বড় আকারের ধস নেমেছে মার্কিন শেয়ারবাজারে © সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির ব্লু সুয়াপের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগে বিশ্ব শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে ব্যাপক দরপতন হয়েছে। এর আগে বুধবার শেয়ারবাজার থেকে এক দিনেই ৩ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের লোকসান গুনল যুক্তরাষ্ট্র। খবর গার্ডিয়ানের
একইদিনে জাপানের নিক্কেই সূচক প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ঘিরে আতঙ্কের পর এটিই সূচকটির সবচেয়ে বড় পতন। দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক কমেছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। তাইওয়ানের তাইএক্স সূচকও ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির সম্ভাব্য বড় জয় এআই খাতে বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বিক্রি করছেন। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার নির্মাণ, এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আসতে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাজারের এই পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়ের মতো’ বলে মন্তব্য করেছেন সিএমসি মার্কেটসের এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের প্রধান ক্রিস্টোফার ফোর্বস। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘ক্লায়েন্টরা সূচক ও শেয়ারে বড় বিনিয়োগ নিয়ে অবস্থান করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাদের সবাইকে লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সারা রাত ও দিনজুড়ে আমাদের ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে মার্জিন কল ও অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি খুবই আবেগের, কারণ বিনিয়োগকারীরা কোনো শেয়ার বা বাজার পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের অবস্থান ও ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন। এরপর যখন তাদের বলা হয় যে তারা অর্থ হারিয়েছেন, তখন তা মেনে নেওয়া কঠিন।’
ফোর্বসের ভাষ্য, এটি শুধু শেয়ারের মূল্যায়নে সাময়িক ধাক্কা নয়; বরং নীতিগত ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এর ফলে এআই, ডেটা সেন্টার, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং শেয়ারবাজারে মূলধন সংগ্রহের কার্যক্রমে গতি কমে যেতে পারে।
এআই খাতের শেয়ারের অতিরিক্ত মূল্যায়ন এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ-বুদ্বুদ নিয়ে কয়েক মাস ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন বিশ্লেষকেরা। বুধবার সেই আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক শেয়ার বিক্রির প্রবণতা দেখা যায়। দেশটির প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচক কমেছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ১ হাজার ৮৩৩ দশমিক শূন্য ৬ পয়েন্ট বা ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমেছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের পতন হয়েছে ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
এআই খাতের উত্থানে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়া মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে বড় পতন হয়েছে। স্যানডিস্কের শেয়ারের দাম কমেছে ২২ শতাংশ। মাইক্রন ও এএমডির শেয়ারমূল্য কমেছে ১৭ শতাংশ করে। এ ছাড়া চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার শেয়ারের দাম কমেছে ৯ শতাংশের বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্রেটিক পার্টি ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও সম্প্রসারণের বিষয়ে তুলনামূলক বেশি সমালোচনামুখর। দলটি কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে প্রযুক্তি খাতে নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালায় পরিবর্তন আসতে পারে। এতে এআই খাতে বিনিয়োগের গতি কমার আশঙ্কা রয়েছে। এর পাশাপাশি ডেটা সেন্টার স্থাপনের বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে জনমতও বাড়ছে।
ক্যাপিটাল ডটকমের জ্যেষ্ঠ আর্থিক বাজার বিশ্লেষক কাইল রোডা এই দরপতনকে ‘ভয়াবহ বিক্রির চাপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে যে পতন শুরু হয়েছিল, ডেমোক্রেটিক নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস প্রযুক্তি খাতের নিয়ন্ত্রণ এবং এআই বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ কীভাবে বদলে দিতে পারে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগে তা আরও তীব্র হয়েছে।
রোডা আরও বলেন, এআই খাতের বিনিয়োগ এমনিতেই কিছুটা নড়বড়ে অবস্থায় ছিল। চলতি আয়ের মৌসুমে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফলও বাজারের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ নামে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের সাতটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আয় ও প্রবৃদ্ধির তথ্যেও প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বলতা দেখা গেছে। একই সঙ্গে এআই খাতে বিনিয়োগের গতি কমার ইঙ্গিত মিলেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের পরিস্থিতি বুঝতে দেশটির সর্বশেষ কর্মসংস্থান প্রতিবেদন প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এ প্রতিবেদনও বিশ্ববাজারে বিনিয়োগকারীদের পরবর্তী সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।