শিক্ষার্থী অনিক চন্দ্র পাল © সংগৃহীত
রাজধানীর চানখারপুল এলাকার একটি ছাত্র মেস থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী অনিক চন্দ্র পালের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর তার কক্ষ থেকে দুটি চিরকুট ও একটি পেইন্টিং পাওয়া গেছে। চিরকুটে নিজের জীবনের শেষ পেইন্টিংটি প্রদর্শনীতে দেওয়ার ইচ্ছা এবং দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে হতাশার কথা লিখেছেন অনিক। তার আঁকা ছবিতে থাকা তিনটি ঘড়ি ও ভিন্ন ভিন্ন সময় নিয়েও তৈরি হয়েছে রহস্য। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা, প্রেমের সম্পর্কের বিচ্ছেদের কারণে তিনি আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে বংশাল থানাধীন বি কে গাঙ্গুলী লেনের ওই ছাত্র মেসের কক্ষ থেকে অনিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। অনিকের বাবা অরবিন্দু পাল ও মা শিলা রানী পাল সিলেটের শিবগঞ্জ এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকেন বলে জানা গেছে। তার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুরে।
অনিকের একটি চিরকুটে লেখা রয়েছে, ‘আমার জীবনের শেষ পেইন্টিং এটা। কেউ পারলে নিজের কোছে যত্ন করে রেখে দিও। ইচ্ছা ছিল এটা প্রদশর্নীতে দেব। কিন্তু এটা আর হবে না। কেউ পারলে আমার শেষ ইচ্ছা পূরণ করিও।’
অন্য একটি চিরকুটে নিজের সিলেটি ভাষায় অনিক লেখেন, ‘সবাই খুশি থাকিও…। আর ভালো লাগের না, আমি ক্লান্ত। কী আর করার এত অসুখ নিয়ে? এমনিতেই কয়েকদিন পর মারা যাইমু। কয়েক বছর পর আমি অন্ধ হয়ে যাইমু, যা আমি মানতে পারতাম নায়। তাই এই সিদ্ধান্ত।’
অনিকের সঙ্গে একই মেসে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অঙ্কুর কর্মকার। দুটি চিরকুট ও পেইন্টিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পেইন্টিং ও চিরকুট দুটো তার রুম থেকেই পাওয়া যায়। আর এটা অন্য কারও লেখা হতে পারে, এরকম কোনো সন্দেহ কারও মধ্যে নেই। সবারই মনে হচ্ছে এটা অনিকের শেষ বার্তা।’
মেস সদস্য ও জবি শিক্ষার্থী জয় ভূঁইয়া জানান, গত সোমবার থেকেই অনিকের তেমন সাড়াশব্দ বা খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। মঙ্গলবার রাত ৯টা বা সাড়ে ৯টার দিকে অনিকের এক ব্যাচমেট তাকে ফোনে না পেয়ে মেসে তার কক্ষে গিয়ে দেখতে বলেন।
পরে তারা দুজন মিলে কক্ষের দরজায় দীর্ঘক্ষণ কড়া নাড়লেও কোনো সাড়া পাননি। জয় ভূঁইয়া বলেন, ‘দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় সন্দেহ হয়। পরে জানালার কাচ ভেঙে ভেতরে তাকিয়ে অনিককে গলায় গামছা প্যাঁচানো অবস্থায় ফ্যানের সঙ্গে ঝুলতে দেখা যায়। এরপর দরজা খুলে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
সহপাঠী ও মেস সদস্যদের সূত্রে জানা যায়, দুই দিন আগে অনিকের সঙ্গে তার প্রেমিকার বিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকে অনিকের মোবাইল ফোন বন্ধ ও ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। বিচ্ছেদের পর থেকেই তিনি মেসে একা ও চুপচাপ থাকতে শুরু করেন বলে জানান তারা।
ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রয়িং ও পেইন্টিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং সহকারী প্রক্টর সুবাস পাল। তিনি বলেন, ‘স্টুডেন্টরা আমাকে ঘটনা জানানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছাই। কিন্তু ততক্ষণে আমাদের স্টুডেন্ট আর বেঁচে ছিল না।’
সহকারী প্রক্টর আরও বলেন, ‘আমি ওর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। ওর বাবার সঙ্গেও কথা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা আসার পর মেডিকেল ও থানার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।’ স্বজনদের উপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলেও জানান তিনি।
অনিকের আঁকা পেইন্টিং প্রসঙ্গে একই বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, “এই পেইন্টিংয়ে অনিক কিছু বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে মনে হচ্ছে। এখানে সে মোট তিনটি ঘড়ি এঁকে তিনটি ভিন্ন সময় দিয়েছে। হয়তো এই তিনটি সময় দিয়ে সে বুঝিয়েছে, কখন কখন সে আত্মহননের চেষ্টা করেছে। কিংবা কখন সে মারা যাবে এরকম কিছু। আর চোখগুলো ছোট ছোট করে আঁকা, হতে পারে এটা তার চিরকুটের লেখার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। তাদের রুমের রং ছিল হলুদ আর সে পেইন্টিংয়ে হলুদ রঙের ব্যবহার করেছে।”