পিটিডি একাডেমির সাইনবোর্ড © টিডিসি
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কাশিমনগর গ্রামের উপকূলীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পিটিডি একাডেমি দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে অবৈতনিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও অবকাঠামোগত সংকট, সরকারি সহায়তার অভাব ও নানা সমস্যায় জর্জরিত। জরাজীর্ণ ভবন, বৃষ্টিতে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়া এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হলেও প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকরা।
বাংলাদেশের দক্ষিণের জেলা খুলনা। এই খুলনা জেলার দক্ষিণে পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি ইউনিয়নের কাশিমনগর গ্রামে পিটিডি একাডেমি অবস্থিত। পাইকগাছা, তালা, ডুমুরিয়া—এই তিন উপজেলার সীমান্তে পাইকগাছা উপজেলাধীন কাশিমনগর গ্রাম। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমর সৃষ্টি কপোতাক্ষ নদের অববাহিকায় অবস্থিত, স্নিগ্ধ সুন্দর গ্রামীণ পরিবেশে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৭ বছর প্রাথমিক স্তরে, মাধ্যমিক স্তরে, বিএম কলেজ সেকশনের অনুমোদন অপেক্ষমাণ পাঠদান করে যাচ্ছেন একজন অবৈতনিক অধ্যক্ষ মো. শিমুল বিল্লালসহ কিছু গুণী শিক্ষক।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, ১৯৮২ সালে কপিলমুনি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম এম এ মান্নান একুশে পদকপ্রাপ্ত একজন গুণী মানুষ। অত্র জনপদে একটি আধুনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য একটি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজ অর্থে কবলামুলে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা সচিবের নামের পক্ষে ডিসি মহোদয় খুলনা পক্ষে প্রতিষ্ঠান এর নামে জমি খরিদ করেন। প্রতিষ্ঠাতা জীবদ্দশায় অনেক প্রচেষ্টা করেছেন উপজেলার প্রথম টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান এবং একটি আধুনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য। কিন্তু ওনার দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা এবং মৃত্যুবরণের ফলে প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার কাজ থমকে যায়। ২০০৮ সালে আবার প্রতিষ্ঠাতার ছেলেরা এলাকার শিক্ষা অনুরাগী মানুষের প্রচেষ্টায় পিটিডি একাডেমি ও মাধ্যমিক শাখা ও কলেজ শাখার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেই থেকে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাতার ছেলে মো. শিমুল বিল্লাল প্রতিষ্ঠানের এই দায়িত্বভার নিজের কাঁধে তুলে নেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মো. শিমুল বিল্লাল ঢাকা কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার উপরে স্বল্পমেয়াদি ডিপ্লোমা করেছেন এবং আইনে লেখাপড়া করেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকে স্থায়ী প্রতিবেদকের চাকরি এস্তফা দিয়ে, গ্রামে ফিরে এসে প্রান্তিক পরিবারগুলো ঝরে পড়া শিশুদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি অবৈতনিক হিসেবে কাজ করছেন।
আরও পড়ুন: দেশে বিশ্ববিদ্যালয়-স্কুল-কলেজ তৈরি করতে হবে কর্মক্ষম জাতি তৈরির জন্য: শিক্ষামন্ত্রী
অধ্যক্ষ মো. শিমুল বিল্লালের কাছে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ। ইতিমধ্যে প্রায় সর্বমোট প্রাথমিক এবং এসএসসি পাস শিক্ষার্থীদের সংখ্যা এক হাজারের বেশি। এসএসসি পাস করে আমাদের অনেক ছাত্রছাত্রীরা সরকারি-বেসরকারি চাকরি করছেন। অনেক ছাত্ররা ইঞ্জিনিয়ারিং উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত আবার কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে, যা আমিসহ আমার সহকর্মীদের সার্থকতা। বর্তমানে পিটিডি একাডেমিতে শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করে। ছাত্রদের সরকারি বই পড়ানো হয়। সরকারি নিয়ম মেনে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। কিন্তু সরকার কোনো প্রকার টিফিন, বাচ্চাদের উপবৃত্তি, খেলার সামগ্রী কিছুই প্রদান করেন না।’
অধ্যক্ষ বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করবার সময় আমার মায়ের গলার হার এবং পৈতৃক সম্পত্তি বন্ধক রেখেই অবকাঠামো করেছিলাম। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে তা আজ জরাজীর্ণ। দরজা-জানলা, ভাঙা টিনের চাল নষ্ট হয়ে গেছে। ছাত্র-শিক্ষকদের মাথায় পানি পড়ে অল্প বৃষ্টিতেই প্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। নেই আধুনিক কোনো ভবন। প্রতিষ্ঠাতার কনিষ্ঠ ছেলে, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালযের সহকারী অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা কামাল মুকুল তার সাধ্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যক্তি বিশেষের পক্ষে স্কুল অ্যান্ড কলেজ একটি প্রতিষ্ঠানের সব চাহিদা পূরণ করা খুবই দুরুহ কাজ। তারপরও তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পাইকগাছা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সঞ্জয় দেবনাথ ডেইলি ক্যাম্পাসের প্রতিবেদককে জানান, পিডিটি একাডেমী সুনামের সঙ্গে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে শুধু তাদের বই সরবরাহ করা হয়ে থাকে। অন্য কোন সহযোগিতা তরফ থেকে করা হয় না। তবে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন, যেসব সমস্যার সমাধান হবে। অতি সম্প্রতি এসব প্রাইমারি শিক্ষকদের পরীক্ষা কক্ষের পরিদর্শক হিসেবে হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রতিষ্ঠানটির সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা করবে।