সুপার এল নিনোর প্রভাবে যেভাবে বদলে দিচ্ছে মহাসাগরের রঙ

২১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৯ AM
স্যাটেলাইট

স্যাটেলাইট © সংগৃহীত

শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’র প্রভাবে পৃথিবীর মহাসাগরগুলোর রঙে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। স্যাটেলাইটের তথ্য বলছে, প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় পানির স্বাভাবিক সবুজ আভা হারিয়ে যাচ্ছে। এর পরিবর্তে পানি ধারণ করছে আরও গাঢ় ও উজ্জ্বল নীল রং। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ফাইটোপ্লাংটন নামের অতি ক্ষুদ্র সামুদ্রিক উদ্ভিদের ব্যাপক হ্রাস। বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রের রঙের এই পরিবর্তন শুধু দৃশ্যমান কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল, বৈশ্বিক মৎস্যসম্পদ ও পৃথিবীর কার্বন শোষণ প্রক্রিয়ার জন্যও উদ্বেগের সংকেত।

ফাইটোপ্লাংটন হলো সমুদ্রের উপরিভাগে বসবাসকারী অতি ক্ষুদ্র ভাসমান সামুদ্রিক উদ্ভিদ। স্থলভাগের গাছপালার মতো এগুলোর মধ্যেও ক্লোরোফিল নামের সবুজ রঞ্জক পদার্থ থাকে। এই রঞ্জক সূর্যালোককে শক্তিতে রূপান্তর করতে সাহায্য করে। ফাইটোপ্লাংটনসমৃদ্ধ সামুদ্রিক অঞ্চল থেকে মহাকাশে সবুজ আলোর প্রতিফলন দেখা যায়। ফলে এসব এলাকার পানিতে একটি স্বতন্ত্র সবুজ আভা তৈরি হয়। কিন্তু ফাইটোপ্লাংটনের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেলে সেই সবুজ আভাও কমে যায়। তখন সমুদ্রের পানি তুলনামূলক স্বচ্ছ ও গাঢ় নীল দেখায়। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণে মহাসাগরের রঙের এই পরিবর্তনই বিজ্ঞানীদের নজরে এসেছে।

স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ, যা ট্রেড উইন্ড নামে পরিচিত, উষ্ণ উপরিভাগের পানিকে পশ্চিম দিকে এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে বিষুবরেখা বরাবর এবং দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের কাছে গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি উপরে উঠে আসে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় আপওয়েলিং। গভীর সমুদ্র থেকে উঠে আসা পুষ্টি উপাদানগুলো প্রাকৃতিক সারের মতো কাজ করে। এগুলো ফাইটোপ্লাংটনের বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ক্ষুদ্র এই সামুদ্রিক উদ্ভিদকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে সমুদ্রের বিশাল খাদ্যজগৎ। ছোট মাছ থেকে শুরু করে বিশাল তিমি পর্যন্ত বহু সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য সরবরাহের সঙ্গে ফাইটোপ্লাংটনের সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।

তবে শক্তিশালী এল নিনোর সময় এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। তখন বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে, এমনকি এর দিকও পরিবর্তিত হতে পারে। উষ্ণ পানি প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব দিকে ফিরে আসে এবং উপরিভাগে একটি উষ্ণ স্তর তৈরি করে। ফলে পুষ্টিসমৃদ্ধ ঠান্ডা পানি গভীরে আটকে থাকে। উপরিভাগে পুষ্টি উপাদানের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ফাইটোপ্লাংটনের বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হয়। ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের পর থেকে বর্তমান সময়েই সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো ইভেন্ট ঘটার ৮৩ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে।

২০২৬ সালের শুরুর দিকের স্যাটেলাইট চিত্রে প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে বিশাল উষ্ণ পানির ঢেউ পূর্ব দিকে প্রবাহিত হতে দেখা গেছে। কেলভিন ওয়েভ নামে পরিচিত এই তরঙ্গ দক্ষিণ আমেরিকার কাছাকাছি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ দশমিক ৩ ফুট পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির সমুদ্রপৃষ্ঠ মিশন প্রকল্পের বিজ্ঞানী জোশ উইলিস বলেন, ‘কেলভিন ওয়েভ বা তরঙ্গগুলো হলো এল নিনোর হৃৎস্পন্দনের মতো। আর আমাদের সমুদ্রপৃষ্ঠের উপগ্রহগুলো আমাদের মহাসাগরের গভীরে উঁকি দিয়ে প্রতিটি স্পন্দন দেখার সুযোগ করে দেয়।’

