অস্কারজয়ী দুই ইসরায়েলি নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোর © টিডিসি ছবি
গাজায় বেসামরিক মানুষ হত্যার ঘটনা নিয়ে তথ্যচিত্র ‘নাজা’ নির্মাণ করায় অস্কারজয়ী দুই ইসরায়েলি নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোরের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন দেশটির সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহার। তাদের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
‘নাজা’ তথ্যচিত্রটি প্রযোজনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান। ইসরায়েলের গোয়েন্দা বাহিনীতে ব্যবহৃত একটি সংক্ষিপ্ত রূপ থেকে তথ্যচিত্রটির নাম নেওয়া হয়েছে। গাজায় কোনো বিমান হামলা চালালে কতজন বেসামরিক মানুষ নিহত হতে পারেন, সেই সম্ভাব্য সংখ্যা বোঝাতে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা এই শব্দ ব্যবহার করে।
তথ্যচিত্রটিতে ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোর ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার ২৪ জন হুইসেলব্লোয়ারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তারা গাজায় হামলার জন্য ব্যবহৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন। এসব হামলায় কয়েক হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে তথ্যচিত্রটিতে তুলে ধরা হয়েছে।
এক সাক্ষাৎকারে এক হুইসেলব্লোয়ার দাবি করেন, গাজায় একজন হামাস সদস্যকে হত্যার জন্য ৫০০ জন বেসামরিক মানুষ মারার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
৮০ মিনিটের এই তথ্যচিত্রটি শনিবার ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছে। প্রদর্শনীর পর দর্শকেরা টানা ২৫ মিনিট দাঁড়িয়ে করতালি দেন। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের ইতিহাসে এটি ছিল রেকর্ড সময়ের করতালি।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নির্মাতাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ইসরায়েলের সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহার। তিনি অভিযোগ করেন, ‘বিশ্বের ইহুদিবিদ্বেষীদের কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়ার জন্য তারা নিজেদের মাতৃভূমির ক্ষতি করতেও প্রস্তুত।’
এরপর জোহার লেখেন, ‘রাষ্ট্রদ্রোহের জন্য আমি অবিলম্বে এসব ঘৃণ্য নির্মাতার ইসরায়েলি নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ নেব।’
ইসরায়েলের আরও কয়েকজন মন্ত্রীও দুই নির্মাতার সমালোচনা করেছেন। ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোর ২০২৫ সালে ‘নো আদার ল্যান্ড’ তথ্যচিত্রের জন্য অস্কার জেতেন। ওই তথ্যচিত্রে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিষয় তুলে ধরা হয়।
ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দুই নির্মাতাকে আক্রমণ করেন।
তিনি লেখেন, ‘আপনারা পুরো ইসরায়েলি জনগণের জন্য লজ্জা ও অপমান। চলে যান!’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, আপনাদের বন্ধুরা—অর্থাৎ গাজায় থাকা আমাদের শত্রু হামাস—আপনাদের দুহাত বাড়িয়ে স্বাগত জানাবে।’
ইসরায়েলে নাগরিকত্ব বাতিল করা আইনগতভাবে সম্ভব হলেও এই আইন খুব কমই প্রয়োগ করা হয়। ২০২২ সালে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, কেউ রাষ্ট্রের প্রতি ‘আনুগত্য’ দেখাতে ব্যর্থ হলে তার নাগরিকত্ব বাতিল করা যেতে পারে। গুপ্তচরবৃত্তি বা রাষ্ট্রদ্রোহের মতো কর্মকাণ্ডকে এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০২৩ সালে আইনটি আরও সংশোধন করা হয়। এর আওতায় ‘সন্ত্রাসবাদের’ দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তিদের নাগরিকত্বও বাতিলের সুযোগ রাখা হয়।
আইন অনুযায়ী, নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আবেদন করতে হয়। এরপর আইনমন্ত্রীকে সেটি অনুমোদন করতে হয়। সবশেষে বিচারকদের ওই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করতে হয়।
২০২৪ সালের ‘নো আদার ল্যান্ড’ তথ্যচিত্রের বিশ্ব প্রিমিয়ারের পর ইউভাল আব্রাহামের পরিবারের বাড়িতে ডানপন্থী একটি উগ্রপন্থী দল হামলা চালিয়েছিল। ওই তথ্যচিত্রে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের বিষয় তুলে ধরা হয়।
আব্রাহাম দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘আমরা এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে ঝুঁকি নিচ্ছি, যে ব্যবস্থা আমাদের সুবিধা দেয় এবং যার প্রতিষ্ঠার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ইহুদি-ইসরায়েলি আধিপত্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ফিলিস্তিনির ক্ষেত্রে তাদের বাড়িতে ডানপন্থী কোনো উগ্রপন্থী দল আসে না; বরং আসে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত বুলডোজার ও অস্ত্র।’
আব্রাহাম বলেন, ‘ভাবুন তো, গাজায় কোনো ফিলিস্তিনি সাংবাদিক যদি আমাদের মতো কাজ করার চেষ্টা করতেন এবং ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ফোন করে কথা বলতেন। এর সঙ্গে আমাদের পরিস্থিতির কোনো তুলনাই চলে না। সম্ভবত তাকে হত্যা করা হতো।’
‘নাজা’ তথ্যচিত্রের বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, এতে করা অভিযোগ তারা ‘দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান’ করে। বেনামি সূত্রের সাক্ষ্য ব্যবহার নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছে। সামরিক বাহিনী বলেছে, ওই হুইসেলব্লোয়ারদের পরিচয় যাচাই করা সম্ভব নয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়। ইসরায়েলি সরকারি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এএফপির হিসাব অনুযায়ী, ওই হামলায় ১ হাজার ২২১ জন নিহত হন। হামাসের যোদ্ধারা ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায়।
এর পরবর্তী তিন বছরে ইসরায়েলের টানা বোমাবর্ষণে ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নিহতদের বেশির ভাগই বেসামরিক মানুষ।