ককরোচ জনতা পার্টি © টিডিসি ফটো
ঘৃণ্য, জেদি এবং প্রায় অবিনাশী হিসেবে পরিচিত তেলাপোকাকে কেন্দ্র করে তৈরি একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন রাজনৈতিক গোষ্ঠী মাত্র এক সপ্তাহেরও কম সময়ে ভারতের রাজনীতিতে আলোচনার ঝড় তুলেছে। এই ডিজিটাল আন্দোলনটি কোটি কোটি অনুসারী অর্জন করেছে এবং মূলধারার গণমাধ্যমেও ব্যাপক মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছে। এমনকি অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদরাও এখন এই উত্থানকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
বিচারপতির মন্তব্য থেকেই শুরু বিতর্ক
এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। একটি মামলার শুনানির সময় তিনি মন্তব্য করেন, ‘বেকার তরুণরা তেলাপোকা ও পরজীবীর মতো সাংবাদিকতা ও অ্যাক্টিভিজমের দিকে ঝুঁকছে।’ পরে তিনি অবশ্য স্পষ্ট করে জানান, তিনি সমগ্র তরুণ সমাজকে বোঝাতে কথাটি বলেননি, বরং শুধুমাত্র “নকল ও ভুয়া ডিগ্রিধারী” ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য করেই এই মন্তব্য করেছিলেন।
কিন্তু ততক্ষণে তার মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় ক্ষোভ, ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের ঢেউ। এই অনলাইন প্রতিক্রিয়া থেকেই জন্ম নেয় একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক ধারণা—‘Cockroach Janta Party’ বা তেলাপোকা জনতা পার্টি, সংক্ষেপে CJP। নামটি ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)-এর একটি স্পষ্ট প্যারোডি, যারা ২০১৪ সাল থেকে দেশ শাসন করছে।
সমালোচক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, বিজেপির শাসনামলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার হ্রাস পেয়েছে। যদিও বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে।
CJP কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়; এটি মূলত রাজনৈতিক ব্যঙ্গকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি অনলাইন আন্দোলন। এই আন্দোলনের সদস্য হওয়ার শর্তগুলোও রসাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে—যেমন বেকার হওয়া, অলস থাকা, সারাক্ষণ অনলাইনে সক্রিয় থাকা এবং “পেশাদারভাবে ক্ষোভ প্রকাশ বা র্যান্ট করার দক্ষতা” থাকা।
এই উদ্যোগের সূচনা করেন ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দিপকে, যিনি একজন রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ এবং বর্তমানে বোস্টন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। তিনি জানান, এই ধারণার জন্ম হয়েছিল একেবারেই একটি কৌতুক হিসেবে।
যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে তিনি ভারতের আম আদমি পার্টির সঙ্গে কাজ করেছিলেন। এই দলটি এক দশকেরও বেশি আগে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে আসে এবং সামাজিক মাধ্যমে তাদের শক্তিশালী উপস্থিতির জন্য পরিচিত।
বিবিসি মারাঠিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম আমরা সবাই একসাথে আসতে পারি, হয়তো শুধু একটি প্ল্যাটফর্ম শুরু করা যেতে পারে।’
কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা ছিল তার প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বড়।
অনলাইন ভাইরাল থেকে বাস্তব আন্দোলন
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই CJP একটি গুগল ফর্মের মাধ্যমে হাজার হাজার সদস্য সংগ্রহ করে। সামাজিক মাধ্যমে হ্যাশট্যাগ #MainBhiCockroach (“আমিও তেলাপোকা”) ভাইরাল হয়ে ওঠে এবং বিরোধীদলীয় নেতারাও এতে সমর্থন জানান।
গত বুধবার বিরোধী শীর্ষ নেতা অখিলেশ যাদব এক্স-এ লেখেন, ‘বিজেপি বনাম সিজেপি’।
এই অনলাইন আলোড়ন খুব দ্রুত বাস্তব জীবনেও ছড়িয়ে পড়ে। তরুণ স্বেচ্ছাসেবীরা তেলাপোকার পোশাক পরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিতে শুরু করেন, যা ছিল এই প্রতীককে ব্যঙ্গাত্মকভাবে গ্রহণ করার একটি নাটকীয় রূপ।
