বিদেশি শিক্ষার্থী পেতে দূতাবাসে যোগাযোগ করছে রাবি প্রশাসন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়  © ফাইল ছবি

সন্তোষজনক সুযোগ-সুবিধা ও অনুকূল পরিবেশ না পাওয়ায় লেখাপড়া শেষ না করেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছাড়ছেন ভর্তি হওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীরা। স্নাতক পর্যায়ে ২০১৮ সালে ৮ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। সময়ের ব্যবধানে মাত্র একজন ছাড়া টিকতে পারেননি কেউ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে স্নাতক পর্যায়ে এ পর্যন্ত ৩৫ জন বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও এরই মধ্যে ঝরে পড়েছে ১৫ জনের বেশি। 

২০২০-২১ সেশনে একজন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও চলতি শিক্ষাবর্ষে (২০২১-২২) এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি শিক্ষার্থী টানতে ঢাকায় অবস্থিত ফিলিস্তিন দূতাবাসসহ কয়েকটি দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। চিঠি দিয়ে নানা সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হচ্ছে। যাতে তাদের দেশের শিক্ষার্থীরা আসেন।

সেশনজট, বাংলায় পাঠদান, ভাষাগত দক্ষতা যাচাই, কোর্স না করানো, আন্তর্জাতিক মানের পাঠ্যক্রমের অনুপস্থিতি, বই-নোটসহ বেশিরভাগ শিক্ষা উপকরণ বাংলায় থাকার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষকদের অসহযোগিতায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতি অনীহার মূল কারণ। বিদেশি শিক্ষার্থীদের আলাদা ডরমিটরি থাকলেও সেখানে নেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কমিটির সদস্যসচিব ও একাডেমিক শাখা-১-এর উপ-রেজিস্ট্রার এ.এইচ.এম. আসলাম হোসেন বলেন, আমরা বিভিন্ন অ্যাম্বাসিতে (দূতাবাস) যোগাযোগ করেছি। কথা বলেছি। তাদের শিক্ষার্থীদের কী কী সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে তা জানিয়ে মেইলও পাঠানো হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি কেটে গেছে। তাই আশা করছি, আগামী সেশনে বিদেশি শিক্ষার্থী উল্লেখ্যসংখ্যক পাওয়া যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমির শাখা সূত্রে জানা যায়, সর্বপ্রথম ২০১৪-১৫ সেশনে মাত্র দুইজন নেপালি শিক্ষার্থী ভর্তির মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর আগমন শুরু হয়। এর আগে কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন এমন তথ্য নেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হাতে। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৫-১৬ সেশনে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় তিনজনে। এরপর ২০১৭ সালে জর্দান, সোমালিয়া ও নেপাল থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। 

তারপর ২০১৮ সালে নেপালি ও জর্দান থেকে আটজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। তবে সময়ের ব্যবধানে মাত্র একজন ছাড়া টিকতে পারেননি কেউ। ২০১৯ সালের ৯ জানুয়ারি একসঙ্গে পাঁচজন নেপালি শিক্ষার্থী গোপনে দেশ ছাড়ার ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হয়ে বছর না পেরুতেই চলে যান জর্দানের শিক্ষার্থী রাদ ইব্রাহিম খলিল আবুশায়ুন।

এরপর ২০১৯-২০ সেশনে চারজন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও ২০২০-২১ সেশনে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির ধারাবাহিকতায় ভাটা পড়ে। সে বছর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ বিভাগের মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে অন্তরা হালদার নামে মাত্র একজন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০২২ সালে ভারত থেকে এক শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য আবেদন করলেও পরে তা বাতিল করেন। এর পরে আর কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি প্রাচ্যের ক্যামব্রিজ খ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ডরমিটরির বাসিন্দা এম.ফিল গবেষক আব্দুল মজিদ অন্তর বলেন, আমাদের ডরমিটরিটি শুধু নামে আন্তর্জাতিক, বাস্তবে এখানে আন্তর্জাতিক মানের কোনো উপাদানই নেই। নেই কোনো কম্পিউটার ল্যাব। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টারনেট সুবিধা পর্যন্ত নেই। নিজেদের খরচে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয়। বিষয়গুলো নিয়ে আমরা একাধিকবার ওয়ার্ডেনের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু সমাধান হয়নি।

জানতে চাইলে শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ূম ইন্টারন্যাশনাল ডরমিটরির ওয়ার্ডেন (তত্ত্বাবধায়ক) অধ্যাপক আতাউর রহমান রাজু বলেন, করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা বাইরের দেশে যাচ্ছে না। এ ছাড়া আমাদের এখানে বাংলা মিডিয়ামে পাঠদান কার্যক্রমের কারণে বাইরের শিক্ষার্থীরা সমস্যার সম্মুখীন হয়। তবে ডরমিটরির পরিবেশ পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মানের না হলেও আমরা চেষ্টা করছি ছাত্রদের সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা দিতে।

বিদেশি শিক্ষার্থী ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই তার সর্বজনীনতা ধরে রাখতে পারে না বলে মনে করেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকিব। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাটা আন্তর্জাতিক। এমন কি যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানীয় শিক্ষার্থীর চেয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বেশি। আমাদের বিদেশি শিক্ষার্থীর দরকার অনেক বেশি।

এ শিক্ষক আরও বলেন, যদি একটি দেশের বা এলাকার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়টি সর্বজনীন চেহারা ধারণ করতে পারে না। আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতের পাশাপাশি বিদেশি শিক্ষার্থীর অনুপাতও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সময় শিক্ষার্থীদের মান বিবেচনায় রাখার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের দেশ থেকে যেসব শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে যায়, তারা মোটামুটি সবাই-ই ক্লাসের ভালো শিক্ষার্থী। আমাদের বিদেশি শিক্ষার্থী দরকার কিন্তু ভর্তির সময় শিক্ষার্থীর মান বিবেচনা করার প্রয়োজন আছে।

উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে অধিকাংশই সোমালিয়ান। তারা বাংলা বুঝতে পারেন না। ইংরেজিতেও দুর্বল। আবার আমাদের শিক্ষকরাও বাংলায় ক্লাস লেকচার দেন। ফলে শিক্ষার্থীদের এখানে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া আমাদের ডরমিটরিতেও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। তবে আমরা এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছি।