খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
বিলপাড়ের কৃষকদের নিয়ে গবেষণা স্থান পেল আন্তর্জাতিক জার্নালে, উঠে এল ক্ষমতা ও ভূমি দখলের গল্প © টিডিসি সম্পাদিত
জলাবদ্ধ একটি বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে কৃষক বলছিলেন, তাঁর ১৩ বিঘা জমি এখন পানির নিচে। জমির সীমানা মাপার উপায় নেই। সেই জমিতে মাছ চাষ করছেন অন্য একজন। চাষের বিনিময়ে টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও প্রতিশ্রুত অর্থ আর পাননি তিনি।
এমন গল্প বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে নতুন নয়। স্থানীয় চায়ের দোকানের আড্ডায়, কৃষকের ক্ষোভে কিংবা বড়জোর কোনো স্থানীয় সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে এসব কথা উঠে আসে। কিন্তু সেই একই গল্প যখন আন্তর্জাতিক একাডেমিক জার্নালের গবেষণার উপাত্ত হয়ে ওঠে, তখন তার অর্থ বদলে যায়।
যশোরের অভয়নগর ও মণিরামপুরের জলাবদ্ধতাকবলিত মানুষের এমন অভিজ্ঞতাই এখন আন্তর্জাতিক একাডেমিক আলোচনার অংশ। ভূমি হারানো কৃষকের গল্প যুক্ত হচ্ছে accumulation by dispossession–এর মতো তাত্ত্বিক ধারণার সঙ্গে; জলাবদ্ধতা বিশ্লেষিত হচ্ছে পরিবেশ, রাজনীতি, জীবিকা ও সামাজিক বৈষম্যের আন্তঃসম্পর্ক হিসেবে।
স্থানীয় বাস্তবতা থেকে আন্তর্জাতিক একাডেমিয়ায় এই যাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মহিবুল ইসলামের গবেষণা। তাঁর গবেষণাকাজ দেখাচ্ছে একজন সমাজবিজ্ঞানীর কাছে নিজের এলাকার পরিচিত সংকটও কীভাবে বিশ্বমানের গবেষণার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
মহিবুল ইসলাম উপকূলীয় জনপদের বাস্তবতার মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর গবেষণায় তাঁর আগ্রহের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে জলাবদ্ধতা, ভূমি, পরিবেশ ও প্রান্তিক মানুষের জীবন।
গত এক বছরে তাঁর নেতৃত্বে বা অংশগ্রহণে প্রকাশিত একাধিক গবেষণায় যশোর ও উপকূলীয় বাংলাদেশের জলাবদ্ধতার বহুমাত্রিক সামাজিক প্রভাব উঠে এসেছে।
‘Environmental Sociology’ জার্নালে প্রকাশিত “From Waterlogging to Land Grabbing” শীর্ষক গবেষণায় যশোরের অভয়নগর ও মণিরামপুরের পাঁচটি গ্রামের মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি দেখিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা শুধু পরিবেশগত দুর্যোগ নয়; এটি ভূমি মালিকানা ও ক্ষমতার সম্পর্ককেও বদলে দিতে পারে।
গবেষণায় ভূমি বেদখলের বিভিন্ন ধরনকে চারটি স্বতন্ত্র প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত করা হয়েছে নব্যউদারনৈতিক, বলপ্রয়োগমূলক, অর্ধ-প্রতারণামূলক এবং সংকটজনিত। এর মধ্য দিয়ে ডেভিড হার্ভের ‘accumulation by dispossession’ তত্ত্বকে দক্ষিণ এশীয় ব-দ্বীপের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
গবেষণাটির বিশেষত্ব এখানেই। সেখানে শুধু পরিসংখ্যান বা তাত্ত্বিক আলোচনা নেই; রয়েছে বিষ্ণু, রণজিৎ, তিলক পাল, গোপালের মতো স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাও। অর্থাৎ, যাদের কথা সাধারণত নীতিনির্ধারণী বা একাডেমিক আলোচনায় অনুপস্থিত থাকে, তাদের জীবনকথাই হয়ে উঠেছে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত।
আরেকটি গবেষণা ‘Environmental Management’ জার্নালে প্রকাশিত “Donor Climate Coloniality, Ecological Debt and Vulnerabilities in Coastal Bangladesh”, জল ব্যবস্থাপনা প্রকল্পগুলোর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
গবেষণায় কোস্টাল এমব্যাংকমেন্ট প্রজেক্ট থেকে শুরু করে খুলনা-যশোর ড্রেনেজ রিহ্যাবিলিটেশন প্রজেক্টের মতো উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকদের যুক্তি, উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্থানীয় বাস্তবতা এবং মানুষের অংশগ্রহণ যথাযথভাবে বিবেচিত না হলে তা নতুন ধরনের বৈষম্য ও নির্ভরশীলতা তৈরি করতে পারে।
এখানে উঠে এসেছে climate coloniality, recognition justice এবং procedural justice–এর মতো ধারণা। অর্থাৎ জলবায়ু সংকট শুধু পরিবেশের বিষয় নয়; এর সঙ্গে ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পদ বণ্টন এবং কার কথা শোনা হচ্ছে সেসব প্রশ্নও জড়িত।
তৃতীয় গবেষণা, ‘Disaster Advances’ সাময়িকীতে প্রকাশিত “Waterlogging as a Socio-Ecological Crisis”, জলাবদ্ধতাকে একটি socio-ecological system হিসেবে বিশ্লেষণ করেছে।
এখানে জলাবদ্ধতার প্রভাব শুধু কৃষিজমি বা যোগাযোগ ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ পানিতে ডুবে যাওয়ায় শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হওয়া, নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, লবণাক্ত পানির প্রভাব, সাপের কামড়সহ বিভিন্ন সমস্যাকে একই সংকটের আন্তঃসম্পর্কিত অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে একটি বিলের পানি এখানে আর শুধু পানি থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে জীবিকা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভূমি, ক্ষমতা ও বৈষম্যের গল্প।
এই গবেষণাগুলোর পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। মাঠপর্যায়ে ফোকাস গ্রুপ আলোচনা, কেস স্টাডি ও মূল তথ্যদাতা সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে মানুষের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা হয়েছে। বাংলায় সংগৃহীত তথ্য ইংরেজিতে অনুবাদ করে ‘NVivo’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে থিমেটিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তবে গবেষণার আসল শক্তি শুধু তথ্য সংগ্রহে নয়, সেই তথ্যকে বৃহত্তর তাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার সক্ষমতায়।
একজন কৃষকের জমি হারানোর গল্প তখন শুধু একজন ব্যক্তির দুর্ভাগ্য নয় তা হয়ে উঠতে পারে accumulation by dispossession–এর একটি অভিজ্ঞতামূলক উদাহরণ। জলাবদ্ধতা তখন কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, তা হয়ে উঠতে পারে একটি politically productive condition। আর পানি ও মানুষের সম্পর্ক বিশ্লেষিত হতে পারে socio-nature ধারণার আলোকে।
এই তাত্ত্বিকীকরণই সাধারণ মাঠ-তথ্যকে একাডেমিক গবেষণায় রূপ দেয়।
আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতা নয়, সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। মহিবুল ইসলামের গবেষণায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ গবেষকদের সঙ্গে যৌথ কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই সহলেখকত্ব ও মেন্টরশিপ তরুণ গবেষকদের জন্য আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক গবেষণার তাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত দক্ষতার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি হয়।
এখানেই সমাজবিজ্ঞান শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে শুধু পাঠ্যবই পড়া নয়, গবেষকদের সঙ্গে কাজ করা, গবেষণার নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক আলোচনার ভাষা আয়ত্ত করাও একজন শিক্ষার্থীর প্রশিক্ষণের অংশ হওয়া উচিত।
গবেষণার মূল্য শুধু আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণাগুলোতে জল ব্যবস্থাপনা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে বেশ কিছু নীতিগত সুপারিশও উঠে এসেছে।
এর মধ্যে রয়েছে Tidal River Management–কে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া, Water Management Organizations–এ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থায় জমির কাগজপত্র বা ব্যাংক হিসাবের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে বাদ পড়া মানুষদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ।