বর্তমান জলবায়ু ঘটনাটি নাসার উন্নত পেস উপগ্রহের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা প্রথম এল নিনো। ২০২৪ সালে সমুদ্রের রঙ রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণের জন্য এই উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা হয়। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের রঙের পরিবর্তন এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবেশগত প্রক্রিয়াগুলো আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন। 

নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের পেস দলের প্রধান গবেষণা বিজ্ঞানী ম্যাথিউ কেহরলি বলেন, ‘অনেকেই পানিকে কেবল নীল রঙের মনে করেন, কিন্তু সমুদ্রের জলের যে কত রঙের বৈচিত্র্য থাকতে পারে তা সত্যিই বিস্ময়কর। আপনার মনে হতে পারে কী ঘটবে তা আপনি জানেন, কিন্তু আপনি যে ডেটা নিয়ে কাজ করছেন তার ফলাফল রিয়েল টাইমে চাক্ষুষ করা অত্যন্ত সন্তোষজনক।’

বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে ফাইটোপ্লাংটনের পরিমাণ তীব্রভাবে কমে যাওয়ায় সমুদ্রের স্বাভাবিক সবুজ আভা হারিয়ে যাচ্ছে। পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিতে এসব ক্ষুদ্র সামুদ্রিক উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ায় বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পানি আরও গাঢ় নীল দেখাচ্ছে।

তবে বিজ্ঞানীদের মতে, গাঢ় নীল সমুদ্র দেখতে পরিষ্কার ও সুন্দর মনে হলেও এর পেছনের পরিবর্তন সামুদ্রিক জীবনের জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে। কারণ, ফাইটোপ্লাংটন হলো সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি। এদের সংখ্যা কমে গেলে খাদ্যের সংকট ধাপে ধাপে পুরো খাদ্যশৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে সামুদ্রিক প্রাণীর জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক মৎস্যসম্পদও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

ফাইটোপ্লাংটনের ভূমিকা শুধু সামুদ্রিক খাদ্য সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই অতি ক্ষুদ্র উদ্ভিদ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে সমুদ্রে এদের সংখ্যা কমে যাওয়ার অর্থ হলো, কার্বন শোষণের ক্ষেত্রে মহাসাগরের সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়া। এতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আরও বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস থেকে যেতে পারে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

নাসার উপগ্রহের মাধ্যমে মহাসাগরের এই পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিজ্ঞানী জোশ উইলিসের মতে, মহাসাগরের রঙ পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এল নিনো যখনই ঘটে, তখন এটি কমবেশি আমাদের প্রায় সবাইকে স্পর্শ করে। এর প্রভাব কী হতে পারে তা মানুষ দেখতে পেলেও, এর পেছনের কারণ বুঝতে আমরা মহাসাগরের দিকে তাকিয়ে থাকি।’

তালিকায় যুক্ত হলো আরও এক সরকারি ছুটি, প্রজ্ঞাপন জারি
  • ২১ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা-যশোর-বেনাপোল রুটের টিকিট পেতে দুর্ভোগ
  • ২১ অক্টোবর ২০২৬
ময়মনসিংহে আসামিকে ছিনিয়ে নিতে পুলিশের ওপর হামলা, আহত দুই
  • ২১ অক্টোবর ২০২৬
নাটোরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবার প্রতি ১ লাখ টাকা ‍ দিবে…
  • ২১ অক্টোবর ২০২৬
বাঁচা-মরার লড়াইয়ে সন্ধ্যায় আফগানিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামছে…
  • ২১ অক্টোবর ২০২৬
সুপার এল নিনোর প্রভাবে যেভাবে বদলে দিচ্ছে মহাসাগরের রঙ
  • ২১ অক্টোবর ২০২৬