ইমরান হোসেন © টিডিসি ফটো
এইচএসসি পরীক্ষা শেষ মানেই লাখো শিক্ষার্থীর জীবনে আরেকটি কঠিন অধ্যায়ের শুরু। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াই। সেই লড়াইকে সহজ, সাশ্রয়ী ও সমন্বিত করার লক্ষ্যেই ২০১৯ সালে বাংলাদেশে গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষার যাত্রা শুরু হয়েছিল। ৭ বছর পর প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই সংস্কার আমাদের কী দিল? আর কী দিতে পারল না?
বাংলাদেশে গুচ্ছভর্তি পরীক্ষার সূচনা হয়েছিল ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে সাতটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমবারের মতো সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়। এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। পরের বছর করোনা মহামারির মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) উদ্যোগে সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য চালু হয় জিএসটি গুচ্ছ। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—একটি পরীক্ষার মাধ্যমে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের অর্থ, সময় ও ভোগান্তি কমানো এবং ভর্তি ব্যবস্থায় সমন্বয় আনা।
৭ বছরে গুচ্ছভর্তি কী অর্জন করেছে? সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, এটি সমন্বিত ভর্তি ব্যবস্থার ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করেছে। একসময় একজন শিক্ষার্থীকে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে পাঁচ, ছয় কিংবা তারও বেশি ভর্তি পরীক্ষা দিতে হতো। আবেদন ফি, যাতায়াত, আবাসন ও অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে ভর্তি মৌসুম অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াত। গুচ্ছ ব্যবস্থা সেই অযৌক্তিকতার বিরুদ্ধে একটি কার্যকর বিকল্প হাজির করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর আবেদন, একক পরীক্ষা এবং একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ এখন আর কল্পনা নয়; বাস্তব অভিজ্ঞতা।
এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায় আবেদনকারীর সংখ্যায়ও। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে জিএসটি গুচ্ছভুক্ত ১৯টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছেন ২ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫৪ জন শিক্ষার্থী। কৃষি গুচ্ছের নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ হাজার ৭০১টি আসনের বিপরীতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ৮৮ হাজার ২২৮ জন। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা সমন্বিত ভর্তি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা এখনো অস্বীকার করেননি।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
গুচ্ছভর্তি যে লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, সেই লক্ষ্য পূরণে সবচেয়ে বড় বাধা এসেছে কাঠামোগত দুর্বলতা থেকে। শুরু থেকেই দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)—এই ব্যবস্থার বাইরে থেকেছে। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ও গুচ্ছ থেকে সরে দাঁড়ায়। প্রকৌশল গুচ্ছও টেকেনি; কুয়েট, রুয়েট ও চুয়েট আবার নিজস্ব ভর্তি পরীক্ষায় ফিরে গেছে।
ফলে যে উদ্যোগটি ধীরে ধীরে একটি জাতীয় ভর্তি ব্যবস্থায় রূপ নিতে পারত, তা আজ সীমিত কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আবদ্ধ। এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; নীতিনির্ধারণেরও অপূর্ণতা।
কেন এমন হলো?
