ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স © সংগৃহীত
ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক আলোচনায় অংশ নিতে শনিবার সকালে একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে পাকিস্তানে পৌঁছাছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ উদ্যোগে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধের দুই সপ্তাহের বিরতির মাঝেই এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালানোর মাধ্যমে এই সংঘাতের সূচনা করেছিল। এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলে এই সংঘাত সাময়িকভাবে থেমে যায়।
এদিন নূর খান বিমানঘাঁটিতে পৌঁছালে ভ্যান্সকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এবং চিফ অফ আর্মি স্টাফ ও চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।
লেবাননে ইসরায়েলি হামলা নিয়ে শেষ মুহূর্তের এক জটিলতা দূর হওয়ার পর শনিবার ভোরেই ইরানি প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছায়। লেবাননে হামলা বন্ধ না হলে আলোচনায় যোগ দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল তেহরান। পাকিস্তান অবশ্য জানিয়েছে, এই বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ভ্যান্সের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিনিধিদলে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ, পররাষ্ট্র দপ্তর এবং প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারাও ভ্যান্সের সঙ্গে রয়েছেন। এর আগে শনিবার ভোরেই নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও যোগাযোগ দলের সদস্যরা ইসলামাবাদে পৌঁছান।
ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সুপ্রিম ন্যাশনাল ডিফেন্স কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলি আকবর আহমাদিয়ান এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুল নাসের হেমাতিও এই প্রতিনিধিদলে রয়েছেন।
১৯৭৯ সালের পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এটিই হবে প্রথম সরাসরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক।
তবে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ না হলে আলোচনায় যোগ দেবে না বলে ইরানের অনড় অবস্থানের কারণে বৈঠকটি প্রায় ভণ্ডুল হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
গালিবাফ শুক্রবার সন্ধ্যায় স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তেহরানের অংশগ্রহণের দুটি শর্ত রয়েছে—লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং বিদেশে জব্দ করা ইরানের প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্তি। তিনি বলেন, “আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই এই পদক্ষেপগুলো অবশ্যই পূরণ করতে হবে।”
একজন ইরানি কর্মকর্তা 'ডন' পত্রিকাকে বলেছেন, “আলোচনায় আমরা একটি রেড লাইন বা সীমারেখা তৈরি করে বৈরুত ও দাহিয়েহ-তে হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করেছি। এছাড়া এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছি যে, ইসরায়েল যদি আবারও এই সীমা অতিক্রম করে, তবে আলোচনা বন্ধ হয়ে যাবে।”
বিরোধের বিষয়গুলো
ইরানের অবস্থান হলো, যেকোনো যুদ্ধবিরতি অবশ্যই হিজবুল্লাহসহ সব ফ্রন্টে কার্যকর হতে হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল লেবাননে হামলাকে এই যুদ্ধবিরতির আওতার বাইরে বলে গণ্য করছে, যদিও প্রাথমিকভাবে একটা সমঝোতা ছিল যে লেবাননও এই যুদ্ধবিরতির অংশ হবে।
ওয়াশিংটন থেকে রওনা হওয়ার আগে ভ্যান্স আসন্ন আলোচনাকে “ইতিবাচক” হতে পারে বলে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র সদিচ্ছার সাথে আলোচনা করতে প্রস্তুত, তবে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে ওয়াশিংটন কোনো ধরনের গড়িমসি করার কৌশল বরদাশত করবে না।
তবে ট্রাম্প আরও কঠোর সুর ধরেন। তিনি হুশিয়ারি দেন যে ইরানের কাছে বেশি “কার্ড” বা সুযোগ অবশিষ্ট নেই এবং আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক পদক্ষেপ আবারও শুরু হতে পারে। তিনি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে ইরানের অব্যাহত বিধিনিষেধের সমালোচনাও করেন, যা এই দ্বন্দ্বে ইরানের একটি বড় কৌশলগত হাতিয়ার।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, পাকিস্তান এই আলোচনার সাফল্যের জন্য “সর্বোচ্চ চেষ্টা” করবে। তিনি এই আলোচনাকে “আলোচনার মাধ্যমে বিতর্কিত বিষয়গুলো সমাধানের” একটি সুযোগ হিসেবে অভিহিত করেছেন, তবে সামনের কাজটির জটিলতাও স্বীকার করেছেন।
আলোচনার এজেন্ডা বা আলোচ্য সূচিতেও সেই জটিলতার প্রতিফলন রয়েছে। যদিও ইরানের ১০ দফার প্রস্তাবকে ওয়াশিংটন একটি সাধারণ কাঠামো হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারপরও দুই পক্ষের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ, যেমন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা এবং সম্ভবত পারমাণবিক উপাদান সরিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ইরান দাবি করছে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তাদের পারমাণবিক অধিকারের স্বীকৃতি, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের একটি কাঠামো তৈরি এবং জব্দ করা সম্পদ ফেরত পাওয়া।
এছাড়া আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা এবং ছাড় দেওয়ার পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা নিয়ে আরও অনেক বিরোধের বিষয় রয়েছে।
কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিষয়গুলোর ব্যাপকতার কারণে প্রথম দুই দিনের আলোচনার মধ্যেই কোনো বড় ধরনের সমাধান আসার সম্ভাবনা কম। বড়জোর, প্রথম রাউন্ডের এই বৈঠক পরবর্তী আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে পারে অথবা তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কমানোর ব্যবস্থা নিয়ে সীমিত সমঝোতা হতে পারে।
ইসলামাবাদে প্রতিনিধিদলগুলোর আগমন একটি বিরল কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু লেবাননে চলমান সহিংসতা, উপসাগরীয় জাহাজ চলাচল রুটে অব্যাহত ব্যাঘাত এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গভীর অবিশ্বাসের কারণে এই প্রক্রিয়াটি প্রবল চাপের মুখে রয়েছে।