বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল © লোগো
শিগ্গিরই আসছে বিএনপির অন্যতম সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি। সেক্ষেত্রে যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে দেওয়া হতে পারে রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দীন নাছির নেতৃত্বাধীন বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি। রাকিব-নাছির কমিটি দুই বছরের মেয়াদ চলতি বছরের মার্চ মাসে শেষ হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব গঠন নিয়ে সংগঠনের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা তীব্র হয়েছে।
আগামী সোমবার (৩ আগস্ট) কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্রদলের আয়োজনে জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ছাত্র সমাবেশের কর্মসূচির পর যেকোনো সময় সংগঠনটির নতুন নেতৃত্বের ঘোষণা আসতে পারে বিএনপির হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে। ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির অনেক নেতারাও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের এই ছাত্র সমাবেশকে নিজেদের কমিটির বিদায়ী কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন। ছাত্র সমাবেশটিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, আগস্টের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকেই ঘোষণা আসতে পারে বিএনপির অন্যতম সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের নতুন কমিটির। কমিটি ভাঙার আলোচনা সামনে আসার পাশাপাশি নতুন কমিটি ঘিরে তোড়জোড় শুরু হওয়ায় ব্যস্ত সময় পার করছেন অনেকেই। একাধিক ছাত্রনেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে, রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দীন নাছির নেতৃত্বে থাকা অবস্থায় দুঃসময়ের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন, নিষ্ক্রিয়তা, ‘মাই ম্যান’ও অছাত্র এবং ছাত্রলীগের বেশ কিছু নেতাকর্মীকে কমিটিতে পদায়নসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত সংগঠনটি। এছাড়া, সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের অধিকাংশই ইতোমধ্যেই নিজেদের ছাত্রত্ব শেষ করেছেন। যার কারণে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থী যারা জেন-জি নামে পরিচিত সেই শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারছে না নেতারা। এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েই মাঠে যারা রয়েছে তাদের মধ্যে নেতৃত্বের যোগ্যতা সম্পন্নদের নেতৃত্ব আনছেন হাইকমান্ড।
জানা গেছে, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের আধিপত্য, দ্বন্দ্ব ও কমিটি বাণিজ্যের অভিযোগের কারণে বিএনপির হাইকমান্ড রীতিমতো ক্ষুব্ধ। নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ নেতৃত্ব চূড়ান্ত করতে বিএনপির উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়, ত্যাগী ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ এবং বিতর্কমুক্ত, সবশ্রেণির শিক্ষার্থীর কাছে গ্রহণেযোগ্য নিয়মিত শিক্ষার্থী নেতাদের অগ্রাধিকার দিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রদলের মতো বৃহৎ ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন পাওয়া না গেলে ব্যতিক্রম হিসেবে অপেক্ষাকৃত সিনিয়র ছাত্রনেতাদের মধ্য থেকেও আসতে পারে সংগঠনটির পরবর্তী নেতৃত্ব।
জুলাই বিপ্লবের পর থেকে বিএনপি সরকার গঠন পর্যন্ত ছাত্রদলে জায়গা পাননি বিগত ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত থাকা অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী। ফলে সংগঠনটি আলোচনা-সমালোচনার শিকার হচ্ছে। পাশাপাশি রাজপথের ছাত্রনেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন ও অবহেলার শিকার হয়েছে মূল্যায়নের অভাবে নেতাকর্মীদের হতাশায় স্থবির হয়ে পড়ছে পুরো সংগঠন। যার কারণে পরিবর্তন চাইছেন সবাই।
সূত্র জানায়, ছাত্রদলের পদ-প্রত্যাশী নেতারা বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তারা সিনিয়র নেতাদের (যেসব নেতা ছাত্রদলের কমিটি গঠনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম) দ্বারে দ্বারে ধরনা দিচ্ছেন। নিজেদের অতীতের সাংগঠনিক ভূমিকা ও দলের জন্য ত্যাগ ও বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলে জেল-জুলুম-নির্যাতনের কথা জানান দিচ্ছেন। এর বাইরে বর্তমান সরকার ঘোষিত জনগণের কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচিতে নিজেরা সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে আলোচনায় থাকার চেষ্টা করছেন। অনেকে যার যার ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ভূমিকা রাখা ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে তা প্রচারেও সচেষ্ট থাকছেন। যদিও ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব গঠনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং দলীয় নীতিনির্ধারণী মহলের বিবেচনার ওপর নির্ভর করছে।
এদিকে, ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন অনেকে। তাদের মধ্যে খোরশেদ আলম সোহেল, মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ, মোস্তাফিজুর রহমান (ভিপি), মমিনুল ইসলাম জিসান, এজাজুল কবির রুয়েল, ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত এবং শরীফ প্রধান শুভ অন্যতম। তবে জোরেসোরে আলোচনায় রয়েছেন মো. আমানউল্লাহ আমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে দুই মাস কারাগারে ছিলেন।
এছাড়া, সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক, তরিকুল ইসলাম তারিক, নাহিদুজ্জামান শিপন, নাছির উদ্দীন শাওন, মো. রাজু আহমেদ, গাজী মো. সাদ্দাম হোসেন, মোহাম্মদ আব্দুর রহিম রনি, তারেক হাসান মামুন, মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, মাহমুদ ইসলাম কাজল এবং দ্বীন ইসলাম খান অন্যতম।
ছাত্রদলের পদপ্রত্যাশী নেতারা বলছেন, নতুন কমিটিতে আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত এবং ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হলে সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে। তাদের মতে, নেতৃত্ব নির্বাচনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং দলের সিদ্ধান্তই সবাই মেনে নেবেন।
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আমানউল্লাহ আমান বলেন, দায়িত্ব পেলে প্রতিহিংসার রাজনীতি বাদ দিয়ে ছাত্রদের অধিকার রক্ষায় কাজ করব। ক্যাম্পাসগুলোতে মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণে একটি জবাবদিহিমূলক ছাত্ররাজনীতি গড়ে তুলব ইনশাআল্লাহ।
সহ-সভাপতি এজাজুল কবির রুয়েল বলেন, নতুন কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে এবং বর্তমান কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর যে কোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘সুপার টু’ কিংবা ‘সুপার ফাইভ’—যে কাঠামোই হোক, সেটি সম্পূর্ণভাবে হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান (ভিপি) বলেন, আমি দায়িত্ব পেলে ছাত্রদল হবে অন্যরকম সংগঠন। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় ও মেধাভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে সংগঠনকে একটি আধুনিক ও গতিশীল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করব।
সহ-সভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল বলেন, কমিটি গঠন একটি ধারাবাহিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা, সংগঠনের ভাবমূর্তি এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় যাদের যোগ্য মনে করা হবে, তাদেরই নেতৃত্বে আনা হবে। তিনি জানান, ছাত্রদলের নেতাদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা রয়েছে, তবে কোনো ধরনের বিভেদ বা প্রতিহিংসা নেই। সবাই সংগঠনের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচনের সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন।
সব মিলিয়ে, ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সূত্র বলছে, আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ এবং তৃণমূলে গ্রহণযোগ্য নেতাদের সমন্বয়ে নতুন নেতৃত্ব গঠন করা হলে সংগঠনের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ছাত্রদল নতুন উদ্যমে কাজ করতে পারবে।
তবে, ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের চূড়ান্ত অনুমোদনের মাধ্যমে। ফলে শেষ মুহূর্তে সমীকরণ বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব বিএনপির সাংগঠনিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে।
২০২৪ সালের ১ মার্চ মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে সাত সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে একই বছরের ১৫ জুন ৩৯ জন সহ-সভাপতি ও ১১১ জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ২৬০ সদস্যের আংশিক পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, যেকোনো সময় ছাত্রদলের নতুন কমিটি আসতে পারে, এটা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বর্তমান কমিটি তাদের নির্ধারিত মেয়াদ ইতোমধ্যেই শেষ করেছে। আমাদের দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী (যিনি ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক) তিনি দক্ষতা, ত্যাগ ও দলের প্রতি আনুগত্য রয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব ছাত্রদলে জায়গা দেবেন।