আশরিয়া ও স্বর্ণা © সংগৃহীত
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসের আলোঝলমলে প্রদর্শনীকেন্দ্রে যখন বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের নতুন নতুন উদ্ভাবন নিয়ে হাজির হবে, তখন সেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের তৈরি ছোট্ট একটি রোবট তুলে ধরার স্বপ্ন দেখছেন বাংলাদেশের তিন তরুণ। আশরিয়া, স্বর্ণা ও রাগিবের উদ্ভাবিত ‘Autonomous Explorer’ প্রকল্পটি বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি প্রদর্শনী কনজিউমার ইলেকট্রনিকস শো (CES) ২০২৭-এর একটি প্যাভিলিয়নে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য নির্বাচিত হয়েছে বলে জানিয়েছে উদ্ভাবক দল।
তিন তরুণের স্বপ্নটা একটু অন্য রকম। তারা এমন একটি রোবট তৈরি করতে চান, যা মানুষের জন্য বিপজ্জনক জায়গায় প্রবেশ করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবন, বিপজ্জনক খনি কিংবা দুর্ঘটনাকবলিত শিল্পকারখানায় যেখানে উদ্ধারকর্মীদের প্রবেশ করাই জীবনের ঝুঁকি, সেখানে মানুষের আগে এগিয়ে যাবে এই ছোট্ট রোবট।
ভাবুন, ভূমিকম্পে একটি বহুতল ভবন ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন কয়েকজন মানুষ। চারদিকে ভাঙা কংক্রিট, বিষাক্ত গ্যাস আর যেকোনো মুহূর্তে নতুন করে ধসে পড়ার আশঙ্কা। উদ্ধারকর্মীরা জানেন, ভেতরে জীবিত মানুষ থাকতে পারেন। কিন্তু কোথায় বিপদ, কোন পথে প্রবেশ করা নিরাপদ কিংবা ভেতরের পরিবেশ কেমন, তা বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই।
এমন পরিস্থিতিতে উদ্ধারকর্মীদের আগে যদি একটি ছোট রোবট ভেতরে প্রবেশ করে বিপদের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে? যদি বাইরে থেকেই জানা যায়, কোথায় ক্ষতিকর গ্যাস রয়েছে, কোথায় তাপমাত্রা অস্বাভাবিক কিংবা কোন পথ দিয়ে এগোনো তুলনামূলক নিরাপদ?
এই ভাবনা থেকেই ‘Autonomous Explorer’ নিয়ে কাজ শুরু করেন তিন তরুণ উদ্ভাবক।
এম আই এস টির শিক্ষার্থী আশরিয়া, স্বর্ণা ও রাগিবের এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য বিপজ্জনক পরিবেশে অনুসন্ধানের জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় রোবট তৈরি করা। আকারে ছোট হলেও এর পরিকল্পিত ব্যবহার বেশ বিস্তৃত। ক্ষতিকর গ্যাস শনাক্ত করা, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ এবং আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছেন তাঁরা।
ভবিষ্যতে রোবটটিতে ক্যামেরা ও শব্দ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব প্রযুক্তি সফলভাবে সংযোজন করা গেলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের অবস্থান খুঁজে পেতে উদ্ধারকর্মীদের সহায়তা করা সম্ভব হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে এমন প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা সহজেই বোঝা যায়। ভবনধস, অগ্নিকাণ্ড কিংবা শিল্প দুর্ঘটনায় উদ্ধারকর্মীদের প্রায়ই বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করতে হয়। উন্নত বিদেশি অনুসন্ধানী রোবট সংগ্রহের উচ্চমূল্যও অনেক ক্ষেত্রে বড় বাধা। সে জায়গায় তুলনামূলক কম খরচে দেশীয় প্রযুক্তি তৈরির চেষ্টা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আর এই উদ্ভাবন নিয়েই এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের কাজ তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন আশরিয়া, স্বর্ণা ও রাগিব।
সিইএসের অফিশিয়াল সূচি অনুযায়ী, আগামী ৬ থেকে ৯ জানুয়ারি ২০২৭ যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা অঙ্গরাজ্যের লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত হবে এবারের প্রদর্শনী। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকেরা নতুন প্রযুক্তি নিয়ে হাজির হন এই আয়োজনে। নতুন প্রযুক্তি দেখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনী ধারণা বিনিময়ের সুযোগও তৈরি হয় সেখানে।
সেই আন্তর্জাতিক আয়োজনেই নিজেদের রোবট তুলে ধরতে চান বাংলাদেশের এই তিন তরুণ।
তবে গবেষণাগারের ছোট্ট টেবিল থেকে লাস ভেগাসের প্রদর্শনীকেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছানোর পথটা সহজ নয়।
