বাবা তমিজ উদ্দিন ও মেয়ে আছিয়া বেগম © টিডিসি ফটো
৩২ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া বরগুনার আছিয়া বেগমের সন্ধান মিলেছে পাকিস্তানে। দীর্ঘদিন পর মেয়ের খোঁজ পেলেও তাকে এখনো সামনে থেকে দেখতে পারেননি ৯৫ বছর বয়সি বাবা তমিজ উদ্দিন। মেয়েকে দেশে ফিরিয়ে এনে একবার চোখের সামনে দেখাই এখন তার শেষ ইচ্ছা।
১৯৯৪ সালে মাত্র ১৬-১৭ বছর বয়সে ঢাকার মিরপুরের বড়বাগ এলাকার বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন আছিয়া। এরপর পরিবারের সদস্যরা ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন খোঁজ করেও তার সন্ধান পাননি। একপর্যায়ে পরিবারের সবাই ধরে নেন, আছিয়া হয়ত আর বেঁচে নেই।
এর মধ্যে পেরিয়ে যায় তিন দশকের বেশি সময়। প্রায় তিন বছর আগে মেয়েকে হারানোর শোক নিয়ে মারা যান আছিয়ার মা রাহেলা। অন্য সন্তানদের বিয়ে দিয়ে সংসারী করলেও হারিয়ে যাওয়া মেয়ের অপেক্ষা কখনো শেষ হয়নি তমিজ উদ্দিনের।
সম্প্রতি ফেসবুকে নিজের পরিচয় এবং বাংলাদেশে থাকা বাবার নাম-ঠিকানা উল্লেখ করে একটি পোস্ট দেন আছিয়া। পরে পোস্টটি ‘খোঁজ’ নামের একটি ফেসবুক পেজে শেয়ার হলে তা বরগুনার বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দিন খানের নজরে আসে। তার মাধ্যমে আছিয়ার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়।
পরে ছবি, পারিবারিক তথ্যসহ বিভিন্ন বিষয় মিলিয়ে আছিয়ার পরিচয় নিশ্চিত করেন স্বজনরা। গত ২০ জুলাই থেকে বাবার সঙ্গে নিয়মিত মোবাইল ফোনে কথা বলছেন তিনি। ভিডিও কলে মেয়েকে দেখে কখনো হাসছেন তমিজ উদ্দিন, আবার আবেগে চোখের পানিও মুছছেন।
আছিয়া জানান, নিখোঁজ হওয়ার পর ঢাকার সদরঘাট এলাকা থেকে একটি চক্র তাকে প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে পাকিস্তানের মুজাফফরনগরে পাঠানো হয়। সেখানে ৪০ হাজার রুপির বিনিময়ে তাকে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয় বলে জানান তিনি।
পরে পাকিস্তানের এক নাগরিকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বর্তমানে তার ছয় মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। এক বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর নিজের বাবা ও পরিবারের কথা মনে পড়ে তার। এরপরই ফেসবুকে পরিবারের সন্ধান চেয়ে পোস্ট দেন আছিয়া।
পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়ার পর বাংলাদেশে ফিরে বাবার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা জানিয়েছেন আছিয়া। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছে তার পরিবার।
আছিয়ার ভাই মোস্তফা বলেন, ১৬-১৭ বছর বয়সে নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘদিন তারা বোনের কোনো খোঁজ পাননি। একসময় ধরে নিয়েছিলেন, তিনি হয়ত আর বেঁচে নেই। এখন বোনের সন্ধান পাওয়ার পর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।
স্বজন রিয়াজ উদ্দিন খান বলেন, ফেসবুকে পোস্টটি দেখে তিনি যোগাযোগ করেন। পরে ছবি ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে আছিয়ার সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক নিশ্চিত হয়।
বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার জানান, আছিয়াকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দুটি প্রক্রিয়া রয়েছে। তার বাংলাদেশি জন্মনিবন্ধন বা নাগরিকত্ব সনদ থাকলে তা দিয়ে পাকিস্তানে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে ট্রাভেল পাস নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে এসব নথি না থাকলে বাংলাদেশে থাকা স্বজনরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে পারবেন। এরপর প্রচলিত নীতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ৩২ বছর পর মেয়ের সন্ধান পাওয়ার পর তমিজ উদ্দিনের অপেক্ষা এখন শুধু একটাই। ফোনের পর্দায় নয়, মৃত্যুর আগে অন্তত একবার মেয়েকে নিজের সামনে দেখতে চান ৯৫ বছরের এই বাবা।