জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ © টিডিসি ফটো
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বিত উদ্যোগে দেশে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁও কলেজ ডিবেটিং ক্লাব (টিসিডিসি) আয়োজিত ‘১ম জাতীয় বিতর্ক উৎসব ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি এ আহ্বান জানান। কলেজ পর্যায়ের ৩২টি এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ৩২টি দলসহ মোট ৬৪টি দল এ বিতর্ক উৎসবে অংশ নেয়।
ড. আমানুল্লাহ বলেন, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে সাংস্কৃতিক বিপ্লব জরুরি। স্বাধীনতার পর আমরা যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয়েছি, তার একটি কারণ হলো সাংস্কৃতিক বিপ্লব না হওয়া। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের পরও তা হয়নি, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরও হয়নি। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের মাধ্যমে সারাদেশে এই সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনতে চাই।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিজেদের নিয়ে ছোট না ভাবার আহ্বান জানিয়ে ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তোলার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। গ্রামীণফোনের সিইও যদি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট হতে পারেন, প্রধান বিচারপতি যদি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট হতে পারেন, সেনাবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান, বিমান বাহিনী প্রধান যদি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট হতে পারেন তাহলে আমি কেন নয়? প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যে এই প্রত্যয় থাকতে হবে।
বিশিষ্ট এই উন্নয়ন গবেষক বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাড়া দেশের ব্যাংক, বীমা ও ইনস্যুরেন্স খাত একদিনও চলে না। দেশের প্রথম সারির বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানও একদিন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ছাড়া চলতে পারে না। ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেটেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশের ৮০ শতাংশের বেশি চাকরি বেসরকারি খাতে। আর এই খাতের ৮২ থেকে ৮৩ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের। তাই আমাদের শিক্ষার্থীদের মন ছোট করার কোনো কারণ নেই।
শিক্ষাঙ্গনে পড়াশোনা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, “আমাদের সমাজে কনফ্লিক্ট থাকবে। ২০২৪ এর ৩৬ জুলাই কনফ্লিক্ট হয়েছে বলেই আমরা এমন একটা পরিবেশ পেয়েছি। তবে সেই কনফ্লিক্ট হতে হবে গঠনমূলক। আমাদের পিআর রিভিউ জার্নাল কারটা বেস্ট হয়েছে। কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভালো বিতর্কিত হতে পারে- এসব নিয়ে প্রতিযোগিতা হবে। শিক্ষকরা যখন কলেজে প্রবেশ করবেন, তখন প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কাজ করবেন। প্রতিষ্ঠানটি যাতে ভালোভাবে চলে, সেভাবেই কাজ করতে হবে। আর শিক্ষার্থীরা কাজ করবেন শিক্ষার্থীদের স্বার্থে। এটাই শিক্ষাঙ্গনের আদর্শ পরিবেশ হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, উত্তর আমেরিকায় যদি এক লাখ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট কাজ করছেন। আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের একজন অ্যাটর্নি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট। তাকে বাংলাদেশে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৫০টি কলেজে পরিদর্শন করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
বিতার্কিকদের উদ্দেশে ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, আপনারা যারা বিতার্কিক, তারা সমাজের বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বিতর্কের আয়োজন করুন। যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য অর্জন করেছেন, তাদেরও এসব কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করুন। আমরা বিতর্কের মাধ্যমে, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’-এর মাধ্যমে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চাই।
তিনি বলেন, “আমরা তেজগাঁও কলেজকে এমন একটি মডেল হিসেবে দেখতে চাই, যেখানে কালচারাল ক্লাব, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, সাইবার সিকিউরিটি ক্লাব, ক্যারিয়ার ক্লাব,
মাইন্ড ক্লাব থাকবে শিক্ষার্থীদের বিকাশের জন্য সব ধরনের ক্লাব থাকবে। তবে এই কলেজের হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের ছেলেমেয়েরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাকরি পাচ্ছেন। কলেজের প্রফেশনাল কোর্সগুলোও ভালো চলছে। আমরা এটিকে একটি মডেল হিসেবে অন্যদের সামনে তুলে ধরতে চাই।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর মো. লুৎফর রহমান বলেন, বিতর্ক একটি প্রতিষ্ঠানের তরুণদের চিন্তা করতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং যুক্তির মাধ্যমে নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে শেখায়। একজন ভালো বিতর্কিকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো চিন্তার গভীরতা, তার চিন্তা এবং যুক্তির স্বচ্ছতা এবং প্রতিপক্ষের বক্তব্য শোনার এবং যুক্তি খণ্ডনের সক্ষমতা। কোন তথ্যটি আমাদের জন্য সত্য, কোনটি যুক্তিসঙ্গত এবং কোনটি কেবল আবেগনির্ভর, তা বিচার করার সক্ষমতাই একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি।
‘তারুণ্যের কলতানে, মুক্তির জয়গানে জেগে উঠুক বাংলাদেশ’ এই স্লোগানকে ধারণ করে টিসিডিসি ১ম জাতীয় বিতর্ক উৎসব ২০২৬-এর আন্তঃকলেজ পর্বের উদ্বোধন করেন ভাইস-চ্যান্সেলর। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর মো. লুৎফর রহমান। তেজগাঁও কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক শামীমা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার এবং মো. ফখরুল ইসলাম ভূঁইয়া রবিন।