতার জন্য রয়েছে ১১টি নান্দনিক ডিজাইনের ছাত্র হল এবং ৬টি ছাত্রী হল। তাছাড়াও গবেষকদের জন্য রয়েছে আব্দুল কাইয়ুম ইন্টারন্যাশনাল ডরমেটরি। প্রথম ভিসি অবশ্য ড. ইতরাত হোসেন জুবেরীর নামে রয়েছে একটি ভবন। জুবেরি ভবনটি গেস্ট হাউস এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ছাত্রদের জন্য একটি হল এবং ছাত্রীদের জন্য একটি হল নির্মানাধীন আছে। 

আজ ৬ জুলাই, ২০২৬ বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার মাধ্যমে পালিত হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩তম প্রতিষ্ঠা দিবস।

লেখক: প্রফেসর, ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

হাজিরা খাতা নিয়ে বিরোধ, মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপারকে মারধরে…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
সমবায় ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান ফয়সল আহমেদ চৌধুরী: ত্যাগ ও স…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
মিশিগান থেকে প্রথম মুসলিম সিনেটর আবদুল এল সাঈদ, যুক্তরাষ্ট্…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
বিসিএসের ফল জালিয়াতি করতে চুক্তিভিত্তিক দলীয় ‘সিস্টেম অ্যাড…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
কিউএস এশিয়া ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিংয়ে ৩৭ ধাপ পেছাল রাবি
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
মানহীন মেডিকেল কলেজ কাউকে করতে দেওয়া হবে না
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950