একটি উদ্ভাবনী ধারণাকে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর উপযোগী প্রযুক্তিতে পরিণত করতে প্রয়োজন কার্যকর প্রোটোটাইপ, মানসম্মত যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং ধারাবাহিক পরীক্ষা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের প্রদর্শনীর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের বিষয়গুলো।
আন্তর্জাতিক এই প্রদর্শনীকে সামনে রেখে রোবটটির প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, প্রোটোটাইপের কার্যকারিতা যাচাই এবং উপস্থাপনার প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছেন তিন তরুণ। তাদের এই উদ্যোগ দেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, করপোরেট সংস্থা ও উদ্ভাবনবান্ধব প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একটি সম্ভাবনাময় সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা ও অংশীদারত্বে প্রকল্পটির আরও উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তরুণদের হাতে প্রতিনিয়ত নানা উদ্ভাবনী ধারণা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু একটি ধারণাকে কার্যকর প্রযুক্তিতে রূপ দেওয়া, বাস্তব পরিবেশে পরীক্ষা করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপন করার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক গবেষণা, কারিগরি সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন। অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ এসব সীমাবদ্ধতার কারণে গবেষণাগারের গণ্ডি পেরোতে পারে না।
আশরিয়া, স্বর্ণা ও রাগিবের সামনেও এখন সেই চ্যালেঞ্জ।
তাদের তৈরি রোবটটি এখনো উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে। পরিকল্পিত সব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাস্তব পরিস্থিতিতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। বিশেষ করে ধ্বংসস্তূপের অসমতল পথে চলাচল, সেন্সরের নির্ভুলতা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রতিকূল পরিবেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করার সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।
তবে তিন তরুণের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে দেশের একটি বাস্তব সমস্যার প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান খোঁজার চেষ্টা। তারা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে চান, যা একদিন উদ্ধারকর্মীদের ঝুঁকি কমাতে এবং বিপদে আটকে পড়া মানুষের সন্ধান পেতে সহায়তা করতে পারে।
হয়তো ভবিষ্যতে কোনো ধসে পড়া ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে উদ্ধারকর্মীদের আর অজানা বিপদের মধ্যে প্রথমেই প্রবেশ করতে হবে না। তাদের আগে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের তৈরি ছোট্ট একটি রোবট। ভেতরের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য পাঠাবে বাইরে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধারকর্মীরা আরও নিরাপদে পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনা করতে পারবেন।
সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে তিন তরুণকে।
লাস ভেগাস তাদের জন্য একটি বড় সুযোগ। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তিবিদ, গবেষক ও উদ্যোক্তাদের সামনে নিজেদের কাজ তুলে ধরতে পারলে নতুন অভিজ্ঞতা, কারিগরি সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার নতুন পথ খুলে যেতে পারে।
কিন্তু আশরিয়া, স্বর্ণা ও রাগিবের স্বপ্নের সবচেয়ে বড় সাফল্য নির্ধারিত হবে অন্য একটি জায়গায়।
যেদিন তাদের তৈরি ছোট্ট রোবট সত্যিকারের কোনো বিপজ্জনক স্থানে প্রবেশ করে উদ্ধারকর্মীদের সহায়তা করতে পারবে, সেদিনই গবেষণাগারে শুরু হওয়া সেই স্বপ্ন সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে উঠবে।
লাস ভেগাস অনেক দূরের শহর। কিন্তু তিন তরুণের স্বপ্নটা খুব কাছের—বাংলাদেশের তৈরি প্রযুক্তি যেন একদিন বাংলাদেশের মানুষের জীবন বাঁচাতে কাজে লাগে।