ঢাবি অধিভুক্ত ৭ কলেজ
© লোগো
কাগজেকলমে স্নাতক শেষ হয়েছে চলতি বছরের জুন মাসে। শেষ হয়েছে কলেজ থেকে সরবরাহকৃত আইডি কার্ডের মেয়াদও। কিন্তু বাস্তবতা ঢের ভিন্ন। স্নাতক সম্পন্ন করতে চার বছর মেয়াদ শেষ হয়ে ছাত্রত্ব শেষ হলেও এখনও ৩য় বর্ষের গন্ডিই পেরুতে পারেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের ২০১৬-১৭ সেশন এর শিক্ষার্থীরা।
অথচ এই একই সেশনের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছে। এমন অবস্থায় দীর্ঘ সেশনজট আর একবছরের বেশি সময় পিছিয়ে যাওয়াসহ কর্তৃপক্ষের অবহেলাপূর্ণ আচরণে হতাশ ও ক্ষুব্ধ সাত কলেজের এসব শিক্ষার্থীরা।
ঢাবি অধিভুক্ত ঢাকা কলেজের স্নাতক ২০১৬-১৭ সেশনের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ভোক্তভোগী শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান বলেন, উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়েই ভর্তি হই ঢাকা কলেজে। ঢাকা কলেজ তখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল। ভর্তির কিছুদিন পর জানতে পারেন ঢাকা কলেজসহ রাজধানীর মোট সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে এমন উদ্যোগে প্রথমে বেশ আনন্দিত হলেও তা বিষাদে রূপ নিতে বেশিদিন সময় লাগেনি। দেরিতে পরিক্ষা নেয়া, ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা, সেশন জটসহ অন্যান্য সব সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পড়াশোনা এখন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কলেজ থেকে ইস্যু করা আইডি কার্ডের মেয়াদও ইতিমধ্যেই শেষ। কলেজ থেকে কার্ডটি ইস্যু করা হয় ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে আর এর মেয়াদ ২০২০ সালের জুনে শেষ হয়েছে। সেই অনুযায়ী চলতি বছরের জুনের মধ্যেই স্নাতক শেষ হওয়ার কথা অথচ তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষায়ই বসতে পারিনি। চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ হলেও স্নাতক শেষ করতে বাকি এখনও পুরো এক বছর। চার বছরের স্নাতক কোর্স শেষ করতে কতবছর সময় লাগবে তা আমরা কেউ জানিনা।
ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের ২০১৬-১৭ সেশনের আরেক শিক্ষার্থী সুমন-আল-মামুন বলেন, একই সাথে ভর্তি হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থীদের চতুর্থ বর্ষের ফাইনলাই পরীক্ষা আগামী ২৬ ডিসেম্বর থেকে শুরু হতে যাচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও পরীক্ষার জন্য অপেক্ষমান। এরপরই চাকরির বাজারে প্রবেশ করবেন তারা। অথচ আমাদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। ঢাবি কর্তৃপক্ষ আমাদের জীবন থেকে দীর্ঘ সময় কেড়ে নিয়েছে। আমাদের জীবনে সময়ের কি মূল্য নেই! আমাদের এতোদিনে অনার্স শেষ হয়ে যাবার কথা কিন্তু আমরা এখনও থার্ড ইয়ারেই পড়ে আছি। আরও কতদিন থাকতে হবে জানা নেই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আমাদের থেকে এগিয়ে। আমাদের দোষ কোথায়? কেন এত ভোগান্তি?
