৪ কিশোরের আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাওয়ার স্বপ্ন © সৌজন্যে প্রাপ্ত
দুটি ম্যাচ। দুই দফায় বিশাল ব্যবধান। স্কোরলাইন—১১-১ এবং ১১-০। প্রতিপক্ষকে পরপর দুই ম্যাচে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ফাইনালের পথে এগিয়ে যায় পাবনা জিলা স্কুলের চার কিশোরের দল ‘আমরাও বিজ্ঞানী’। শেষ পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় স্কুল ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে গলায় ওঠে স্বর্ণপদক। কিন্তু সাফল্যের সেই আনন্দের পর এখন তাদের সামনে নতুন এক বাস্তবতা—আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাওয়ার খরচ।
ইতালির রোমে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক পর্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছে পাবনা জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির চার শিক্ষার্থী—মেহজাদ যুবায়ের, খন্দকার নাজ্জার হাবীব, আহসান হাবিব খান ও মাহিন আব্দুল্লাহ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি অদম্য আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে চলা এই চার কিশোরের স্বপ্ন এখন দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরা। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান না হওয়ায় সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
শূন্য থেকে রোবট, দুই সপ্তাহেই জাতীয় চ্যাম্পিয়ন
গত ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হয় ফিবোনাচ্চি ইন্টারন্যাশনাল রোবট অ্যান্ড STEM অলিম্পিয়াডের বাংলাদেশ জাতীয় পর্ব। ফিবোনাচ্চি অলিম্পিয়াড বাংলাদেশ আয়োজিত এবং জেনারেল সাইন্স অলিম্পিয়াডের সহযোগিতায় আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
আয়োজনে ছিল বিজ্ঞান ও গণিত অলিম্পিয়াড, রোবোটিকস প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান প্রজেক্ট ও ইনোভেশন শোসহ বিভিন্ন আয়োজন। ‘রোবোসকার’ ইভেন্টের স্কুল ক্যাটাগরিতে অংশ নেয় পাবনা জিলা স্কুলের ‘আমরাও বিজ্ঞানী’ টিম। মাত্র দুই সপ্তাহের প্রস্তুতিতে একেবারে শূন্য থেকে নিজেদের রোবট তৈরি করে প্রতিযোগিতায় নামেন চার বন্ধু। প্রথমবার কোনো রোবোটিকস প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েই তারা একের পর এক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এই অর্জনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বড় সুযোগ—আন্তর্জাতিক পর্বে বাংলাদেশের পাশাপাশি পাবনা জেলা ও নিজেদের প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাবনা জিলা স্কুলকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ।
‘আমাদের স্বপ্নটা যেন অর্থের কাছে হার না মানে’
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনুভূতি জানতে চাইলে চার শিক্ষার্থীর কণ্ঠে যেমন সাফল্যের আনন্দ, তেমনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও স্পষ্ট। তাদের ভাষায়, রোবোসকার নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম। মাত্র দুই সপ্তাহে শূন্য থেকে রোবট তৈরি করে সেটিকে প্রতিযোগিতার উপযোগী করতে হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনুভূতি তাদের কাছে ‘অন্যরকম’।
তারা মনে করে, মা-বাবার দোয়া ও উৎসাহ, স্কুলের শিক্ষক এবং বড় ভাইদের সহযোগিতা ছাড়া এই অর্জন সম্ভব হতো না।তবে তাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ—স্কুলে পড়ার সময়ই বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশ ও পাবনা জিলা স্কুলকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাওয়া। এখন তাদের প্রত্যাশা, অর্থের সীমাবদ্ধতা যেন সেই সুযোগকে থামিয়ে না দেয়।
৫০ দেশের মঞ্চে বাংলাদেশের চার কিশোর
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পর্বে ৫০টি দেশের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করবে। সেখানে মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছে ‘আমরাও বিজ্ঞানী’ টিম। চার কিশোরের জন্য এটি শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়। এটি বাংলাদেশের একটি জেলা শহরের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও রোবোটিকস মঞ্চে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরার সুযোগ। পাবনার মতো জেলা শহর থেকেও যে আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিচর্চায় আগ্রহী শিক্ষার্থী তৈরি হচ্ছে—তাদের এই সাফল্য তারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
২০২৩ থেকে পথচলা
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন অলিম্পিয়াডের প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসা থেকেই ২০২৩ সালে ‘আমরাও বিজ্ঞানী’ গ্রুপের পথচলা শুরু। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে তাদের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিযোগিতা, গণিত ও ফিজিক্স অলিম্পিয়াডসহ নানা আয়োজনে অংশ নিয়ে সাফল্য ও সম্মানজনক পদক অর্জন করে টিমটির সদস্যরা। রোবোটিকস প্রতিযোগিতায় এবারই তাদের প্রথম অংশগ্রহণ। আর প্রথম অংশগ্রহণেই জাতীয় চ্যাম্পিয়ন—এই সাফল্য তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকটিও সামনে এনেছে।
প্রয়োজন এখন সহযোগিতার
চার কিশোরের সামনে এখন সবচেয়ে বড় বাধা প্রযুক্তিগত নয়, আর্থিক। আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান তারা এখনো করতে পারেনি। ফলে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আন্তর্জাতিক পর্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের যে দরজা তাদের সামনে খুলেছে, অর্থের অভাবে সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান, দেশের শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
একটি প্রতিশ্রুতিশীল কিশোর দলের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া শুধু চারটি শিশুর স্বপ্ন পূরণ নয়—এটি বিজ্ঞানমনস্ক একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ। যে চার শিক্ষার্থী মাত্র দুই সপ্তাহে শূন্য থেকে একটি রোবট তৈরি করে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হতে পারে, সুযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তারা ভবিষ্যতে আরও কত দূর যেতে পারে—সেটি সময়ই বলে দেবে।
প্রতিভা যেন অর্থের কাছে পরাজিত না হয়
দেশের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে উৎসাহিত করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে অনেক প্রতিভাবান শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাওয়ার শেষ ধাপে এসে অর্থের সংকটে পড়ে। ‘আমরাও বিজ্ঞানী’ টিমের চার কিশোর সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। তাদের হাতে এখন জাতীয় চ্যাম্পিয়নের স্বর্ণপদক। সামনে আন্তর্জাতিক মঞ্চ। বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে সেখানে দাঁড়ানোর স্বপ্নও আছে। দরকার শুধু সহযোগিতার হাত।
সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, শিক্ষা ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, দেশের শিল্পপতি ও বিত্তবান মানুষ যদি এই চার কিশোরের পাশে দাঁড়ান, তাহলে পাবনার মাটি থেকে উঠে আসা এই ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা রোমের আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেতে পারে। স্বপ্নের মূল্য কখনো শুধু টাকার অঙ্কে মাপা যায় না। কখনো একটি সহযোগিতাই একটি প্রতিভার ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। ‘আমরাও বিজ্ঞানী’ টিমের চার কিশোরের স্বপ্নটিও যেন অর্থের অভাবে থেমে না যায়—এখন সেটিই প্রত্যাশা।