‘জিএইউ ধান–৪’ উদ্ভাবন করেছেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) গবেষকেরা © সংগৃহীত
স্বল্পমেয়াদি, উচ্চ ফলনশীল ও চিকন দানার নতুন আউশ ধানের জাত ‘জিএইউ ধান–৪’ উদ্ভাবন করেছেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) গবেষকেরা। প্রায় এক দশকের গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার পর সম্প্রতি জাতীয় বীজ বোর্ড জাতটির অনুমোদন দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এ ধান দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার ও কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শনিবার (৪ এপ্রিল) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রনি ইসলামের স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
গাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এম ময়নুল হক ও অধ্যাপক মো. মসিউল ইসলামের নেতৃত্বে গবেষক দলটি নতুন জাতটি উদ্ভাবন করেন। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত ধানের জাতের সংখ্যা দাঁড়াল চারটিতে এবং মোট উদ্ভাবিত ফসলের জাতের সংখ্যা বেড়ে হলো ৯৫টি।
গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, প্রচলিত আউশ ধান ‘পারিজা’ এবং উচ্চ ফলনশীল চিকন জাত ‘বিইউ ধান–২’-এর সংকরায়নের মাধ্যমে ‘জিএইউ ধান–৪’ উদ্ভাবন করা হয়। দীর্ঘ গবেষণা ও নির্বাচনের পর জিএইউ–৯৯৭৪–৫২–৭–২ লাইন থেকে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য অর্জিত হয়। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা শেষে ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় জাতটি অনুমোদন পায়।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে আউশ ধানের ফলন সাধারণত আমন ও বোরো মৌসুমের তুলনায় কম হলেও নতুন এ জাত সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম। বীজ বপনের ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যেই ফসল পরিপক্ব হয়। ফলে কৃষকেরা দ্রুত জমি খালি করে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদনের সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাপ্রবণ এলাকায় এটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
পুষ্টিগুণের দিক থেকেও ‘জিএইউ ধান–৪’ সমৃদ্ধ। এতে অ্যামাইলেজ এনজাইমের পরিমাণ প্রায় ২৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং প্রোটিনের পরিমাণ প্রায় ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ফলে এটি সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। অনুকূল পরিবেশে হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৫ দশমিক ৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব, যা প্রচলিত জাতের তুলনায় গড়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি।
গবেষকেরা জানান, এ জাতের ধান রোগবালাই সহনশীল এবং কম পানি প্রয়োজন হয়, ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেও এটি চাষযোগ্য। প্রতি হেক্টরে ২৫ থেকে ৩০ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়, যা কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়ক।
চাষাবাদের ক্ষেত্রে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বীজতলায় বপন এবং ২০ থেকে ২২ দিনের চারা কাদা জমিতে রোপণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০ সেন্টিমিটার ও গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১৫ সেন্টিমিটার রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন গবেষকেরা।
এ বিষয়ে অধ্যাপক মো. মসিউল ইসলাম বলেন, ‘কম সময়ে বেশি ফলন ও বাজারযোগ্য মান নিশ্চিত করাই ছিল আমাদের লক্ষ্য। ‘জিএইউ ধান–৪’ সেই প্রত্যাশা পূরণ করেছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘গবেষকদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও মেধার ফল এই উদ্ভাবন। নতুন জাতটি দেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’