এপস্টেইন ফাইলস কী, কেন এটা নিয়ে আলোচনা, কী কী তথ্য ফাঁস হয়েছে এটায়?

০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:০৫ AM , আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:০৫ AM
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি © টিডিসি ফটো

সম্প্রতি ‘এপস্টেইন ফাইলস’ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। সামাজিকমাধ্যম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এই নথি। কী সেই নথি; যা সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। যেটিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম, ফ্রান্সের রাজপরিবার, বিশ্বের শীর্ষ ধনী বিল গেটসসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস হয়েছে। কীভাবে ফাঁস হয়ে এই নথি সে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরা হলো দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের এই প্রতিবেদনে।

ক্ষমতা, অর্থ আর প্রভাব— এই তিনের ছায়ায় বছরের পর বছর গড়ে উঠেছিল এক অদৃশ্য নেটওয়ার্ক। তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জেফ্রি এপস্টেইন। তিনি ছিলেন একজন দণ্ডিত যৌন পাচারকারী, যার ব্যক্তিগত যোগাযোগের পরিধি ছড়িয়ে ছিল বিশ্ব রাজনীতির শীর্ষ স্তর থেকে করপোরেট ক্ষমতার অলিন্দ পর্যন্ত। ‘এপস্টেইন ফাইলস’ প্রকাশের পর সেই গোপন নেটওয়ার্কের পর্দা একে একে সরে যেতে শুরু করেছে। আদালতের নথি, ফ্লাইট লগ, ই-মেইল ও ভিকটিমদের সাক্ষ্য মিলিয়ে উন্মোচিত হচ্ছে এমন সব নাম, যাদের উপস্থিতি এতদিন ছিল গুঞ্জন আর সন্দেহের স্তরে। এই ফাইলগুলো শুধু একজন অপরাধীর কাহিনি নয়; এটি আধুনিক বিশ্বে ক্ষমতা কীভাবে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে উঠে যায়—তার এক ভয়ংকর দলিল।

‘এপস্টেইন ফাইলস’ নামে পরিচিত এই নথিগুলোতে রাজনীতি, ব্যাবসা ও বিনোদন জগতের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ও যোগাযোগের তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে মার্কিন প্রশাসনের বিচার বিভাগ (DOJ) ডিসেম্বর ২০২৫‑এর প্রথম ব্যাচের পর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আরও বড় অংশ প্রকাশ হয়। প্রকাশিত নথির পরিমাণ বিশাল।

এপস্টেইন মামলা: ফ্লোরিডা থেকে নিউ ইয়র্ক—এক দশকের আইনি লড়াই ও বিতর্ক
জেফরি এপস্টেইন ১৯৫৩ সালে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯০-এর দশকে হেজ ফান্ড পরিচালকের দায়িত্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি পান। ধনী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং বিতর্কিত জীবনধারা তাকে দ্রুত জনসাধারণের নজরে আনে।

যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত এ যৌন পাচারকারী জেফ্রি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৫ সালে ফ্লোরিডায়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এই মামলাটি একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, গোপন সমঝোতা ও বিচারিক ব্যর্থতার উদাহরণ হয়ে ওঠে।

২০০৫ সালের মার্চে ফ্লোরিডার পাম বিচে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর বাবা-মা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, অর্থের বিনিময়ে “ম্যাসাজ”-এর আড়ালে জেফ্রি এপস্টেইন তাদের মেয়েকে যৌন নির্যাতন করেছেন। তদন্তে পুলিশ আরও বহু নাবালিকা ভুক্তভোগীর সন্ধান পায়।

২০০৬ সালের মে মাসে পাম বিচ পুলিশ একাধিক নাবালিকাকে যৌন হয়রানির অভিযোগে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে। তবে স্টেট অ্যাটর্নি ব্যারি ক্রিশার সরাসরি অভিযোগ গঠন না করে বিষয়টি গ্র্যান্ড জুরির কাছে পাঠান। জুলাইয়ে গ্র্যান্ড জুরি মাত্র একটি তুলনামূলক হালকা অভিযোগ গঠন করে। যা পরবর্তীতে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

২০০৭ সালে ফেডারেল প্রসিকিউটররা প্রায় ৬০টি গুরুতর ফেডারেল অপরাধের খসড়া তৈরি করলেও এপস্টেইনের আইনজীবীরা তৎকালীন মার্কিন অ্যাটর্নি আলেকজান্ডার একোস্তার সঙ্গে গোপন আলোচনায় বসেন। এর ফল হিসেবে একটি বিতর্কিত non-prosecution agreement (NPA) হয়, যেখানে শর্ত ছিল—এপস্টেইন রাজ্য আদালতে হালকা অভিযোগে দোষ স্বীকার করলে ফেডারেল মামলা হবে না।

৩০ জুন ২০০৮ সালে এপস্টেইন দুটি অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন এবং ১৮ মাসের কারাদণ্ড পান। তবে ‘ওয়ার্ক রিলিজ’ সুবিধায় তিনি দিনে বাইরে কাজ করার সুযোগ পান। বাস্তবে মাত্র প্রায় ১৩ মাস কারাভোগের পর ২২ জুলাই ২০০৯ সালে তিনি মুক্তি পান। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে আদালতের আদেশে গোপন এনপিএ (NPA) প্রকাশ পেলে বিষয়টি জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়।

এর পরবর্তীতে ২০০৮ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে একাধিক ভুক্তভোগী Crime Victims’ Rights Act (CVRA) লঙ্ঘনের অভিযোগে মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ভিক্টোরিয়া জিউফ্রেসহ আরও কয়েকজন এপস্টেইন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করেন। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক ফেডারেল বিচারক CVRA লঙ্ঘনের কথা স্বীকার করলেও NPA বাতিল হয়নি।

