এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২২ সালে রেকর্ড ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাওয়ার পর পরবর্তী চার বছরে তা ধারাবাহিকভাবে কমে এবার ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জনে নেমেছে। ফলে ২০২৬ সালের ফলাফলে গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্নসংখ্যক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। শুধু সংখ্যার হিসাবে নয়, ২০২২ সালের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৯২৬ জন।
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে সোমবার (১০ আগস্ট)। সকাল ১০টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এর আগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল হস্তান্তর করেন।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক ড. সৈয়দ আক্তারুজ্জামান ফলাফল তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন উপস্থিত ছিলেন।
এ বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমি ক ২৫ শতাংশ। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ। গত বছর সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার কমেছে ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।
তবে পাসের হারের পাশাপাশি এবারের ফলাফলের আরেকটি বড় দিক হলো জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ২০২৬ সালে মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এর মধ্যে ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন ছাত্রী এবং ৫২ হাজার ৭৮০ জন ছাত্র। অর্থাৎ ছাত্রের তুলনায় ১১ হাজার ১১৬ জন বেশি ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
জিপিএ-৫ পাওয়ার গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এবারকার পতনের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২২ সালে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। গত ২৫ বছরের তথ্যের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ। ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছিল ৮৬ হাজার ২৬২ জন।
কিন্তু ২০২২ সালের সেই রেকর্ডের পর থেকেই চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। পরের বছরই জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। ২০২৩ সালে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৭৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সর্বোচ্চ রেকর্ড থেকে কমে যায় ৮৬ হাজার ২৪ জন।
২০২৪ সালে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা আরও কিছুটা কমে ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জনে দাঁড়ায়। ওই বছর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৯৮ হাজার ৭৭৬ জন ছিল ছাত্রী এবং ৮৩ হাজার ৩৫৩ জন ছাত্র।
এরপর ২০২৫ সালে আবার বড় ধরনের পতন দেখা যায়। ওই বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ৭৩ হাজার ৬১৬ জন ছাত্রী এবং ৬৫ হাজার ৪১৬ জন ছাত্র ছিল।
সর্বশেষ ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা আরও কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন। একই সঙ্গে ২০২২ সালের সর্বোচ্চ ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জনের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৯২৬ জন।
চার বছরের ব্যবধানের হিসাবটিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৩ সালে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৭৮ জন থেকে ২০২৪ সালে কমে ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন হয়েছিল। অর্থাৎ ওই এক বছরে কমেছিল ১ হাজার ৪৪৯ জন। কিন্তু ২০২৫ সালে কমার পরিমাণ আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩ হাজার ৯৭ জনে। আর ২০২৬ সালে এক বছরের ব্যবধানে আবার কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন।
অর্থাৎ ২০২২ সালের রেকর্ডের পর জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা কমার ধারাটি শুধু এক বছরের সাময়িক পতন নয়। বরং টানা চার বছর ধরে সর্বোচ্চ গ্রেড পয়েন্ট পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিম্নমুখী। ২০২২ সালের ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন থেকে ২০২৩ সালে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৭৮, ২০২৪ সালে ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯, ২০২৫ সালে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ এবং ২০২৬ সালে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জনে নেমেছে।
এই প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২ সাল ছিল জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী একটি বছর। ওই বছর যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ গ্রেড পয়েন্ট পেয়েছিল, পরবর্তী বছরগুলোতে সেই মাত্রা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। বরং প্রতিটি বছর আগের বছরের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে।
তবে এই সংখ্যাকে শুধু শিক্ষার্থীদের মেধার পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ধরন, মূল্যায়ন পদ্ধতি, নম্বর দেওয়ার প্রবণতা, পরীক্ষার কাঠামো এবং ফলাফল তৈরির প্রক্রিয়ার পরিবর্তনও জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যায় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে জিপিএ-৫ কমেছে মানেই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান একই অনুপাতে কমেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
এবারের ফলাফলে আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট হয়েছে—জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্রীদের এগিয়ে থাকার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালে মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন। বিপরীতে ছাত্র পেয়েছে ৫২ হাজার ৭৮০ জন। অর্থাৎ ছাত্রের চেয়ে ১১ হাজার ১১৬ জন বেশি ছাত্রী সর্বোচ্চ গ্রেড পয়েন্ট পেয়েছে।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেও ছাত্রীদের ফলাফলের এই এগিয়ে থাকা দেখা গেছে। এ বছর সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে উত্তীর্ণ মোট ছাত্রের চেয়ে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৮২ জন বেশি ছাত্রী উত্তীর্ণ হয়েছে। একই সঙ্গে ছাত্রের চেয়ে ১১ হাজার ৪০১ জন বেশি ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
ফলে ২০২৬ সালের এসএসসি ফলাফলের সামগ্রিক চিত্রে দুটি বিষয় পাশাপাশি উঠে এসেছে। একদিকে পাসের হার কমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমেছে, অন্যদিকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর মধ্যেও জিপিএ-৫ ও উত্তীর্ণের সংখ্যায় ছাত্রীদের ধারাবাহিক এগিয়ে থাকা শিক্ষাব্যবস্থায় মেয়েদের ভালো ফলাফলের প্রবণতাকে আবারও সামনে এনেছে।