গত বৃহস্পতিবার CJP-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) অনুসারী অতিক্রম করে, যা ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের (প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন অনুসারী) চেয়েও বেশি। তবে একই সময়ে CJP-এর এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট, যেখানে ২ লাখের বেশি অনুসারী রয়েছে, ভারতে দেখা যাচ্ছে না। ব্যবহারকারীরা চেষ্টা করলে জানানো হচ্ছে যে, “আইনি অনুরোধের কারণে” অ্যাকাউন্টটি ব্লক করা হয়েছে।
এই দ্রুত উত্থান অনেককেই বিস্মিত করেছে। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ নেই যে এই আন্দোলন ভারতের বাস্তব রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে। যদিও সামাজিক মাধ্যমে তারা বড় রাজনৈতিক দলগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে, তবুও মোদীর বিজেপি এবং বিরোধী কংগ্রেসই এখনো দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি।
তবুও CJP-এর জনপ্রিয়তা থেমে নেই।
দলটির ওয়েবসাইটে দেখা যায় একটি ব্যঙ্গাত্মক লোগো—সানগ্লাস পরা একটি তেলাপোকা মাইকসহ পডিয়ামের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, আর নিচে লেখা ‘Cockroach Janta Party’। ওয়েবসাইটে সদস্য হওয়ার জন্য একটি গুগল ফর্মও রয়েছে।
তরুণদের হতাশা থেকে নতুন রাজনৈতিক ভাষা
সমর্থকদের কাছে CJP মানে এক ধরনের “মুক্ত বাতাস”, যেখানে তারা মনে করেন বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত এবং ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণু। এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন বিরোধী রাজনীতিবিদ মহুয়া মৈত্র, কীর্তি আজাদ এবং সিনিয়র আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ।
অন্যদিকে সমালোচকেরা এটিকে অনলাইনে তৈরি একটি রাজনৈতিক নাটক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি বিরোধী শিবির-ঘনিষ্ঠ একটি সুপরিকল্পিত ডিজিটাল প্রকল্প, স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন নয়।
তবে এর পেছনে আরও গভীর একটি বাস্তবতা রয়েছে—ভারতের তরুণ সমাজের মধ্যে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক ক্লান্তি বা ‘ফ্যাটিগ’। অনলাইনে তারা রাজনীতি দেখছে প্রতিনিয়ত, কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিফলন খুব কমই খুঁজে পাচ্ছে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনসংখ্যার দেশ। প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ৩০ বছরের নিচে। কিন্তু রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। একটি জরিপে দেখা গেছে, ২৯% তরুণ সম্পূর্ণভাবে রাজনীতি এড়িয়ে চলে এবং মাত্র ১১% কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য।
অভিজিৎ দিপকে বলেন, ‘মানুষ হতাশ, কারণ তারা মনে করে কেউ তাদের কথা শুনছে না বা তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে না।’
দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে তরুণদের নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশে বড় আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে—শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং বাংলাদেশে চাকরি, মূল্যস্ফীতি ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই এসব আন্দোলন গড়ে উঠেছে।
ভারত এখনো সেই ধরনের বড় পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়নি, তবে ভেতরের চাপ ও অসন্তোষ অনেকটাই একই ধরনের।
দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি সত্ত্বেও চাকরি, বৈষম্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয় তরুণদের উদ্বেগ কমাতে পারেনি। শিক্ষাও এখন আর স্থায়ী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না, আর সামাজিক উন্নতির স্বপ্নও অনেকের কাছে ভঙ্গুর হয়ে উঠছে।
