বামন্দী পশুর হাট © টিডিসি
আসন্ন ঈদুল আজহা সামনে রেখে কয়েক সপ্তাহ ধরেই বিভাগের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও শতবর্ষী মেহেরপুর জেলার বামন্দী পশুর হাট জমে উঠেছে। হাটটিতে বিপুলসংখ্যক দেশি গরু উঠতে শুরু করায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। প্রতি হাটের দিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা এখান থেকে পশু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার বাজারে পশুর উপস্থিতি বেশি। তবে দাম নিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
ঈদুল আজহার আর মাত্র ১০ দিন বাকি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তম পশুর হাট হিসেবে পরিচিত মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দী-নিশিপুর পশুর হাটে সপ্তাহে দুই দিন শুক্রবার ও সোমবার বেচাকেনা চলে। কোনো কোনো মাসে হাটের সংখ্যা নয়টিতেও পৌঁছে।
হাট দুটিতে বিপুলসংখ্যক গরু ও ছাগল উঠছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে কেনাবেচা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা আসছেন গরু কিনতে। বর্তমানে কোরবানি দিতে ইচ্ছুক সাধারণ ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম হলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
হাটে ৭০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৬ লাখ টাকার বেশি মূল্যের গরু বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে ছাগলের দাম ৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে গরুর দাম নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
হাট ইজারাদারদের তথ্যমতে, চলতি মাসে ঈদুল আজহা উপলক্ষে অন্তত ৩০০ কোটি থেকে সাড়ে ৩৫০ কোটি টাকার পশু কেনাবেচার সম্ভাবনা রয়েছে।
কুমিল্লা থেকে আসা গরু ব্যবসায়ী আকবর আলী বলেন, ‘বামন্দী বাজারে গরুর সরবরাহ ভালো। এছাড়া মেহেরপুরের গরুর পশম মসৃণ হওয়ায় বাইরের বাজারে এর চাহিদা বেশি। তাই প্রতি বছরই মেহেরপুর থেকে গরু কিনে দেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করি। তবে এবার গরুর দাম একটু বেশি হওয়ায় টার্গেট পূরণ নাও হতে পারে।’
প্রান্তিক খামারি মোশারফ আলী বলেন, ‘বামন্দী বাজারে বিক্রির জন্য গরু নিয়ে এসেছি। খড়, ভুসিসহ গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় গরু লালন-পালনে অনেক খরচ হয়েছে। কিন্তু ব্যাপারিরা সেই তুলনায় কম দাম বলছেন। টার্গেট অনুযায়ী দাম না পেলে গরু বিক্রি করব না। ঢাকার ক্রেতারা এলে ভালো দাম পাওয়া যাবে। এ ছাড়া দালালদের উৎপাতও বেড়েছে। স্থানীয় কিছু ব্যাপারি সিন্ডিকেট করে গরু কিনছেন, যার কারণে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছি না।’
হাট ইজারাদার হারুন অর রশিদ বাচ্চু বলেন, ‘জাল টাকার ব্যবহার রোধে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সার্বক্ষণিক পুলিশের টহল রয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী খাজনা নিলে আরও বেশি পড়ত। তাই প্রতি হাজারে টাকা না নিয়ে প্রতিটি পশুর জন্য ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই লাভবান হচ্ছেন। আমাদের শুক্রবারের হাটে সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার গরু এবং প্রায় সাড়ে ৩ হাজার ছাগল বিক্রি হবে বলে আশা করছি। সব মিলিয়ে চলতি মাসে এই হাট থেকে ৩০০ কোটি থেকে সাড়ে ৩৫০ কোটি টাকার পশু বিক্রি হতে পারে।’
আরেক ইজারাদার রাশিদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, ‘বামন্দী পশুর হাটকে মেহেরপুর জেলার অর্থনীতির হৃদপিণ্ড বলা হয়। এই হাটকে কেন্দ্র করেই জেলার মানুষের বড় একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। আশপাশের অন্তত ১০ জেলার খামারি ও ব্যাপারিরা এখানে পশু কেনাবেচা করতে আসেন। ঈদকে সামনে রেখে যেসব হাট বসবে, সেখানে গড়ে ৫ হাজার করে গরু-ছাগল বিক্রি হবে। মাসজুড়ে আনুমানিক সাড়ে ৩৫০ কোটি টাকার কেনাবেচা হতে পারে।’
গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার দাস বলেন, ‘জেলা পুলিশের নির্দেশনায় হাটের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে। হাটের দিন একাধিক টিম নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে।’
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, মেহেরপুর জেলায় ছোট-বড় প্রায় এক হাজার খামারি রয়েছেন। এ বছর কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার ৫৬৯টি পশু। এর মধ্যে রয়েছে ৪০ হাজার ৩৪৯টি ষাঁড়, ৪ হাজার ৮৪৪টি বলদ, ৮ হাজার ৫০৯টি গাভি, ৪৮২টি মহিষ, ১ লাখ ১৫ হাজার ৬৬৫টি ছাগল এবং ২ হাজার ৭২০টি ভেড়া। জেলায় কোরবানির চাহিদা রয়েছে ৯০ হাজার ২৩৪টি পশু।
এদিকে ১৭ হাজার খামারে দেশি ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে মোটাতাজাকরণ করা হয়েছে ৬ লাখ ১৭ হাজার ৭২৩টি গবাদিপশু। এর মধ্যে প্রায় ২ লাখ ষাঁড় রয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, এসব পশুর সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা।