আপনিও কি ‘জোনাকির আলো’ দেখা শেষ প্রজন্ম?

০৭ জুন ২০২৬, ০৭:২০ PM , আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬, ০৭:৪১ PM
জোনাকি পোকা

জোনাকি পোকা © টিডিসি সম্পাদিত

বাড়ির পেছনে ডোবা পুকুর। পুকুরের পাশেই বাঁশঝাড়। রাতের বেলা। ঝিঁঝিপোকার ডাক ভেসে আসছে কানে। বাঁশঝাড় আর অসংখ্য গাছ-গাছালির ফাঁকের অন্ধকারে দেখা মিলত অসংখ্য আলো। ঝলমলে ক্ষুদ্র আলোগুলো ভেসে বেড়াত অন্ধকারে, যেন নিভতে চাইত না আগুনের ফুলকিগুলো— এভাবেই শৈশবের রাতগুলোকে মনে করে কথাগুলো বলছিলেন মানিকগঞ্জের বাসিন্দা ৬৮ বছর বয়সী রোকেয়া বেগম।

রোকেয়া বেগম বলেন, ‘এগুলো ছিল জোনাকি পোকা। আমরা শৈশবে রাতের বেলা দৌড়ে ধরার প্রতিযোগিতা করতাম। কেউ কেউ আবার কাচের কৌটায় ভরত। পুরো কাচের কৌটা জ্বলজ্বল করত। অথচ আমার নাতি-নাতনিরা এখনো জোনাকি পোকা দেখেনি। জোনাকি দেখাই এখন তাদের জন্য বিরল অভিজ্ঞতা।’

বিলুপ্তির পথে জোনাকি
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় রাতের বেলার একসময় খুব সাধারণ দৃশ্য ছিল জোনাকি। এখন সেটিই হয়ে উঠছে বিস্ময়ের বিষয়। ঢাকায় জোনাকি প্রায় হারিয়েই গেছে। সিলেটের চা-বাগানগুলোতেও, যেখানে ঘন বৃক্ষচ্ছায়া একসময় তাদের আশ্রয় দিত, সংখ্যা কমছে দ্রুত। এমনকি সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলেও স্থানীয়রা বলছেন, প্রতি বছরই জোনাকির উপস্থিতি কমে যাচ্ছে। এটি শুধু মুখের কথা নয়, গবেষণার তথ্যও বলছে একই কথা। 

২০২১ সালে ‘সাইন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে গত দুই দশকে জোনাকির সংখ্যা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ‘ফায়ারফ্লাইয়ার্স ইন্টান্যাশনাল নেটওয়ার্ক’ এবং ‘আইইউসিএন ফায়ারফ্লাই স্পেশিয়ালিস্ট গ্রুপ’ এর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩৫ শতাংশ জোনাকি প্রজাতি বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

অবাধ রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক প্রয়োগ বন্ধ করা গেলে এই প্রাণীগুলোকে অন্তত আংশিকভাবে রক্ষা করা সম্ভব- অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার, প্রানিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্বে পরিচিত জোনাকি প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ২,৬০০। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ১৫০টিরও কম প্রজাতির সংরক্ষণ অবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। মূল্যায়িত প্রজাতিগুলোর প্রায় পাঁচটির মধ্যে একটি ইতোমধ্যেই হুমকির মুখে।
বাংলাদেশে জোনাকির কোনো জাতীয় জরিপ নেই। আর কোনো জরিপ বা তথ্য না থাকাও এক ধরনের উত্তর।

জোনাকি সংরক্ষণ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রানিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘অবাধ রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক প্রয়োগ বন্ধ করা গেলে এই প্রাণীগুলোকে অন্তত আংশিকভাবে রক্ষা করা সম্ভব।”

জোনাকি আসলে কী?
জোনাকির গুরুত্ব বুঝতে হলে প্রথমেই জানতে হবে, তারা আসলে কী। নামের সঙ্গে ‘মাছি’ বা ‘ফ্লাই’ শব্দ থাকলেও জোনাকি কোনো মাছি নয়; তারা এক ধরনের গুবরে পোকা। এদের বৈজ্ঞানিক পরিবার Lampyridae। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশেই এদের বিস্তৃতি রয়েছে।

জোনাকিরা আর্দ্র পরিবেশ পছন্দ করে। বনভূমি, ধানক্ষেত, নদীতীর, জলাভূমি কিংবা পুকুরপাড় তাদের আদর্শ আবাসস্থল। বাংলাদেশে পাওয়া কিছু প্রজাতি উড়ন্ত অবস্থায় ইংরেজি ‘জে’ অক্ষরের মতো আলোর রেখা তৈরি করে। আবার কিছু প্রজাতি স্থিরভাবে জ্বলে, কেউ কেউ প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় আলোই উৎপন্ন করে না।

তাদের আলো তৈরি হয় ‘লুসিফেরিন’ নামের একটি রাসায়নিক এবং ‘লুসিফেরেজ’ নামের একটি এনজাইমের বিক্রিয়ায়। অক্সিজেন প্রবেশ করলে এই বিক্রিয়া প্রায় শতভাগ শক্তিকে আলোতে রূপান্তরিত করে, কিন্তু তাপ উৎপন্ন করে না বললেই চলে। এ কারণেই বিজ্ঞানীরা একে ‘কোল্ড লাইট’ বা শীতল আলো বলেন।

জোনাকি তাদের জীবনের অধিকাংশ সময় লার্ভা হিসেবে মাটি বা পানির নিচে কাটায়। এই সময় তারা শামুক, কেঁচো ও অন্যান্য নরমদেহী অমেরুদণ্ডী প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তাদের আয়ু মাত্র কয়েক সপ্তাহ। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সঙ্গী খুঁজে প্রজনন সম্পন্ন করতে হয়। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটিই নির্ভর করে অন্ধকারে একে অপরের আলোর সংকেত দেখতে পাওয়ার ওপর। অন্ধকার হারিয়ে গেলে তাদের প্রজনন ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে।

জোনাকির বিলুপ্তিতে বড় হুমকি চারটি

আলোক দূষণ
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে আলোকদূষিত শহরগুলোর একটি ঢাকা। সড়কবাতি, বিলবোর্ড, নির্মাণকাজের আলো এবং অসংখ্য বাড়ির আলোকচ্ছটা মিলিয়ে প্রকৃত অন্ধকার এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। জোনাকির জন্য এটি সরাসরি প্রজনন সংকট। পুরুষ জোনাকি নির্দিষ্ট আলোর সংকেত পাঠায়, আর স্ত্রী জোনাকি সাড়া দেয়। চারপাশের আলো বেশি হলে তারা একে অপরকে খুঁজেই পায় না। ফলে প্রজনন ব্যাহত হয় এবং নতুন প্রজন্ম জন্ম নেয় না।

ভারতের তামিলনাড়ুর আনামালাই টাইগার রিজার্ভে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, Abscondita perplexa প্রজাতির জোনাকি সামান্য কৃত্রিম আলো থাকলেও সেই এলাকা এড়িয়ে চলে। বিশেষ করে নীল ও সবুজ বর্ণালির আলো তাদের জন্য বেশি ক্ষতিকর।

আবাসস্থল ধ্বংস
জোনাকির লার্ভার জন্য প্রয়োজন আর্দ্র, অক্ষত মাটি, পাতা-পচা স্তর, জলাভূমির প্রান্ত এবং ছায়াযুক্ত নদীর তীর। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় গত কয়েক দশকে ব্যাপক নগরায়ণের ফলে হাজার হাজার হেক্টর জলাভূমি হারিয়ে গেছে। একইভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষি জমি বৃদ্ধির ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হয়েছে।

ভারতের অন্ধ্র প্রদেশে ১৯৯৬ সালে একটি এলাকায় প্রতি ১০ বর্গমিটারে ৫০০টির বেশি Abscondita chinensis জোনাকি পাওয়া গেলেও ২০১৯ সালে সেই সংখ্যা ২০ এর নিচে নেমে আসে। ধানক্ষেতের পরিবর্তন ও নদীর তীর পরিষ্কারের কারণে জোনাকির সংখ্যা কমে গেছে। 

কীটনাশক
বাংলাদেশে কৃষিজমিতে কীটনাশকের ব্যবহার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উচ্চমাত্রায় রয়েছে। অর্গানোফসফেট ও নিওনিকোটিনয়েড শ্রেণির কীটনাশক সরাসরি পোকামাকড়ের জন্য বিষাক্ত এবং দীর্ঘ সময় মাটি ও পানিতে থেকে যায়। 
জোনাকির লার্ভা মাটির অমেরুদণ্ডী প্রাণী খায়। ফলে তারা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে বিষাক্ত রাসায়নিক গ্রহণ করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, কীটনাশকযুক্ত এলাকায় লার্ভার বেঁচে থাকার হার এবং পূর্ণাঙ্গ জোনাকিতে রূপান্তরের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ঢাকাসহ শহরাঞ্চলে মশা নিধনের জন্য নিয়মিত ফগিংও জোনাকি ও তাদের খাদ্য উভয়ের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।

জলবায়ু পরিবর্তন
বাংলাদেশে জোনাকির জীবনচক্র বর্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। দীর্ঘ খরা মাটির আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়, ফলে জোনাকির লার্ভা ঠিকমতো বিকশিত হতে পারে না। আবার অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কখনও তাদের আবাসস্থল ডুবিয়ে দেয়।
তাপমাত্রার পরিবর্তন জোনাকির আলোর তীব্রতাও প্রভাবিত করে, ফলে প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় সংকেত আদান-প্রদান ব্যাহত হয়। গঙ্গা ও গোদাবরী অববাহিকায় পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, অনিয়মিত বর্ষা মৌসুমের পরবর্তী বছরে জোনাকির সংখ্যা এবং দৃশ্যমানতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

জোনাকি বাঁচাতে যা বলছে বিশেষজ্ঞরা
বিশেষজ্ঞদের মতে, জোনাকি সংরক্ষণে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অতীব জরুরি। বর্ষা মৌসুমে রাত ৯টার পর অপ্রয়োজনীয় বাইরের আলো বন্ধ রাখতে হবে। সাদা বা নীল আলোর পরিবর্তে উষ্ণ অ্যাম্বার রঙের আলো ব্যবহার করতে হবে। জলাভূমি, নদীর তীর ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণে বিদ্যমান আইন কার্যকর করা। সংবেদনশীল এলাকায় কীটনাশক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। নাগরিকদের অংশগ্রহণে জাতীয় পর্যায়ে জোনাকি জরিপ পরিচালনা করা এবং সংরক্ষিত বন ও গ্রামীণ অঞ্চলে ‘ডার্ক স্কাই’ বা অন্ধকার আকাশ অঞ্চল ঘোষণা করা।

শেরপুরে বালুর স্তূপে অটোরিকশার ধাক্কা, নিহত ২
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
মেসি ম্যাজিকে মুগ্ধ ট্রাম্প, ফকল্যান্ড ইস্যুতে আর্জেন্টিনাক…
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
জুলাই বিপ্লবকে বিতর্কিত করতে অপপ্রচার: কাবেরী গায়েনসহ দুই শ…
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
দেশের আরও এক নতুন পৌরসভা
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
ছাত্রলীগের দুই সাবেক নেতা এখন ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক, ব্যা…
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
লামিন ইয়ামালকে গোসল করানো সেই বিখ্যাত ছবি নিয়ে যা বললেন মেসি
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence