গয়ানাথ সরকার © ফাইল ছবি
পাবনার চাটমোহর উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের কুমারগাড়া গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক গয়ানাথ সরকার জীবনের ৪৮ বছর কাটিয়েছেন শিক্ষকতার পেশায়। অসংখ্য শিক্ষার্থী তার কাছে পড়ে হয়েছেন ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার। মাস শেষে কেউ সম্মানী দিয়েছেন, কেউ দেননি—তবুও অভিযোগের ভাষা কখনো শোনা যায়নি তার মুখে। প্রতিদিন ভোরে ভাঙা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গভীর রাতে ঘরে ফিরতেন তিনি। অথচ আজ সেই শিক্ষক জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়ে রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করছেন।
গয়ানাথ জানান, ১৯৮৪ সালে এসএসসি পাসের পর দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা থেমে যায়। তখন থেকেই শুরু হয় প্রাইভেট পড়ানো ও দিনমজুরির কাজ। ইংরেজি ও অঙ্কে পারদর্শী হওয়ায় দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। একসময় পৌর শহরের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চাকরি পান। বেতন কম হলেও পেশার সম্মান আঁকড়ে ধরে ছিলেন দীর্ঘদিন।
তিন সন্তানের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালাতে অবিরাম পরিশ্রম করেছেন গয়ানাথ। বড় ছেলে এখন অনার্স প্রথম বর্ষে, দ্বিতীয় ছেলে দশম শ্রেণিতে, আর মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। প্রাইভেট পড়ানো ও স্কুলের বেতনে ভালোই চলছিল সংসার। কিন্তু বেতন না বাড়ায় স্কুলের চাকরি ছাড়তে হয়। এরপর শুধু প্রাইভেট পড়ানোতে মন দেন।
দুঃসময় নেমে আসে যখন স্থানীয় কয়েকটি স্কুল থেকে অভিভাবকদের বলা হয়, স্কুলের শিক্ষকের কাছে না পড়ালে ভালো নম্বর না পেলে দায় নেবে না প্রতিষ্ঠান। এতে একে একে শিক্ষার্থী হারিয়ে পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়েন তিনি।
সংসার ও সন্তানদের পড়াশোনা চালাতে বাধ্য হয়ে এখন প্রতিদিন ৩০০–৩৫০ টাকা মজুরিতে রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজ করছেন গয়ানাথ। যিনি একসময় ছাত্রদের জীবনের ভিত গড়তেন, আজ তিনিই মানুষের বসতবাড়ির ভিত গড়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
গলা ধরে আসা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ছাত্রাবস্থায় প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেছিলাম। চেয়েছিলাম জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সম্মানের সঙ্গে শিক্ষকতা করতে। কিন্তু ভাগ্য আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। কষ্ট হয়, কিন্তু এটাই এখন আমার নিয়তি।’