প্রথমত, গুচ্ছ চালু হলেও অভিন্ন ভর্তি নীতি গড়ে ওঠেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে যোগ্যতার শর্ত, বিষয় বণ্টন, মাইগ্রেশন এবং ভর্তি-প্রক্রিয়ায় ভিন্নতা থেকে গেছে। দ্বিতীয়ত, ভর্তি কার্যক্রম শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডার ব্যাহত হয়েছে। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও কেন্দ্রীয় সমন্বয়ের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা যায়নি। চতুর্থত, গুচ্ছ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হয়নি। ফলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে এটি সহযোগিতার পরিবর্তে প্রশাসনিক জটিলতা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
তবে এই সীমাবদ্ধতাগুলো গুচ্ছভর্তি ধারণার ব্যর্থতা নয়; বাস্তবায়নের দুর্বলতা।
বিশ্বের অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। চীনে গাওকাও, দক্ষিণ কোরিয়ায় সিএসএটি, জাপানে জাতীয় ভর্তি পরীক্ষা, যুক্তরাজ্যে ইউক্যাস এবং ভারতে জেইই, নিট ও সিইউইটির মতো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে একাধিক প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে। কোথাও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব মূল্যায়ন আছে, কোথাও কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ওপর বেশি নির্ভরতা; কিন্তু প্রবণতা একটাই—একজন শিক্ষার্থীকে অযথা বহুবার একই ধরনের ভর্তি পরীক্ষায় বসতে হয় না। বাংলাদেশের গুচ্ছভর্তি সেই বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি উদ্যোগ ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা সেটিকে আরও শক্তিশালী করার বদলে ক্রমে দুর্বল হতে দিয়েছি।
গুচ্ছভর্তি নিয়ে আলোচনায় আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার। অনেকেই মনে করেন, ভর্তি পদ্ধতি বদলালেই উচ্চশিক্ষার সংকটের সমাধান হবে। বাস্তবতা তা নয়। ভর্তি পরীক্ষা কেবল শিক্ষার্থী নির্বাচনের একটি পদ্ধতি; এটি উচ্চশিক্ষার মান নির্ধারণ করে না। কিন্তু একটি কার্যকর ভর্তি ব্যবস্থা শিক্ষার্থীর ভোগান্তি কমাতে পারে, ব্যয় কমাতে পারে এবং মেধাভিত্তিক নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ করতে পারে। সেই দিক থেকে গুচ্ছভর্তির প্রয়োজনীয়তা এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
এখন কী করা উচিত?
প্রথমত, ৭ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে গুচ্ছভর্তি নিয়ে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কোন কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুচ্ছ ছাড়ল, কোথায় প্রশাসনিক দুর্বলতা ছিল এবং কোন সংস্কার জরুরি—এসব বিষয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ধাপে ধাপে একটি অভিন্ন ডিজিটাল ভর্তি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আবেদন, ফল প্রকাশ, বিষয় নির্বাচন ও ভর্তি—সবকিছু নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী সম্পন্ন হবে। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রেখেই একটি জাতীয় ভর্তি কাঠামো তৈরির বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অতিরিক্ত মূল্যায়নের সুযোগ রাখতে পারে; কিন্তু শিক্ষার্থীকে যেন একাধিক পূর্ণাঙ্গ ভর্তি পরীক্ষার বোঝা বহন করতে না হয়।
গুচ্ছভর্তি কোনো ব্যর্থ প্রকল্প নয়; আবার একে নিখুঁত সফলতাও বলা যাবে না। এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি প্রয়োজনীয় সংস্কারের সূচনা করেছে, কিন্তু সেই সংস্কারকে পূর্ণতা দেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও নীতিগত ধারাবাহিকতা আমরা দেখাতে পারিনি।
৭ বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের অন্তত একটি শিক্ষা দিয়েছে—সমস্যা গুচ্ছ ব্যবস্থায় নয়, সমস্যার বড় অংশ বাস্তবায়নে। সেই বাস্তবতা স্বীকার করে যদি নতুন করে এগোনো যায়, তাহলে গুচ্ছভর্তি এখনো বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় একটি কার্যকর, শিক্ষার্থীবান্ধব এবং আধুনিক ভর্তি ব্যবস্থার ভিত্তি হতে পারে। আর যদি তা না হয়, তাহলে আমরা আবারও সেই পুরোনো চক্রেই ফিরে যাব—এক শিক্ষার্থী, বহু পরীক্ষা, অযথা ভোগান্তি এবং অপচয়ের এক অনন্ত পুনরাবৃত্তিতে।
লেখক: সিনিয়র সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)
ডিসক্লেইমার: নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত একান্তই লেখকের ব্যক্তিগত