ফ্যামিলি কার্ড
তথ্য সংগ্রহকারী পদে বিএনপি নেতার স্ত্রী-মেয়ে-ভাতিজা-ভাতিজি ও ছাত্রদল-ছাত্রলীগ নেতা © সংগৃহীত
রংপুর মিঠাপুকুর উপজেলা ফ্যামিলি কার্ড শুমারীতে সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী পদে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা বিএনপি নেতার স্ত্রী, কন্যা, ভাতিজা-ভাতিজি, উপজেলা ছাত্রদল সভাপতিসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা চূড়ান্ত নিয়োগে স্থান পেয়েছেন বলে জানা গেছে। এঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে নানাবিধ অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে সমালোচনার শিকার হওয়ার পরে ক্ষমতাসীন দলের আস্থাভাজন হতে ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে পুরো উপজেলায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়োগ দিয়েছে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. পারভেজ।
মিঠাপুকুর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ জুলাই মিঠাপুকুর উপজেলা ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬ এর তথ্য সংগ্রহকারী নির্বাচন কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মো. আব্দুল হামিদ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে ফ্যামিলি কার্ড শুমারি কার্যক্রমের জন্য মিঠাপুকুর উপজেলার ১৭ টি ইউনিয়নে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োজিত করার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সুপারভাইজার পদে আবেদনপত্র দাখিল করে ৬৭০ জন ও তথ্য সংগ্রহকারী পদে প্রায় ৩২৪৩ জন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী প্র্যাকটিকাল, মৌখিক ও জিপিএ নম্বরের ভিত্তিতে পরীক্ষার ফলাফল নির্ধারণের কথা উল্লেখ ছিল।
এদিকে গত ১০ আগস্ট রাতে ফ্যামিলি কার্ড তথ্য সংগ্রহের জন্য স্বেচ্ছাসেবী নির্বাচন কমিটির মিঠাপুকুর উপজেলা সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. পারভেজ, সদস্য সচিব উপজেলা সমাজসেবা অফিসার আব্দুল হাকিম, সদস্য উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শাহনাজ ফারহানা আফরোজ, সদস্য উপজেলা কৃষি অফিসার লোকমান হেকিম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ড থানা তথ্যভাণ্ডার এর তথ্য সংগ্রহ জরিপকালীন তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োজিতকরণের মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ফলাফলে ২১৪ জন তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে ২১ জনকে নির্বাচিত করে মেধা তালিকা প্রকাশ করা হয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সামাজিক নিরাপত্তা শাখার প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ব্যবহারিক দক্ষতা যাচাই, জিপিএ,আচরণ ও মৌখিক প্রশ্নোত্তর পর্বে উত্তীর্ণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নির্বাচিত করার নির্দেশনা থাকলেও মিঠাপুকুর উপজেলার প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায় সরকার দলীয় নেতাদের বিশেষ সুপারিশেই অধিকাংশ পদে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী, নেতার স্ত্রী, নেতার মেয়ে, নেতার ভাতিজাকে নির্বাচিত করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার রাণীপুকুর ইউনিয়নের সুপারভাইজার নির্বাচিত করা হয়েছে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাহিদুল ইসলামের স্ত্রী তাজমুন নাহারকে, দুর্গাপুর ইউনিয়নের সুপারভাইজার নির্বাচিত করা হয়েছে উপজেলা ছাত্রদল সভাপতি মো. মাহমুদুল হাসানকে, বড় হযরতপুর ইউনিয়নের সুপারভাইজার নির্বাচিত হয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানীর খালাতো ভাই মো. মিরাজ আহমেদকে, কাফ্রিখাল ইউনিয়নের সুপারভাইজার নির্বাচিত করা হয়েছে সাংবাদিক বাবলুর রহমান বারীকে, পায়রাবন্দ ইউনিয়নের সুপারভাইজার নির্বাচিত করা হয়েছে ওই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুর রউফ সরকারের মেয়ে মোছা. রেজওয়ানা শারমিন প্রাপ্তিকে, চেংমারী ইউনিয়নে সুপারভাইজার নির্বাচিত করা হয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আওলাদের বোন মোছা. সুমাইয়া খাতুনকে, ভাংনী ইউনিয়নের সুপারভাইজার নির্বাচিত করা হয়েছে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের রংপুর মহানগর শাখার সাবেক সহ সভাপতি মোজাহিদুল হককে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুর্গাপুর ইউনিয়নের তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন রংপুর জেলা ছাত্রদলের সদস্য শাফিউল ইসলাম শিমুল ও তার বান্ধবী ফাহমিদা আক্তার মীম, উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানীর ভাতিজা মেহেদী হাসান ফুয়াদ, উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানীর ভাতিজি ফাহিমা আক্তার লিমা। এই ইউনিয়নের তথ্য সংগ্রহকারীর তালিকায় চিথলি দক্ষিণপাড়া গ্রাম থেকেই ৯ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে।
