প্রতিকী ছবি © সংগৃহীত
সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে শরীর ও মস্তিষ্ককে সতেজ রাখতে ঘুমের বিকল্প নেই। পর্যাপ্ত ঘুম শুধু বিশ্রামই দেয় না, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও পুনরুদ্ধারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ অনেকেই রাতে বিছানায় যাওয়ার পর দীর্ঘক্ষণ এপাশ-ওপাশ করেন, সহজে ঘুম আসে না। কখনো দুশ্চিন্তা, কখনো অনিয়মিত জীবনযাপন, আবার কখনো ঘুমানোর আগে মুঠোফোন ব্যবহারের অভ্যাস এর জন্য দায়ী হতে পারে।
ঘুমের সমস্যা দূর করতে ওষুধের পাশাপাশি প্রতিদিনের কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি। ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক চিকিৎসক ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. সৌরভ শেঠি গভীর ও আরামদায়ক ঘুমের জন্য আটটি অভ্যাসের কথা তুলে ধরেছেন।
১. নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও ঘুম থেকে ওঠা
শরীরের নিজস্ব একটি জৈবিক ছন্দ রয়েছে, যা সারকাডিয়ান রিদম নামে পরিচিত। এই ছন্দ অনুযায়ী শরীর ঘুম ও জাগরণের সময় নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুললে শরীরের এই ছন্দ বজায় থাকে। এতে ঘুমের স্বাভাবিক প্রবণতা তৈরি হয় এবং ঘুমের মান উন্নত হতে পারে।
২. ঘুমানোর আগে দুশ্চিন্তা কমানো
মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা ঘুমের অন্যতম বাধা। উদ্বেগের কারণে শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, যা মস্তিষ্ককে সজাগ রাখে। ফলে সহজে ঘুম আসে না। এ সমস্যা কমাতে ঘুমানোর আগে কিছুক্ষণ গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, ধ্যান কিংবা হালকা স্ট্রেচিং করা যেতে পারে। এসব অভ্যাস মনকে শান্ত করতে এবং ঘুমের প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করে।
৩. ঘুমানোর আগে ফোন বন্ধ রাখা
মুঠোফোন, ল্যাপটপ ও টেলিভিশনের পর্দা থেকে নির্গত নীল আলো ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে এটি মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। মেলাটোনিন শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে। তাই ঘুমানোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে এসব ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক।
৪. ঘুমের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা
শোবার ঘরে অতিরিক্ত আলো, শব্দ কিংবা অস্বস্তিকর তাপমাত্রা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই আরামদায়ক ঘুমের জন্য ঘর যথাসম্ভব অন্ধকার, শান্ত ও আরামদায়ক রাখা প্রয়োজন। ঘুমানোর জায়গাটি পরিচ্ছন্ন ও স্বস্তিদায়ক হলেও ঘুমের মান ভালো হতে পারে।
৫. সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা
কফি, চা ও অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে পারে। ক্যাফেইন মস্তিষ্কে অ্যাডিনোসিনের কার্যক্রম আটকে দেয়। অ্যাডিনোসিন এমন একটি রাসায়নিক, যা জেগে থাকার সময় শরীরে জমতে থাকে এবং ঘুমের চাপ তৈরি করতে সাহায্য করে। ফলে রাতে ক্যাফেইন গ্রহণ করলে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে। তাই ঘুমের কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই কফি ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলা ভালো।
৬. নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করা
নিয়মিত শরীরচর্চা ঘুমের মান উন্নত করতে সহায়তা করে। শারীরিক পরিশ্রমের ফলে শরীরে ঘুমের চাপ তৈরি হয়, যা রাতে সহজে ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করতে পারে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী ব্যায়াম না করাই ভালো। দিনের কোনো উপযুক্ত সময়ে হাঁটা, হালকা দৌড় কিংবা অন্যান্য শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
৭. রাতে হালকা খাবার খাওয়া
ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত ভারী খাবার খেলে হজমের সমস্যা, বুকজ্বালা কিংবা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। এতে ঘুমের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হয়। তাই রাতে পরিমিত খাবার খাওয়া এবং ঘুমানোর ঠিক আগে পেট ভরে খাবার না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
৮. শোবার ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখা
ঘুমের সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে আসে। এ প্রক্রিয়া ঘুমের প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই অতিরিক্ত গরম পরিবেশে ঘুমাতে গেলে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। শোবার ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক ও কিছুটা শীতল রাখা ভালো। চিকিৎসকের পরামর্শে ১৫ থেকে ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার কথা উল্লেখ করা হলেও আবহাওয়া ও ব্যক্তিভেদে আরামদায়ক তাপমাত্রা ভিন্ন হতে পারে।
ঘুমের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত অভ্যাস
গভীর ও আরামদায়ক ঘুমের জন্য শুধু দীর্ঘ সময় বিছানায় কাটানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও নিয়মিত ঘুমের রুটিন। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, মানসিক চাপ কমানো, ক্যাফেইন নিয়ন্ত্রণ এবং ঘুমের উপযোগী পরিবেশ তৈরির মতো অভ্যাস ঘুমের মান উন্নত করতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা চলতে থাকলে কিংবা প্রতিদিনের কাজে এর প্রভাব পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ অনিদ্রার পেছনে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক কারণ থাকতে পারে।