প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
পাকিস্তানজুড়ে বজ্রঝড়, ভারী বর্ষণ, আকস্মিক বন্যা এবং হিমবাহ গলা হ্রদের পানি উপচে পড়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিএমএ) আগামী ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য জাতীয় সতর্কবার্তা জারি করে জানিয়েছে, পাকিস্তান বর্তমানে একটি চরম আবহাওয়াগত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজধানী ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডিসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিক শহুরে বন্যার (আরবান ফ্লাডিং) সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রাদেশিক ও জেলা প্রশাসনগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভূমিধসের আশঙ্কায় পর্যটক ও ভ্রমণকারীদের পাহাড়ি অঞ্চলে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চলতি মাসের শেষ নাগাদ পাকিস্তানে টানা চতুর্থ বছরের মতো ভয়াবহ মৌসুমি বায়ুর আগমন ঘটতে যাচ্ছে। গত বছরও মৌসুমি বৃষ্টি ও বন্যায় দেশটিতে ২৭৫ জন শিশুসহ এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং গৃহহীন হয়েছিল প্রায় ৩০ লাখ মানুষ। তবে ২০২২ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যা—যা মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছিল এবং দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে দিয়েছিল—তা পাকিস্তানকে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে পাকিস্তানের অবদান ১ শতাংশেরও কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শীর্ষ পাঁচটি দেশের মধ্যে অন্যতম এই দেশ।
চলতি বছর গিলগিট-বালতিস্তানে তাপমাত্রা রেকর্ড ৪৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (১১৯.৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পৌঁছায়, যা ১৯৭১ সালের পর সর্বোচ্চ। এই তীব্র তাপদাহের কারণে পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এই অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্রুত গলছে এবং বরফ গলা হ্রদগুলোর পানি উপচে পড়ছে।
মেরু অঞ্চলের বাইরে পাকিস্তানই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি হিমবাহের আবাসভূমি। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মতে, হিন্দুুকুশ, হিমালয় এবং কারাকোরাম পর্বতমালায় হিমবাহ গলে গিলগিট-বালতিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় ৩,০০০-এরও বেশি হিমবাহ হ্রদ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩টি হ্রদ যেকোনো সময় ফেটে যাওয়ার মতো বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে, যা এর আশপাশে বসবাসকারী ৭১ লাখেরও বেশি মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
এই হ্রদগুলো ফেটে গেলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখ লাখ ঘনমিটার পানি ও কাদামাটির ঢল নেমে নিচের দিকের সেতু, কৃষিজমি এবং পুরো লোকালয় ধ্বংস করে দিতে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় ২০১৭ সালে ইউএনডিপির সহায়তায় ‘গ্লোফ-২’ নামক একটি ঝুঁকি হ্রাস প্রকল্প চালু করা হলেও গিলগিট-বালতিস্তান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক জাকির হুসাইন জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের পরিধি অত্যন্ত সীমিত। অনেক উপত্যকায় কোনো আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাই নেই। এমনকি হুনজা উপত্যকার শিসপার নামক যে একটি মাত্র স্থানে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা সচল ছিল, সেখানেও হিমবাহের আচরণ পরিবর্তনের পর কোনো সতর্কবার্তা তৈরি হয়নি।
২০২২ সালের সেই প্রলয়ঙ্করী বন্যায় পাকিস্তানে প্রায় ১,৭০০ মানুষের মৃত্যু হয়, ৩ কোটিরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। এই ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে জেনেভায় অনুষ্ঠিত দাতা সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ১১ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী সংস্থা ওচা (OCHA) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মাত্র ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ছাড় করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জাকির হুসাইন বলেন, উন্নত বিশ্বের কার্বন নিঃসরণের মাশুল গুনতে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো তহবিল ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের ক্ষেত্রে তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে না। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং জলবায়ুর পূর্বাভাসকে মাঠপর্যায়ের দুর্যোগ রেসপন্স ম্যাট্রিক্সের সাথে একীভূত করতে না পারাকে পাকিস্তানের এই চরম সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।