পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে গৃহবধূর মৃত্যু © সংগৃহীত
টানা ভারী বর্ষণের মধ্যে কক্সবাজার শহরের ঝিলংজা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কলাতলী ঝিরঝিরি পাড়ায় ভয়াবহ পাহাড়ধসে রোজিনা আক্তার নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার (১১ জুলাই) রাতের এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
জানা যায়, রাতের খাবারের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন রোজিনা আক্তার। বাড়িতে অতিথি আসায় তাদের আপ্যায়নের জন্য রান্নাঘরে বিভিন্ন পদ প্রস্তুত করছিলেন তিনি। রান্নায় যেন কোনো ত্রুটি না থাকে, সে জন্য অত্যন্ত যত্নসহকারে কাজ করছিলেন। এদিকে প্রয়োজনীয় কিছু বাজারসামগ্রী কিনতে তার স্বামী মুজিবুর রহমান সন্তানদের নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। তখন বাড়িতে অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন এবং রোজিনা একাই রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
রাত আনুমানিক ৯টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। মুহূর্তের মধ্যেই বাড়ির পেছনের পাহাড় ধসে পড়ে সরাসরি রান্নাঘরের ওপর। বিশাল পরিমাণ মাটি, কাদা ও বাঁশঝাড় একসঙ্গে নেমে এসে রান্নাঘরটি সম্পূর্ণ মাটিচাপা পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই আটকা পড়েন রোজিনা আক্তার।
বিকট শব্দ শুনে অতিথিরা দ্রুত রান্নাঘরের দিকে ছুটে গিয়ে দেখেন, পুরো রান্নাঘর মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে। তারা রোজিনাকে আর দেখতে না পেয়ে চিৎকার শুরু করেন। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। কিন্তু বিপুল পরিমাণ মাটি ও ধ্বংসস্তূপ সরানো সম্ভব না হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হয়।
সংবাদ পেয়ে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দুটি উদ্ধারকারী ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধার অভিযান শুরু করে। প্রবল বৃষ্টি ও নরম মাটির কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবুও উদ্ধারকর্মীরা নিরলস চেষ্টা চালিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে মাটি সরানোর পর রোজিনা আক্তারকে উদ্ধার করেন।
তবে দীর্ঘসময় মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকায় তাকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধার শেষে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজারের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ আলম বলেন, দীর্ঘসময় মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকায় তিনি শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারেননি। তাই তাকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, টানা বর্ষণের সময় পাহাড়ধসের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান না করার এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুম এলেই কক্সবাজারের পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলো পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। তারপরও অনেক মানুষ জীবিকার তাগিদে কিংবা বিকল্প আবাসনের অভাবে এসব এলাকায় বসবাস করতে বাধ্য হন। ফলে প্রায় প্রতিবছরই পাহাড়ধসে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে।
রোজিনা আক্তারের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বামী ও সন্তানদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। প্রতিবেশী ও স্বজনরা জানান, অতিথিদের জন্য রাতের খাবার প্রস্তুত করতে গিয়ে এভাবে প্রাণ হারাবেন—এমন মর্মান্তিক পরিণতি কেউ কল্পনাও করতে পারেননি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে আবারও পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক থাকার এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারী বর্ষণের সময় পাহাড়ি ঢালের মাটি আলগা হয়ে যাওয়ায় যেকোনো মুহূর্তে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে। তাই জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।