ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ © সংগৃহীত
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শেষ হলে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোকে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।
শনিবার কয়েকটি আরব ও মুসলিম দেশের নেতাদের সঙ্গে ফোনালাপে ট্রাম্প বলেন, যদি ইরান যুদ্ধের অবসানে কোনো সমঝোতা হয়, তাহলে তিনি চান সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করুক এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিক।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের জন্য ট্রাম্পের বড় কূটনৈতিক লক্ষ্য হচ্ছে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি নিশ্চিত করা। তবে বর্তমান আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সামনে ইসরায়েলের নির্বাচন থাকায় তা সহজ হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
শনিবার ট্রাম্প সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর, জর্ডান ও বাহরাইনের নেতাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। আলোচনায় মূল বিষয় ছিল ইরানকে ঘিরে উদীয়মান সমঝোতা।
ফোনালাপে অংশ নেওয়া নেতারা, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ, সম্ভাব্য এই চুক্তির প্রতি সমর্থন জানান। ইরান যুদ্ধ নিয়ে তিনি তুলনামূলক কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘তারা সবাই বলেছে, আমরা এই চুক্তির ব্যাপারে আপনার সঙ্গে আছি। আর যদি এটি কার্যকর না হয়, তবুও আমরা আপনার পাশে থাকব।’
আলোচনার পেছনের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প ওই নেতাদের বলেন, তিনি এরপর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করবেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব শিগগিরই এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হবে যখন ইসরায়েলের নেতাও একই ফোনালাপে অংশ নেবেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের স্পষ্টভাবে জানান যে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যেসব দেশ এখনো আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেয়নি বা ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি করেনি, তাদের সবাইকে তিনি সেই প্রক্রিয়ায় দেখতে চান।
বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার ও পাকিস্তানের নেতারা ট্রাম্পের এই প্রস্তাবে বিস্মিত হন। কারণ এসব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘লাইনজুড়ে কিছুক্ষণ নীরবতা ছিল। পরে ট্রাম্প মজা করে জিজ্ঞেস করেন, আপনারা এখনো আছেন তো?’
এরপর ট্রাম্প জানান, তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ আগামী কয়েক সপ্তাহে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আরও আলোচনা চালাবেন।
রোববার ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘এ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশের সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। ঐতিহাসিক আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে তাদের যোগদানের মাধ্যমে এই সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে।’
তিনি এমনও ইঙ্গিত দেন যে, ভবিষ্যতে একদিন ইরানও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে পারে। তবে এর জন্য তেহরানকে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে হবে, যা ইরান কয়েক দশক ধরে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। বর্তমান ইরানি শাসকগোষ্ঠী ইসরায়েলকে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে দেখে এবং এর বিরোধিতাকে নীতিগত অবস্থান হিসেবে ধরে রেখেছে।
মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম, যিনি ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির সমালোচক এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্প্রসারণের জোরালো সমর্থক, তিনিও ট্রাম্পের উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছেন।
তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘যদি ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চলমান আলোচনার ফলে আরব ও মুসলিম মিত্ররা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে সম্মত হয়, তাহলে এটি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলোর একটি হবে।’
গ্রাহাম সৌদি আরবসহ অন্য দেশগুলোকে ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রস্তাবিত এই পথে যেতে অস্বীকৃতি জানালে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়বে এবং এই শান্তি প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য থাকবে না। ইতিহাসও এটিকে বড় ভুল হিসেবেই দেখবে।’
তবে বাস্তবতা এখনো জটিল। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আগে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও গত এক বছরে তিনি এ বিষয়ে অনেকটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
গত নভেম্বরে ওভাল অফিসে এক বৈঠকে ট্রাম্প সৌদি যুবরাজকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে যুবরাজ তখন তাতে আপত্তি জানান এবং বৈঠকের পরিবেশ কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক মতপার্থক্য রিয়াদকে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি সরকারের বিষয়ে আরও কঠোর ও সন্দিহান করে তুলেছে।
সৌদি কর্মকর্তারা এখনো বলছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সময়সীমাবদ্ধ ও অপরিবর্তনীয় একটি রূপরেখা মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি না দিলে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে না। তবে ইসরায়েল সরকার এ শর্ত মানতে রাজি নয়।
ইসরায়েলি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত ইসরায়েলি নির্বাচনের আগে এবং নতুন সরকার গঠনের চিত্র পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত রিয়াদ এ বিষয়ে কোনো বড় পদক্ষেপ নেবে না।