৬ জুলাই ২০১৯ সালে নিউ জার্সিতে এপস্টেইন গ্রেপ্তার হন। নিউ ইয়র্ক ফেডারেল কোর্টে তার বিরুদ্ধে নাবালিকা যৌন পাচার ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন, তবে ১৮ জুলাই জামিন নাকচ হয়।

এরপর ১০ আগস্ট ২০১৯ সালে নিউ ইয়র্কের কারাগারে এপস্টেইনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। মেডিকেল এক্সামিনার এটিকে আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুর ফলে নিউ ইয়র্ক ফেডারেল মামলার বিচার কখনো শুরুই হয়নি। ফলে ফ্লোরিডায় ২০০৮–২০০৯ সালের দোষ স্বীকারই এপস্টেইনের জীবদ্দশায় একমাত্র সম্পূর্ণ হওয়া ফৌজদারি বিচার হিসেবে থেকে যায়—যা আজও যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়।

বিশ্বের প্রভাবশালীদের গোপন যোগাযোগ উন্মোচিত
মার্কিন বিচার বিভাগ এখন পর্যন্ত ৩ দশমিক ৫ মিলিয়নের বেশি পৃষ্ঠার পিডিএফ দলিল, প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি, দুই হাজারের বেশি ভিডিও, ই-মেইল, ফ্লাইট লগ, এপস্টেইনের ‘ব্ল্যাক বুক’ কন্টাক্ট লিস্ট এবং ভিকটিমদের ডিপোজিশন প্রকাশ করে। এসব নথিতে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপ ‘লিটল সেন্ট জেমস’-এ কারা যাতায়াত করেছেন এবং কার সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল—তার বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে। তবে বিচার বিভাগ স্পষ্ট করেছে, নথিতে নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত—এমন নয়; এগুলো মূলত যোগাযোগ, সাক্ষ্য ও অভিযোগের তথ্য।

এপস্টেইন ফাইলসে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম এসেছে। এর মধ্যে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প—যার নাম বহুবার উল্লেখ হয়েছে এবং কিছু ছবিও নথিতে রয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ক্ষেত্রে দ্বীপ সফরের তথ্য আলোচিত হয়েছে। বিল গেটসের নাম এসেছে রুশ নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক ও যৌনরোগ সংক্রান্ত অভিযোগের প্রেক্ষাপটে, যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এছাড়া ইলন মাস্কের ক্ষেত্রে দ্বীপ সফর সংক্রান্ত ই-মেইলের উল্লেখ, রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র, ল্যারি সামার্স এবং স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে যোগাযোগের টেক্সটও নথিতে রয়েছে।

ইউরোপীয় অংশে সবচেয়ে আলোচিত নাম ব্রিটেনের প্রিন্স অ্যান্ড্রু। লিটল সেন্ট জেমসে যাতায়াত এবং যৌন নির্যাতনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। তবে পরে সমঝোতার মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি হয়। এছাড়া যুক্তরাজ্যের পিটার ম্যান্ডেলসন, ব্যবসায়ী রিচার্ড ব্র্যানসন এবং গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সার্জে ব্রিনের নামও যোগাযোগসূত্রে এসেছে।

ভারতীয় উপমহাদেশে সবচেয়ে বিতর্কিত নাম নরেন্দ্র মোদি। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতে মোদি এপস্টেইনের কাছে পরামর্শ নিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। একটি ইমেইলে এপস্টেইন নিজেই এ দাবি করেন।

ইমেইলে এপস্টেইন উল্লেখ করেন, তিনি মোদিকে ইসরায়েল সফরের পরামর্শ দেন এবং বলেন—এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সন্তুষ্ট হবেন। ওই পরামর্শ অনুযায়ী ২০১৭ সালে মোদি ইসরায়েল সফর করেন। সেখানে গিয়ে মোদি নাচ-গান করেন বলেও ইমেইলে দাবি করা হয়েছে।

যদিও এপস্টেইন ফাইলের এসব তথ্য সরাসরি অস্বীকার করেছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ২০১৭ সালের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রীর ইসরায়েল সফরের তথ্য ছাড়া ইমেইলে উল্লেখ করা বাকি সব বক্তব্যই একজন দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর ভিত্তিহীন ও কুৎসিত কল্পনা। এসব দাবি চরম অবজ্ঞার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করা উচিত বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া উডি অ্যালেন, নোম চমস্কি ও মডেল নওমি ক্যাম্পবেলের নামও এপস্টেইনের সামাজিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে আলোচিত হয়েছে।

এই নথি প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্লোভাকিয়ার একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিক পদত্যাগ করেছেন, ইউরোপের অন্যান্য দেশেও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংস্থাগুলো দাবি করছে, প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত। জেফ্রি এপস্টেইন ২০১৯ সালে কারাগারে আত্মহত্যা করলেও তার আর্থিক ও প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক নিয়ে তদন্ত এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। এপস্টেইন ফাইলস প্রকাশের ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ভবন দখলের হুমকির পর জাবি ছাত্রদল নেতা সেলিম রেজা বহিষ্কার
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
ঢাবি ভিসির জাপান-কোরিয়া সফরে যত অর্জন
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
মার্কিন শেয়ারবাজার থেকে ১ দিনেই উধাও ৩.২ ট্রিলিয়ন ডলার
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
চালুর পর বছর না ঘুরতেই প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণের উদ্যোগ
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
তত্ত্বাবধায়ক মানতে হয়েছে, সংস্কারও মানতে বাধ্য হবে— বিএনপিক…
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
অধ্যক্ষকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ২ দফা দাবি দিল অ্যাপ্লাইড হিউম…
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950