অভিজিৎ দিপকে অবশ্য ভারতের পরিস্থিতিকে নেপাল বা শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করতে রাজি নন। তবে তিনি স্বীকার করেন, তরুণদের হতাশা বাস্তব এবং তারা এখন এটি অনলাইনের ভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করছে।
তিনি বলেন, ‘জেন-জি প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারিয়েছে এবং তারা নিজেদের ভাষায় নিজস্ব রাজনৈতিক ফ্রন্ট তৈরি করতে চায়।’
ব্যঙ্গ, মিম আর ক্ষোভের মিশেলে নতুন বাস্তবতা
CJP-এর ওয়েবসাইটেও এই মনোভাব স্পষ্ট—এটি কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ইশতেহারের মতো নয়, বরং ইন্টারনেট সংস্কৃতির আদলে তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম।
নিজেদের তারা বর্ণনা করেছে “অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর” হিসেবে। তারা দাবি করেছে, তাদের “কোনো স্পনসর নেই” এবং তারা “একটি জেদি ঝাঁক”, যারা “সবকিছু ঠিক আছে বলে ভান করতে করতে ক্লান্ত” মানুষের জন্য জায়গা তৈরি করছে।
সেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে অগোছালো ডিজাইন, ব্যঙ্গাত্মক ফর্ম এবং ইন্টারনেটভিত্তিক ভিজ্যুয়াল ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যা কোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে একটি অনলাইন কৌতুকের মতো বেশি মনে হয়।
তবুও এই হাস্যরসের আড়ালে কিছু বাস্তব রাজনৈতিক দাবি রয়েছে—জবাবদিহিতা, গণমাধ্যম সংস্কার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। এগুলো আবার মিশে আছে বেকারত্ব, স্ক্রলিং সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক ক্লান্তি নিয়ে আত্ম-উপহাসের সঙ্গে।
এই ব্যঙ্গ ও আন্তরিকতার মিশ্রণই আন্দোলনের মূল আকর্ষণ। কারণ এর পেছনের হতাশা খুবই পরিচিত—চাকরি, অসমতা, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা।
অনেকে মনে করেন, তেলাপোকা প্রতীকটি নিজেই অর্থবহ। এটি কোনো বীরত্বপূর্ণ প্রাণী নয়, বরং এমন এক সত্তা যা কঠিন পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে পারে—কম প্রত্যাশায়, কিন্তু উচ্চ সহনশীলতায়।
রাজনীতি ও ব্যঙ্গের এই মিশ্রণ নতুন নয়। ইতালিতে বেপ্পে গ্রিল্লোর আন্দোলন, ইউক্রেনে ভলোদিমির জেলেনস্কির রাজনীতিতে আগমন, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুগ—সবই রাজনীতি ও ব্যঙ্গের সীমারেখাকে অস্পষ্ট করে দিয়েছে।
ভারতের এই সংস্করণ মূলত অনলাইনভিত্তিক—মিম, হ্যাশট্যাগ এবং ডিজিটাল হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া একটি পোকা-নির্ভর রাজনৈতিক ব্যঙ্গ আন্দোলন।
প্রথমে অদ্ভুত মনে হলেও, ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি একেবারে অচেনা নয়। এখানে রাজনীতিতে নাটকীয়তা, ভাইরাল প্রচারণা এবং প্রতীকী প্রদর্শন বহুদিন ধরেই অংশ।
এই প্রেক্ষাপটে তেলাপোকা-ভিত্তিক রাজনৈতিক আন্দোলন খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।
এটি মূলত দেখিয়ে দেয় কেন এটি এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে—তরুণরা হয়তো নতুন রাজনৈতিক দল চায় না, বরং তারা নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশের জন্য একটি নতুন ভাষা খুঁজছে।
অভিজিৎ দিপকে বলেন, ‘আমি মনে করি CJP কেবল শুরু। তরুণরা বর্তমান ব্যবস্থায় ক্লান্ত, সামনে আরও এমন আন্দোলন আসবে।’
তবে সমালোচকেরা বলছেন, এই আন্দোলন যত দ্রুত এসেছে, তত দ্রুতই মিলিয়ে যাবে।
তবুও CJP ইতিমধ্যেই ভারতের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রেখে গেছে—অন্তত কিছু তরুণের মনে এখনো কেউ তাদের দেখছে বা শুনছে বলে অনুভব করাচ্ছে।
আগে রাজনৈতিক ক্ষোভ থেকে তৈরি হতো ইশতেহার, আর ২০২৬ সালে সেই ক্ষোভ অনেক সময় জন্ম দিচ্ছে তেলাপোকা-থিমযুক্ত মিম পার্টির।
সূত্রঃ বিবিসি