নিহতদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম © সংগৃহীত
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়া বাস থেকে জীবিত বের হওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন বেঁচে যাওয়া যাত্রী মোহাম্মদ রাজীব সরদার। তিনি বললেন, ‘বাস পানিতে পড়ার পর জানালা ধরে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। বাসের ভেতরে নিচের দিক থেকে পানি ঢুকে যে স্রোত তৈরি হইছে তার সাথেই আমি ভেসে যাই। কিভাবে যে বের হইছি, উপরওয়ালা জানে।’
জানা গেছে, গোয়ালন্দের জামলতা এলাকা থেকে দুর্ঘটনা কবলিত বাসটিতে উঠেছিলেন তিনি। বসেছিলেন বাসের একেবারে পেছনের দিকের একটি আসনে।
দুর্ঘটনা কবলিত বাসটির সব আসনেই যাত্রী ছিল বলে জানান মোহাম্মদ রাজীব। দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটের জিরো পয়েন্ট, অর্থাৎ যেখানে যানবাহনগুলো ফেরির জন্য অপেক্ষা করে, সেখান থেকেও দুইজন যাত্রী ওই বাসে উঠেছিলেন।
তিনি জানান, ফেরিতে উঠতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে জায়গা না পাওয়ায় পন্টুনের সামনেই পরবর্তী ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিল কুমারখালি থেকে ঢাকাগামী বাসটি। জানালা দিয়ে পরের ফেরিটি ঘাটেও ভিড়তে দেখেছিলাম। কিন্তু কি যে হলো, কিছুই বুঝি নাই। বাসটা হঠাৎ টান দিয়ে গিয়ে নদীতে পড়লো, আমার গায়ের ওপর আরো কয়েকজন, আমি অনেক চেষ্টা করেও সরাতে পারছিলাম না।
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত নারী, শিশুসহ ২৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে রাজবাড়ি জেলা প্রশাসন। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করে, মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার।
এ দুর্ঘটনায় নিহতদের বেশিরভাগেরই বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী এবং রাজবাড়ী জেলার বিভিন্ন এলাকায় বলে জানা গেছে। আকস্মিক এই দুর্ঘটনায় শোকের আবহ নিহতদের পরিবারগুলোতে। বৃহস্পতিবার সকালেই নিহত অনেকের মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে জেলা প্রশাসন।
স্বজনদের আহাজারী
ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মার পানিতে ডুবে যাওয়া বাসটিতে থাকা যাত্রীদের বেশিরভাগই ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় ফিরছিলেন। হঠাৎ এই দুর্ঘটনায় তাদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম।
বৃহস্পতিবার সকালে প্রিয়জনের মরদেহ নিতে এসে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনেই আহাজারি করছিলেন সাভারের পোশাক শ্রমিক আব্দুল আজিজ।
তিনিও দুর্ঘটনা কবলিত বাসটি থেকে বেঁচে ফেরা যাত্রীদের একজন। নিজে বেঁচে ফিরলেও সঙ্গে থাকা তিন স্বজনকে হারিয়েছেন তিনি।
আব্দুল আজিজ বলেন, ঈদের ছুটি শেষে গর্ভবতী স্ত্রী নাজমিরা বেগম, ছয় বছরের শিশু আব্দুর রহমান ও খালা শাশুড়ি নাসিমা বেগমকে নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলাম। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাসে উঠেছিলাম রাজবাড়ির কালুখালি থেকে।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ডুবে যাওয়া বাসটি থেকে নিজে কোনো রকমে বেরিয়ে আসতে পারলেও নিখোঁজ হন পরিবারের অন্য সদস্যরা। এ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে রাজবাড়ির কালুখালি কালিকাপুর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ উজ্জ্বলের। পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন শেষে ঢাকায় ফিরছিলেন এ ব্যবসায়ী।
বৃহস্পতিবার সকালেও দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের দুর্ঘটনাস্থলে তাকে খুঁজছিলেন উজ্জ্বলের বাবা। পরে জানতে পারেন রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে রয়েছে তার মরদেহ। সকাল থেকেই রাজবাড়ী সদর হাসপাতালজুড়ে ছিল শোকের আবহ। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ২৬ মরদেহের ২২টিকে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বাকিগুলোর পরিচয় শনাক্ত করে পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জেলা প্রশাসন। এদিকে বৃহস্পতিবার সকালেও দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছেন ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ডসহ উদ্ধারকর্মীরা।
রাজবাড়ির জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার জানান, এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালেও তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সবশেষ উদ্ধার হওয়া তিনটি মরদেহের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানান মিজ আক্তার। তাদেরকেও পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানান সুলতানা আক্তার। তিনি বলেন, নিহত একজনের স্বজনেরা দিনাজপুর থেকে রওয়ানা দিয়েছেন, তারা এলেই মরদেহ বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
এই দুর্ঘটনায় আর কেউ নিখোঁজ রয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিখোঁজ রয়েছেন এমন দাবি কারও স্বজন বা কেউ আমাদের কাছে করেননি। তবে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বুধবার বিকেলে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দুর্ঘটনা কবিলিত সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটিকে ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় পর উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মী মিঠুন গোস্বামী জানান, উদ্ধার অভিযানের পর থেকেই একে একে মরদেহ তুলে আনা হচ্ছিল। সবশেষ বাসটি উদ্ধার করার পর ১৪টি মরদেহ বের করে আনা হয়।
বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায় সোহার্দ্য পরিবহন নামে একটি যাত্রীবাহি বাস।
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এই ঘটনার একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, পানিতে পড়ার পর মুহূর্তেই তলিয়ে যায় দুর্ঘটনা কবলিত বাসটি। এসময় বেশ কয়েকজনকে সাতরে পাড়ে আসার চেষ্টা করতেও দেখা যায়। এদিকে, বৃহস্পতিবার সকালেও দৌলতদিয়া ঘাটের দুর্ঘটনা কবলিত এলাকায় উৎসুক মানুষকে ভীড় করতে দেখা গেছে।
সকালে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ঝড় এবং বৃষ্টির কারণে উদ্ধার তৎপরতায় সমস্যা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি পানিতে পড়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেউ নিখোঁজ রয়েছেন এমন দাবি থাকা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখা হবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা