দীর্ঘ ছুটি শেষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থীরা চেনা ক্যাম্পাসে ফিরতে শুরু করেছেন © সংগৃহীত
শরতের দীর্ঘ ছুটি শেষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থীরা চেনা ক্যাম্পাসে ফিরতে শুরু করেছেন। টানা ক্লাসের ক্লান্তি, অ্যাসাইনমেন্টের চাপ আর সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠার চিরচেনা ব্যস্ততাকে ছুটি দিয়ে তারা মেতে উঠেছিলেন এক অফুরন্ত স্বাধীনতায়। প্রতি বছরের মতো এবারও শারদীয় উৎসবের দীর্ঘ অবকাশ যান্ত্রিক জীবনে এনেছিল এক পশলা স্বস্তি।
তবে প্রযুক্তি আর আধুনিকতার এই যুগে ছুটি কাটানোর ধরনে যেমন এসেছে নানামুখী বৈচিত্র্য, তেমনি শিক্ষার্থীদের মনের ক্যানভাসেও জমা হয়েছে এক মুঠো রঙিন ও স্মৃতিময় অভিজ্ঞতা। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ছুটি কাটানোর সেই বিচিত্র অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরেছেন ডেইলি ক্যাম্পাসের বেরোবি প্রতিনিধি এম কে পুলক আহমেদ।
পরিবারের কাছে ফিরে ভালোবাসার নতুন উপলব্ধি:
দূর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী তানিয়া আফরিন লিথি ব্যস্ত শিক্ষাজীবন থেকে আট-দশ দিনের বিরতি পেয়ে পরিবারের কাছে ফিরেছিলেন। স্নাতকজীবন শেষ করে এখন তার চাকরির প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ গড়ার চিন্তা। এই ছুটির সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা ছিল মায়ের দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করে তাঁকে একটু বিশ্রাম দেওয়া।
রান্নার প্রস্তুতি থেকে পেঁয়াজ-মরিচ কাটা, মসলা বাটা কিংবা ঘরের অন্যান্য কাজে সাহায্য করার মধ্য দিয়ে লিথি মায়ের নিঃস্বার্থ পরিশ্রমকে গভীরভাবে অনুভব করেছেন।পাশাপাশি বাবার যত্ন নেওয়া, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা এবং বাড়ির গাছপালার পরিচর্যা তাঁকে মানসিক প্রশান্তি দিয়েছে।
লিথি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক জীবনে চাইলেই প্রিয়জনদের কাছে থাকা যায় না।তাই এই কয়েকটি দিন শুধু ছুটি নয়, বরং পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ও ভালোবাসা প্রকাশের এক বিশেষ সুযোগ হয়ে উঠেছিল। ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও ছুটির অবকাশ সবার—এই চেতনা আমাদের সমাজে সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করুক।
মেসের জীবন থেকে মায়ের হাতের রান্নায়:
পূজার লম্বা ছুটিতে বাড়িতে এসে বেশ ভালো সময় পার করেছেন বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী রোকেয়া খাতুন। পরিবারের অনেকেই পড়ালেখা বা কাজের সূত্রে বাইরে থাকায় এই ছুটি সবার এক হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। রোকেয়া বলেন, পরিবারের সঙ্গে সময় দিচ্ছি, ঘরের কাজে সাহায্য করছি, আর সুযোগ পেলেই আত্মীয়দের বাসায় ঘুরতে যাচ্ছি।
সবচেয়ে বড় কথা, মেসের একাকিত্ব আর খারাপ রান্না খাওয়ার ঝামেলা থেকে মুক্তি মিলেছে। বাড়িতে থাকায় পড়াশোনার চাপও কিছুটা কম। সব মিলিয়ে খাওয়া-দাওয়া, ঘোরাঘুরি আর পরিবারের সবার সঙ্গে সময় কাটিয়েই ছুটিটা উপভোগ করছি।
ক্যাম্পাসের আড্ডা থেকে গোবিন্দগঞ্জের প্রত্নতত্ত্বে:
ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সানোয়ার হোসেন অভি ছুটির দিনগুলো আপনজনদের সান্নিধ্যে কাটালেও তার মন পড়েছিল ক্যাম্পাসের চেনা আড্ডায়। তবে এই দীর্ঘ ছুটির প্রায় এক সপ্তাহ তিনি কাটিয়েছেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে। ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থী হিসেবে মাঠপর্যায়ে মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতা, জনপদের গল্প ও অতীতের স্মৃতির মধ্য দিয়ে অর্জন করেছেন নতুন জ্ঞান।
অভি বলেন, এই অভিজ্ঞতা ছুটির দিনগুলোকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি, ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; তা ছড়িয়ে আছে মানুষের স্মৃতি ও জনপদের জীবনধারায়।
উৎসবেও ঘরে ফেরা হয়নি, মেসের নিরিবিলি দিনগুলোতেই ভবিষ্যতের ছক:
সবাই যখন বাড়ির টানে ক্যাম্পাস ছাড়ছিল, তখন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেন জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আল হুমায়রা জান্নাত ঐশী। পূজার দীর্ঘ ছুটিতে তিনি রংপুরের মেসে একাকী থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং এই নিরিবিলি সময়টুকুকে নিজের ব্যক্তিগত উন্নয়নের কাজে লাগান।
পছন্দের বই পড়ে মানসিক ক্লান্তি দূর করার পাশাপাশি অনলাইনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছেন ঐশি। সামনে বেশ কিছু বড় কাজ থাকায় এই অবসরেই একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা (প্ল্যান) তৈরি করে ফেলেছেন তিনি।
ঐশির ভাষায়, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে ছুটির এই দিনগুলো আমার জন্য ভবিষ্যৎ দিনগুলোর প্রস্তুতি নেওয়ার দারুণ এক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাড়ি ফেরা, এক টুকরো শান্তি ও উৎসবের আনন্দ:
সারা বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা আর ব্যস্ত জীবনের চাপ সামলে মূলত এই দীর্ঘ ছুটির দিনগুলোর জন্যই মুখিয়ে থাকেন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী সূর্য মোহন রায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাড়ি ফিরে মা-বাবার ছায়ায় সময় কাটানো আর মায়ের হাতের রান্না খাওয়ার মধ্যে পরম শান্তি খুঁজে পেয়েছেন তিনি।
সূর্য জানান, এবারের পুজো ছিল তার দেখা সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ও আনন্দঘন। পুজো উপলক্ষে মণ্ডপে মণ্ডপে যাওয়া, শৈশব-কৈশোরের পুরোনো বন্ধুদের সাথে রাত জেগে আড্ডা, হইচই ও একসাথে ঘুরে বেড়ানোর মাঝেই তাঁর ছুটির প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে। অনেক দিন পর মা-বাবা আর বন্ধুদের পাশে পেয়ে সার্বিকভাবে এবারের ছুটিটা তাঁর জন্য দারুণ স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর কাশফুলের দোলা দিয়ে যে ছুটির আমেজ শুরু হয়েছিল, তা শেষ হয়েছে শিক্ষার্থীদের জীবনের নানামুখী অভিজ্ঞতার রঙে। কেউ পরিবারের সেবায়, কেউ জ্ঞানের সন্ধানে, কেউ মেসের নিরিবিলিতে ক্যারিয়ারের ছক কষে, আবার কেউ উৎসবের আমেজে কাটিয়েছেন এই অবকাশ।
ছুটি শেষে চেনা ক্যাম্পাসের চিরচেনা রূপে ফিরলেও, এই দিনগুলোর প্রাপ্তি আর শিক্ষা শিক্ষার্থীদের আগামী দিনের পথচলায় প্রেরণা জোগাবে।