শুধু সুমন-আল-মামুন অথবা মিজানুর রহমানই নয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজের ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থীদেরও একই অবস্থা। দীর্ঘ সেশনজটে পড়ে তাঁদের জীবনের মূল্যবান সময় চলে যাচ্ছে উল্লেখ করে শিক্ষার্থীরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আরও যত্নশীল হতে হবে। এমনিতেই সেশন জট তারপর আবার করোনাভাইরাস পরিস্থিতে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বাড়তি ভোগান্তি এই সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের। তারা বলছেন দেশের সব শিক্ষার্থীদের তুলনায় তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইডেন মহিলা কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, স্বপ্ন ছিল অনার্স শেষ করে চাকরি নিয়ে নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াবো। দীর্ঘ সেশন জটে এখন অনার্স শেষ করাই দায় হয়ে পড়েছে। এত দিনেও অনার্স শেষ না হওয়ার বাসা থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। মানসিক ভাবেও বেশ চিন্তিত আছি। কবে এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাবো।
সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী মাসুম বিল্লাহ বলেন, ঢাকায় পড়াশোনা করা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। অনার্স শেষ করে একটা জব নিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা ছিল। এখন অনার্স শেষ হওয়া তো দূরে থাক ৩য় বর্ষই শেষ হয়নি। পরিবার থেকে অর্থিক সাপোর্ট আর দিতে পারছে না। খুবই মানসিক টেনশনে ভুগছি।
শুধুমাত্র ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থীরাই নয় বরং ২০১৫-১৬ সেশন এবং ডিগ্রী ২০১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থীরাও পড়েছে চরম বিপাকে। যথাসময়ে পরীক্ষা না হওয়ার দরুন অনার্স সম্পন্ন হওয়ার চূড়ান্ত সময় পেরুলেও ১৫-১৬ সেশনের শিক্ষার্থীরা এখনো বসতে পারেনি চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষায়।
এছাড়া ডিগ্রী ২০১২-১৩ সেশনের বিশেষ পরীক্ষা না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী নয় বছরেও পেরুতে পারেননি তিন বছরের ডিগ্রি কোর্স। ইডেন মহিলা কলেজের ডিগ্রী ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী মারিয়া বলেন, ২০১২ সালে আমি তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রিতে ভর্তি হই। এরপর আজ অবধি দীর্ঘ নয় বছর সময় পার হলেও এখনো আমার তিন বছর মেয়াদী ডিগ্রিই শেষ হয়নি। অথচ আমার মেয়ে এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে আর আমি মেয়ের মা এখনো ডিগ্রিতে পড়ি।
শুধুমাত্র তিনিই নয় বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজে ডিগ্রিতে অধ্যয়নরত অনেক শিক্ষার্থীর ভাগ্যেই জুটেছে এমন করুণ পরিণতি।
ভোক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশেষ পরীক্ষার দাবিতে এবং এমন অবস্থার নিরসন চেয়ে শিক্ষার্থীরা কখনো কলেজের অধ্যক্ষ এবং কলেজ প্রশাসন আবার কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে সমাধান চেয়েছেন বারবার। কিন্তু কোন আবেদন-নিবেদনই কাজে আসেনি।
সরকারি তিতুমীর কলেজে ডিগ্রিতে অধ্যায়নরত ২০১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থী ওয়ালিউল্লাহ টিটু বলেন, এমন কোন জায়গা নেই যেখানে পৌঁছেনি শিক্ষার্থীরা আবেদন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কোন আবেদনই কেউ কর্ণপাত করেননি। সাত কলেজের ডিগ্রির অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই বেহাল দশা। সেশনজট এবং নানান রকম অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার বলি হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আবার এসব সমস্যা সমাধানে উদ্যোগও নেই কর্তৃপক্ষের। ফলে, বছরের পর বছর সেশনজটে শিক্ষার্থীরা।
সম্প্রতি সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের ছয়দফা দাবিতে মানববন্ধনের একটি দাবিও ছিলো ‘ডিগ্রি ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের চলমান বিশেষ পরীক্ষা অতি দ্রুত নিয়ে ১ মাসের মধ্যে ফলাফল প্রকাশিত করা।’
এ বিষয়ে কবি নজরুল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ এবং সাত কলেজের সমন্বয়ক অধ্যাপক আইকে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার বলেন, খুব শিগগিরই যেন এসব সমস্যা সমাধান করা যায় তার জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭ সেশনের চূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। সুযোগ সৃষ্টি হলে সাথে সাথেই এসব বর্ষের পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে। এজন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। আর ডিগ্রির বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন। করোনার কারণে বিষয়গুলোতে দীর্ঘসূত্রিতা এসেছে, যার সমাধানে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।