এছাড়াও পায়রাবন্দ ইউনিয়নের তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে বিএনপির উপজেলা নেতা হযরত আলীর মেয়ে নওরিন জাহান নিঝুম, বালুয়া মাসিমপুর ইউনিয়নে তথ্য সংগ্রহকারী নির্বাচিত হয়েছেন নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের অফিস সহকারী শফিকুল ইসলামের ভাতিজি ও দুই বোন মোছা. শামীমা নাছরিন শিলা ও মোছা. নুশরাত জেরিন, বড় হযরতপুর ইউনিয়নের তথ্য সংগ্রহকারী নির্বাচিত হয়েছেন ইউএনও কার্যালয়ের অফিস সহায়ক এনামুল হকের স্ত্রী আল্পনা বেগম।
এবিষয়ে মিঠাপুকুর উপজেলা ছাত্রদল সভাপতি মাহমুদুল হাসান বলেন, আমি শুমারিতে সুপারভাইজার পদে নির্বাচিত হয়েছি। পরীক্ষার মাধ্যমে এখানে যারাই যোগ্য তাকেই নিয়েছে। আমি শুমারিতে সুপারভাইজার পদে দলীয়ভাবে নির্বাচিত হইনি। এখানে আমাদের অধিকাংশ ছেলে নির্বাচিত না হবার জন্য অনেকের মন খারাপ। আমাদের দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত হচ্ছে যারা যোগ্য তাদেরকেই এখানে নিতে হবে। এখানে কোন দলীয়করন নেই। যাকে যোগ্য মনে করেছে, পরীক্ষার মাধ্যমে আমাদের তাদেরকেই রেখেছে।
দলীয় সুপারিশে সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী পদে বিএনপি নেতাকর্মী এবং তাদের পরিবারের লোকজনকে নির্বাচিত করা হয়েছে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে মিঠাপুকুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানী বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের শুমারিতে আমার কেউ টিকেনি। আমার ভাই ভাতিজা কেউ নেই। ফাহিমা আক্তার লিমা আমার ভাতিজি নয়। চিথলি দক্ষিণপাড়া বাজার বন্দরকেন্দ্রিক এলাকা। এখানে ৫ থেকে ৬ হাজার লোকের বসবাস। এটা মিঠাপুকুরের মধ্যে সবচাইতে বড় গ্রাম। অনেক শিক্ষিত লোকজন এখানে বসবাস করে। বন্দর হিসেবে চাহিদা একটু বেশি থাকে। আর এখানে মেধার ভিত্তিতে প্রশাসন নিয়েছে। আমাদের সুপারিশ একটাও নেয়নি।
উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাহিদের স্ত্রী ও উপজেলা ছাত্রদল সভাপতি মাহমুদুল হাসান তাহলে কিভাবে নির্বাচিত হলো প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন,যাদেরকেই নিয়েছে তাদের এখানে মেধার ভিত্তিতেই নিয়েছে। এখানে আমাদের করণীয় কিছু নেই। সুপারিশে কোন কাজ হয়নি। প্রশাসন ভাইভা নিয়েছে, মেধার ভিত্তিতে যাদের যোগ্য মনে করেছে তাদেরকেই নিয়েছে।
এদিকে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী সুপারভাইজার পদে দলীয়করণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে তীব্র সমালোচনা। আবেদনকারী প্রার্থীদের অভিযোগ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের আশ্বাস দেওয়ায় হাজার হাজার পরীক্ষার্থী একাধিক দিন টাকা ও সময় নষ্ট করে পরীক্ষা দিয়েছেন। প্রার্থী নির্বাচনে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের নির্বাচিত করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণার করেছেন।
ফ্যামিলি কার্ড তথ্য সংগ্রহের জন্য স্বেচ্ছাসেবী নির্বাচন কমিটির সদস্য সচিব ও মিঠাপুকুর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার আব্দুল হাকিম বলেন, এটা নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। আপনি ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা বলুন। এটার সভাপতি ছিলেন ইউএনও স্যার।
ফ্যামিলি কার্ড শুমারির সুপারভাইজার পদে দলীয়করণের বিষয়ে সদস্য সচিব হিসেবে আপনার বক্তব্য কি প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা শতভাগ মেধার ভিত্তিতে হয়েছে। ১৭ টা বোর্ডে ৩৪ জন অফিসারের মাধ্যমে পরীক্ষা নিয়ে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ মেধাকে গুরুত্ব দিয়ে এই রেজাল্ট প্রকাশ করেছি।
এবিষয়ে কথা বলতে অভিযুক্ত মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. পারভেজের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রশ্নযুক্ত ক্ষুদেবার্তা দেখেও কোনো উত্তর দেননি উপজেলা নির্বাহী অফিসার।
এ বিষয়ে রংপুর -৫ (মিঠাপুকুর) আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী বলেন, ইউএনও ও সমাজসেবা অফিসার ফ্যামিলি কার্ড শুমারির সঙ্গে জড়িত। আমি এটার সঙ্গে সম্পর্কিত নই।