অর্থাৎ গবেষণার লক্ষ্য শুধু ‘সমস্যা আছে’ বলা নয়; কেন সমস্যা তৈরি হচ্ছে, কারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং কীভাবে পরিবর্তন আনা সম্ভব সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাও এর অংশ।
সমাজবিজ্ঞান শিক্ষায় দুর্খেইম, মার্ক্স, ওয়েবার কিংবা গিডেন্সের মতো তাত্ত্বিকদের ধারণা জানা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু সেই তত্ত্ব যদি শুধু পরীক্ষার খাতায় লেখার জন্য মুখস্থ করা হয়, তাহলে তার ব্যবহারিক শক্তি অনেকটাই হারিয়ে যায়।
একজন শিক্ষার্থীকে বরং শেখানো দরকার মার্ক্সের শ্রেণি বিশ্লেষণ তাঁর নিজের গ্রামের ভূমি সমস্যাকে বুঝতে কীভাবে সাহায্য করতে পারে; ওয়েবারের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ধারণা স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বিশ্লেষণে কীভাবে ব্যবহার করা যায়; কিংবা পরিবেশগত সমাজবিজ্ঞানের ধারণা দিয়ে নিজের এলাকার জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন বা লবণাক্ততার সামাজিক প্রভাব কীভাবে বোঝা যায়।
এ জন্য পাঠ্যক্রমে গুণগত গবেষণা পদ্ধতির ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ জরুরি। ফোকাস গ্রুপ আলোচনা, গভীর সাক্ষাৎকার, ন্যারেটিভ বিশ্লেষণ, নৃতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ এবং ডেটা বিশ্লেষণ শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখানো যেতে পারে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিজেদের এলাকা ও কমিউনিটির সমস্যা নিয়ে গবেষণায় উৎসাহিত করা দরকার। কারণ একটি এলাকার ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পর্ক সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা থাকলে গবেষণায় গভীরতা তৈরি করা সহজ হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আন্তর্জাতিক তত্ত্বকে বাস্তব জীবনের উপাত্ত বিশ্লেষণের হাতিয়ার হিসেবে শেখানো। তত্ত্ব তখন আর পরীক্ষার উত্তর নয়; হয়ে ওঠে বাস্তবতাকে বোঝার একটি চশমা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর ব্যাংক, বিসিএস, এনজিও কিংবা বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যাওয়া এসবই একজন সমাজবিজ্ঞান শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক ক্যারিয়ার হতে পারে। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান শিক্ষার সম্ভাবনা সেখানে শেষ হওয়ার কথা নয়।
একজন শিক্ষার্থী যদি নিজের গ্রামের বিলের জলাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন করতে শেখে, মানুষের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করতে শেখে, সেই অভিজ্ঞতাকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করতে শেখে এবং আন্তর্জাতিক তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে তাহলেই সমাজবিজ্ঞান তার সামাজিক শক্তি প্রকাশ করতে শুরু করে।
বিলের পাড়ের একজন কৃষকের কাছে ১৩ বিঘা জমি হারানো হয়তো জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা। কিন্তু একজন সমাজবিজ্ঞানীর কাছে সেই ঘটনাই হতে পারে ভূমি, ক্ষমতা, পরিবেশ ও বৈষম্যের বৃহত্তর সম্পর্ক বোঝার দরজা।
সেই দরজা দিয়ে স্থানীয় একটি গল্প আন্তর্জাতিক একাডেমিয়ায় প্রবেশ করতে পারে। আর গবেষণা যদি শেষ পর্যন্ত নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে, তাহলে বিলের পাড়ের মানুষের কণ্ঠস্বর শুধু জার্নালের পাতায় আটকে থাকে না তা পৌঁছে যেতে পারে পরিবর্তনের টেবিলেও।
সমাজবিজ্ঞান শিক্ষার সার্থকতা সম্ভবত সেখানেই শুধু মানুষের সমাজকে ব্যাখ্যা করা নয়, মানুষের বাস্তবতাকে বোঝা এবং সেই বাস্তবতা পরিবর্তনের জ্ঞান তৈরি করা।