ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংকের লোগো © সংগৃহীত
একযোগে দেশের ১১ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ায় উদ্বেগ জানিয়েছে ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় প্রচার টিম ও আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ড. মুহাম্মদ শামসুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১৪ মে একযোগে দেশের ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্বে থাকা উপাচার্যগণকে সরিয়ে দেয়ার ঘটনায় শিক্ষকসমাজ, শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। এই ঘটনায় ইউটিএলের আহবায়ক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. যুবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক এবং সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উচ্চশিক্ষা প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এ ধরনের বড় পরিবর্তন অবশ্যই সুস্পষ্ট নীতিগত ভিত্তি, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং যৌক্তিক ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
নেতৃবৃন্দ মনে করেন, একজন উপাচার্যকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক ও কাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়ে সাধারণত চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর সাধারণত তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ উন্নয়ন, গবেষণা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক সংস্কার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কিন্তু পূর্ণ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই, পূর্ব নোটিশ ও কোনো সুস্পষ্ট কারণ ব্যতিরেকে অব্যাহতি প্রদান একজন সম্মানিত শিক্ষকের প্রতি প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সৌজন্য ও মর্যাদাবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একইসঙ্গে এটি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রেও অনুকূল বার্তা বহন করে না।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- দেশের কঠিন ও সংকটপূর্ণ সময়ে দায়িত্ব পালনকারী এই উপাচার্যগণ নিজ নিজ যোগ্যতা, দক্ষতা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাদের অনেকেই প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আন্তর্জাতিক মান এবং গবেষণাগত সক্ষমতার জন্য সুপরিচিত ও স্বীকৃত। ইউটিএল মনে করে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে পরিবর্তন আনতে হলে তা অবশ্যই অধিকতর যোগ্যতা, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তবে সেই পরিবর্তন যাতে মতপার্থক্য বা রাজনৈতিক বিবেচনার ভিত্তিতে না হয়। উচ্চশিক্ষা খাতে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রশাসনিক পদগুলোকে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত বিবেচনার ঊর্ধ্বে রেখে পরিচালনা করা জরুরি।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন যে, ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকার পেছনে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা ও পক্ষপাতমূলক শিক্ষক নিয়োগ অন্যতম প্রধান কারণ।’ ইউটিএল মনে করে- এই বক্তব্য দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু একইসঙ্গে মেয়াদপূর্ণ না হওয়া উপাচার্যগণকে সরিয়ে দিয়ে নতুন নিয়োগ প্রদান উক্ত বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। কারণ, যদি উচ্চশিক্ষা খাতে রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে যোগ্যতাভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই লক্ষ্য হয়, তবে উপাচার্য নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষেত্রেও একই নীতি, স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গণহারে উপাচার্য পরিবর্তনের সংস্কৃতি উচ্চশিক্ষা প্রশাসনের ধারাবাহিকতা, নীতিগত স্থিরতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে। এ ধরনের চর্চা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা রাষ্ট্রের জ্ঞানভিত্তিক অগ্রযাত্রার জন্যও অনুকূল নয়। আমরা লক্ষ করেছি, ১২ মে তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উচ্চশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ বিষয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু এর মাত্র দুই দিন পর সুস্পস্ট কারণ ছাড়া দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য পরিবর্তনের মতো ঘটনা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল) মনে করে, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতি, অযোগ্যতা, অনিয়ম কিংবা ব্যর্থতার অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল্যায়ন হওয়া উচিত। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে নিয়োজিত শিক্ষকগণের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ও সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা রাষ্ট্র ও শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব। ইউটিএলের নেতৃবৃন্দ নব-নিযুক্ত উপাচার্যগণকে অভিনন্দন জানিয়ে আশা প্রকাশ করেন যে, সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে আরো যত্নশীল হবে এবং আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়াবে। ধন্যবাদ।