কলেজের প্রধান ফটক © সংগৃহীত
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নামে মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তান গঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) গঠিত হলে শিক্ষা বিস্তারে তৎকালীন সরকার ক্যাথলিক চার্চের প্রধানকে কয়েকটি কলেজ স্থাপনের অনুরোধ জানান।
সরকারের এই অনুরোধের প্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানের ক্যাথলিক চার্চের প্রদান আর্চবিশপ লরেন্স গ্রেনার ছেলেদের জন্য কলেজ স্থাপনের নির্দেশ দেন হলি ক্রস সন্ন্যাস সংঘের যাজক ও সিস্টারদেরকে। সে নির্দেশের প্রেক্ষিতে পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে সেন্ট গ্রেগরিজ কলেজ নামে সেন্ট গ্রেগরিজ হাইস্কুলে ক্লাস শুরু করে।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, “১৯৪৯ সালে ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে হলিক্রস ফাদারগণ কর্তৃক ‘সেন্ট গ্রেগরি কলেজ’ নামে প্রথমে ক্যাথলিক কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৫০ সালে ৬১/১ সুভাষবোস এভিনিউর একটি ভবনে কলেজটি স্থানান্তরিত হয় এবং একটি পূর্ণাঙ্গ কলেজ হিসেবে কাজ শুরু করে। ১৯৫৪ সালে এটি মতিঝিলের বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয় এবং মা মেরির নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় নটর ডেম কলেজ। পবিত্র ক্রুশ সন্ন্যাস সংঘের ফাদারদের নীতি ও আদর্শ দ্বারা কলেজটি পরিচালিত হয়।”
কলেজের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন ফাদার জন হ্যারিংটন, সিএসসি ও তার সহযোগী হিসেবে ছিলেন ফাদার জেমস মার্টিন, সিএসসি। শুরুতে ১৯ জন শিক্ষার্থী নিয়ে মানবিক ও ব্যবসায় শাখার শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল।
পরবর্তীতে ফাদার টীম ১৯৫৩-৫৪ শিক্ষাবর্ষে বিজ্ঞান শাখা চালু করেন। তৎকালীন কলেজের ক্রমবর্ধমান শিক্ষার্থীদের কারণে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ১৯৫৫ সালে বৃহৎ পরিসরে ঢাকার মতিঝিল এলাকায় ক্যাম্পাস স্থানান্তরিত হয় নটরডেম কলেজের। শুরুতে ফাদার হ্যারিংটন ভবনেই ক্লাস শুরু হয়ছিল। প্রায় ৭.৫ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত বর্তমান ক্যাম্পাসকে সুপরিকল্পিতভাবে সাজানো ও সবুজায়ন করার কারণে নটরডেম ক্যাম্পাসকে বলা হয় ‘মতিঝিলের হার্ট’।
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে নটর ডেম কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়ে ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। প্রতিষ্ঠাকালে শুধু মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগ থাকলেও ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে বি.এ এবং ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে বিএসসি চালু করা হয়। তবে ১৯৭২-৭৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিএসসি কোর্স বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে কলেজটিতে ইংরেজি ও বাংলা মাধ্যমে উচ্চ মাধ্যমিক ও বিএ কোর্স চালু আছে। ১৯৯২ সালে কলেজটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক কলেজটি চারবার (১৯৫৯, ১৯৮৮, ১৯৯২, ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে) জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। খ্রিষ্টান মিশনারি কর্তৃক পরিচালিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি মূলত খ্রিষ্টান সম্প্রদায়, আদিবাসী, সংখ্যালঘু ও হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেয়ার জন্য পরিচালিত হলেও এটি সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের অধ্যয়নের জন্য উন্মুক্ত এবং প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই অধিকাংশ শিক্ষার্থী বাঙালি মুসলিম। ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী মুসলিম। নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা “নটর ডেমিয়ান” নামে পরিচিত।
বর্তমানে কলেজটি বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬ হাজার। ৯১ জন শিক্ষকের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ঢাকা বোর্ডে বরাবরই ভালো ফলাফল অর্জন করে যাচ্ছে কলেজটি।
এছাড়াও কলেজের রয়েছে ডিবেটং, বিজ্ঞান, আইটিসহ মোট ২৩টি ক্লাব। ১৯৫৩ সালে এদেশে প্রথম ক্লাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নটরডেম ডিবেটিং ক্লাব। কলেজের ফলাফল সার্বিকভাবে সবসময়ই সন্তোষজনক ছিল। ২০১৮ সালে ঢাকা বোর্ডের পরিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের ১ম ১০ জনের ৯ জনই নটরডেম কলেজের।
মূলত, বিশেষ পদ্ধতিতে ছাত্র বাছাইয়ের মাধ্যমে ভর্তি, নিয়মিত ক্লাস, ভিন্ন ও সময়োপযোগী পাঠদান পদ্ধতি, সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক পরিক্ষা, নিয়ম-নীতির শৃঙ্খলা, অবিভাবকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমেই কলেজটি এগিয়ে যাচ্ছে।
আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এই প্রতিষ্ঠানটি ৭১ বছরে পেরিয়ে ৭২-এ পা রাখল। সবাইকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানিয়ে কলেজের অধ্যক্ষ ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও, সিএসসি বলেন, আমরা লক্ষ্মীবাজার থেকে আজকের ক্যাম্পাস ও আজকের স্থানে আসতে যারা নিরলসভাবে কাজ করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আমাদের আগামী দিনের পরিকল্পনা হলো দেশের পিছিয়ে পড়া ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেয়া।
নটরডেম কলেজ যেন শিক্ষা বিস্তারে আরও কাজ করতে পারে সেজন্য শিক্ষকদের প্রতিবছর নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার কথাও জানান তিনি। এছাড়াও, একটি সময়োপযোগী অডিটোরিয়ামও করার পরিকল্পনার পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও অবিভাবকদের দীর্ঘদিনে দাবি আবাসিক ব্যবস্থা করার কোনো সুযোগ নেই বলেও জানান অধ্যক্ষ।